Image description
ইরানফেরত প্রবাসীর বর্ণনা

রাস্তাঘাট ভেঙে চুরমার। বিল্ডিংগুলো মাটিতে গুঁড়িয়ে আছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। বলার মানুষ নেই। প্রতি রাতে নীরব কান্না। রাত হলেই অজানা আতঙ্ক। অনবরত সাইরেন আর মিসাইলের শব্দ। ঝাঁকে ঝাঁকে বিকট আওয়াজে বিমান উড়ে। আশপাশেই পড়ছে মিসাইল। ২-৩ মিনিটের এদিক-সেদিক হলে নিজের ওপরেও পড়তো। আল্লাহ্‌কে অনেক ডেকেছি। একবারের জন্য মা-বাবা এবং স্ত্রী-সন্তানদের দেখতে চেয়েছি। টানা ৫ দিন যোগাযোগ নেই। তারা জানতো না, বেঁচে আছি কিনা। বেঁচে ফিরবো বলেও ভাবিনি। বারবার ভেঙে পড়েছি। আবার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছি। এভাবেই মানবজমিন-এর কাছে ইরান যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করছিলেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পানিউমদা গ্রামের মো. খেলাই মিয়ার ছেলে মো. বাবুল মিয়া (৩৪)। কাজের সন্ধানে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ওমানে পাড়ি জমান তিনি। ২ মাস পরেই অবৈধভাবে ইরানে যান। দীর্ঘ ৭ বছর দেশটিতে কাটিয়ে দেশে ফেরেন। কিন্তু ফেরাটা সহজ ছিল না। এর পিছনের গল্পটা ছিল বেদনাদায়ক। বাবুল মিয়া বলেন, ইরানের তেহরানে একটি লোহার কোম্পানিতে কাজ করতাম। তেহরান শহর থেকে একটু বাইরে। প্রায় দেড় ঘণ্টার রাস্তা। জায়গাটির নাম হাসিনাবাদ। কোম্পানিতে আমরা ৮০ জন লোক ছিলাম। থাকার জন্য ১০টি রুম ছিল। এক রুমে ৮-৯ জন করে থাকতাম। ২৮শে ফেব্রুয়ারি রাতে খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ তীব্র শব্দ। পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠলো। কিছুই বুঝছিলাম না। সবাই এক জায়গায় জড়ো হই। একে-অপরের দিকে শুধু তাকিয়ে ছিলাম। বাইরে সাইরেনের শব্দ। মিসাইল আর যুদ্ধ বিমানের বিকট শব্দ আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়। প্রথমে ভাবি, ইরানের যুদ্ধবিমান মহড়া দিচ্ছে। কিন্তু না, পরে জানালা দিয়ে দেখলাম উপর থেকে মিসাইল ছুড়ছে। এভাবেই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা। কাজে গিয়ে শুনি যুদ্ধ লেগেছে। তিনি বলেন, আমাদের এখান থেকে অন্যান্য শহরগুলোতে আরও বেশি মিসাইল হামলা হতো। এর মধ্যে বাগরাবাদ, দৌলতাবাদ ও ছোড়াবাদ অন্যতম। তবে সর্বোচ্চ হামলাটি আমাদের এখানেই হয়েছিল। ওই জায়গার মধ্যে একটি হামলা করে ১৬৬ জন শিশু মেরেছিল। আমাদের কোম্পানির কাছেই বোমা মেরেছিল।

এই প্রবাসী বলেন, প্রথমদিন ভয়ে ভয়ে করে কাজে যাই। একেকজন একেক রকম কথা বলছিল। ইন্টারনেট বন্ধ। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল। কিছু বুঝতেও পারছিলাম না। সরকার থেকেও কোনো নির্দেশনা দিচ্ছিল না। এভাবে কতদিন চলবে তাও বুঝছিলাম না। এভাবেই কাজ থেকে ফিরে রাতে খাওয়া করি। যারা ছিলাম, সবাই একে-অপরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেই। ভয়ে ভয়ে রাতটা কাটে। কিন্তু একবারের জন্য ঘুম আসেনি। পহেলা মার্চ সকালে উঠে দেখি পুরো এলাকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিছু দোকানপাট খোলা ছিল। সেখান থেকে খাবার কিনে রাখি। পরদিন জানতে পারি- তেহরান থেকে পাশের শহর সাভেহ্‌তে বাংলাদেশের দূতাবাস সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশিদের দেশে নিয়ে যাওয়া হবে। যারা অবৈধভাবে আছেন, তারাও আবেদন করতে পারবেন। এতে কিছুটা আশা জন্মে। ৩রা মার্চ পর্যন্ত খাবার ঠিকমতো পাই। কাজেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু ব্যাংক থেকে শুরু সব ধরনের লেনদেন ব্যবস্থা অকেজো হয়ে গেছে। বেতন হয়নি। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে আকাশচুম্বী। সেদিন থেকে সামান্য কয়টা বিস্কুট ছিল খাবারের তালিকায়। দু’জন মিলে একটা রুটি ভাগ করে খাওয়া ছিল রাতের খাবার। পেটে ক্ষুধা আর অজানা ভয় ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তবুও কাজ করতে হচ্ছে। দিন দিন আক্রমণের মাত্রা বাড়তে থাকে। সব সময়ই সাইরেনের শব্দ কানে বাজে। যখন হামলা হয় তখন চারদিকে ছুটোছুটি করি। পিঞ্জিরার মধ্যে যেমন একটি পাখি বন্দি থাকে, তেমন আমরা ছিলাম। কারণ ওই দেশে আমাদের মা-বাবা নেই। কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই। শুধু আমরা বাংলাদেশি প্রবাসীরা ছিলাম। প্রতিটি রাতে আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করতাম। সেজদায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কান্না করতাম। শুধু চাইতাম, একবারের জন্য মা-বাবা এবং স্ত্রী সন্তানদের যেন দেখতে পাই।

বাবুল মিয়া বলেন, ৫ই মার্চ থেকে সবকিছু অনেকটা স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে। নেট অনেকটা সচল হয়। ৫ দিন পর সকালে পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। সে সময় সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ কথা হয় পরিবারের সঙ্গে। তারা বারবার বলছিলেন, যেন দেশে ফিরে যাই। কিন্তু হাতে টাকা নেই। তারা জানতো না খাওয়ার টাকাটাও আমার কাছে নেই। তবে মন বলছিল, যেভাবেই হোক দেশে ফিরতে হবে। দুপুরে বাংলাদেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করি। বিকালে দেশে ফেরার জন্য আবেদন করি। ওইদিন খাবারের দোকান খুলে। কিছু টাকা ধার করে ৩ দিন পর একটু পেট ভরে খাই। এরপর কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কোম্পানি থেকে কিছু টাকা দেয়। ধারদেনা সব শোধ করি। কিছু টাকা খাবারের জন্য রাখি। প্রতিনিয়ত হামলা চলছিল। তবুও একসময় ভাবি, আরও কিছুদিন থেকে যাই। যেন বেতনটা নিয়ে যেতে পারি। তবে, এ ভুল ভেঙে যায় ১০ই মার্চ। রাত ২টা ২০ মিনিট। একটু বিশ্রাম নিতে চাচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে যুদ্ধ বিমানের শব্দ আসে। ভাবলাম, হয়তো ইরানি বিমান। কিন্তু না। বাহিরে বিকট শব্দ হচ্ছে। এ সময় দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে দেখি মিসাইল পড়ছে। আমাদের রুম বারবার কেঁপে উঠছিল। রুম থেকে কয়েকশ’ মিটার দূরেই মিসাইল মেরেছে। এ সময় সবকিছু যেন থেমে যায়। মনে হচ্ছিল, আজ রাতেই বুঝি সব শেষ। কিছু না বুঝে সেজদায় বসে পড়ি। মনস্থির করি, আর থাকা যাবে না। পরদিন সকালেই দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। দূতাবাস থেকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দেয়। আর জানায়, কাগজপত্র প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমাদের দেশে পাঠানো হবে। কিন্তু এরপরের অভিজ্ঞতা ছিল আরও কঠিন। হামলার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কাজ বন্ধ হয়ে যায়। খাবারও পাওয়া যাচ্ছিল না। যা ছিল তাও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। হাতে টাকাও নেই। সব মিলে এক দুর্বিষহ জীবন।

তিনি বলেন, ১৫-১৬ দিন ঠিকমতো ঘুমাইনি। এরই মধ্যে দূতাবাস থেকে জানানো হয়, দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা হয়ে গেছে। দ্রুত ট্রাভেল পাস চলে আসবে। ১৮ই মার্চ। আমাদের কোম্পানির কাছেই একটি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। বেলা ১২টার দিকে পুলিশ ফাঁড়িতে মিসাইল হামলা হয়। মুহূর্তেই ফাঁড়িটি মাটির সঙ্গে মিশে গেল। শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। সেখানে কতোজন মানুষ মারা গেছে তা আজও অজানা। কাছ থেকে মিসাইলের ‘কাভার’ সেদিনই দেখেছি। কাভারটি ছিল লোহার। এসব দেখে দেশে ফেরার আশা হারিয়ে ফেলি। এদিন মানুষের মৃত্যুর কষ্ট বুকে এসে বাধে। সারারাত কান্না করি। ভোরেই দূতাবাস থেকে ফোন আসে। জানায়, আমি ট্রাভেল পাস পেয়েছি। ওইদিন রাতেই আমরা আজারবাইজানে প্রবেশ করবো। সকাল হওয়ার আগেই সাভেহ শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। দুপুরের আগেই পৌঁছাই। পরে ৯টি বাসে আস্তারা সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দেই। মধ্যরাত ২টার দিকে সীমান্তে পৌঁছাই। গভীর রাত। তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কনকনে শীত। রাতটা কেউ বন্দরের ওয়েটিং রুমে, কেউ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাই। ঘুমানোর কোনো সুযোগ ছিল না। গায়ে দেয়ার মতো ছিল না কম্বল। কোথাও গা ঠেকানোরও সুযোগ ছিল না। এরপর সকাল ৮টার দিকে স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা এসে কাজ শুরু করেন। ভোরেই আজারবাইজানে ঢুকে দেখি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আজারবাইজান ও তুরস্কে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এরপর আমাদের গন্তব্য বাকু বিমানবন্দর। বাসেই যাত্রা শুরু। দুপুরের মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছাই। সবাইকে নিয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় একটি বিশেষ ফ্লাইট। অবশেষে ২১শে মার্চ রাত পৌনে ২টার দিকে নিরাপদে মাতৃভূমিতে পা রাখি।