Image description

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বড় ধরনের সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিলে বিনিময়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের স্থগিত সম্পদ ছাড় দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিন পাতার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা চলছে, যা চূড়ান্ত হলে চলমান যুদ্ধের ইতি ঘটতে পারে।

চুক্তির মূল বিষয় কী?
আলোচনায় থাকা প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দু দুটি বিষয়—ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (প্রায় ২ হাজার কেজি) হস্তান্তর বা নিষ্ক্রিয় করবে। আরেকটি বিষয় হলো- যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সম্পদ অবমুক্ত করবে। বিশেষ করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি।

ইউরেনিয়াম নিয়ে সমঝোতার পথ
এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কয়েকটি বিকল্প আলোচনায় রয়েছে—ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো। ইরানের ভেতরেই ‘ডাউন-ব্লেন্ড’ (কম সমৃদ্ধ করা) অথবা আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় রাখা। 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান কমপক্ষে ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক। অন্যদিকে ইরান প্রস্তাব দিয়েছে ৫ বছরের জন্য। এই ব্যবধানই এখন আলোচনার অন্যতম বড় বাধা।

চুক্তির সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
সূত্রগুলোর ভাষ্য, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে, যদিও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতভেদ রয়ে গেছে। এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। দেশটির সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে।

আলোচনা সফল হলে ইসলামাবাদে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।

দুই পক্ষের লক্ষ্য
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে সরানো। অন্যদিকে ইরানের লক্ষ্য হলো- নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃপ্রবেশ এবং স্থগিত সম্পদ ফিরে পাওয়া। 

তবে এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ, অতীতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এর ইরান চুক্তির সময় অর্থ ছাড়ের বিষয়টি কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প ও তার সমর্থকেরা। এবার একই ধরনের প্রস্তাব সামনে আসায় ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ প্রশ্ন উঠতে পারে।

এদিকে আলোচনার অগ্রগতির কথা স্বীকার করলেও ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন- ‘কোনো অর্থ লেনদেন হবে না।’ এতে আলোচনার বাস্তব অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

চুক্তি হলে কী হতে পারে?
এই চুক্তির ইতিবাচক দিক হলো- যুদ্ধের অবসান হবে। অন্যদিকে পারমাণবিক সংকট কমে আসবে এবং জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে। তবে ঝুঁকি হচ্ছে- ইরান পুরোপুরি প্রতিশ্রুতি রাখবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের বিশেষ করে ইসরায়েল আপত্তি জানাতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যতে নতুন সংকটের সম্ভাবনাও রয়েছে। 

‘ক্যাশ ফর ইউরেনিয়াম’
এই প্রস্তাব একদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত, অন্যদিকে বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ দিয়ে নিরাপত্তা কিনতে চাইছে। অন্যদিকে ইরান অর্থের বিনিময়ে চাপ কমাতে চাইছে। সম্প্রতি ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা আলোচনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই চুক্তি সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে- আর ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে।