অসীম চাহিদা, সীমিত সম্পদ। বৈশ্বিক কারণে সামনে গভীর সংকট। রাজস্ব খাতে বিশাল আকারের ঘাটতি। সরকারের সামনে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ। যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। আবার চড়া মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যয়ের লাগামও টানতে চায় সরকার। বৈশ্বিক এই সংকট সামলে মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে চায়। অন্যদিকে মানুষের অপ্রয়োজনীয় ভোগের মাত্রাও কমিয়ে আনতে চায়। তবে উন্নয়ন বাজেটে ছুরি চালাতে চায় না বিএনপি সরকার। কেননা উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে আনলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ভাটা কাটানো সম্ভব হবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে-বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুত বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং চলমান বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরি করা। বিশেষ করে চারটি নতুন কর্মসূচি-ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং খাল কাটা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, লাগাম টানতে চাইলেও চাহিদা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাস্তবতার কারণে তা পারছে না সরকার। ফলে আগামী বছরও (২০২৬-২৭) বাড়বে বাজেট ব্যয়। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কারণে সারা বছরই চাপে থাকবে সরকার। এজন্য সংকটকালেও বাজেটের আকার ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও প্রতি বছর সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১২ শতাংশের মতো বাড়ানো হয়। ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা খুব সক্রিয়ভাবেই আমলে নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের ফলে বিশ্বের অনেক দেশের সরকার চরম বেকায়দায় পড়েছে। বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে গভীর সংকট।
প্রবাসী আয় ব্যতীত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। রাজস্ব খাতে তৈরি হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকারের ঘাটতি। বাজেট বাস্তবায়ন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট তৈরির কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসা বিএনপি সরকার ব্যয় ও ভোগ সাশ্রয়ী বাজেটের কথা ভাবলেও যুদ্ধের কারণে পুরো পরিকল্পনাও বদলে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে অর্থবিভাগ। কেননা ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় দেশের মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এজন্য কৃচ্ছ্র সাধনের পথ পরিহার করে আবারও সম্প্রসারণশীল বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। যদিও সরকারের সামনে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে কৃচ্ছ্র সাধনের কথা বলে এলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। তবে ৫ আগস্ট-২০২৪ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে লাগাম দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তার ফলশ্রুতিতে ২০২৫-২৬ বাজেটের আকার কমিয়ে ধরা হয়।
যা ছিল স্বাধীনতার পর থেকে অর্থনীতির জন্য ইতিহাসে বিরল ঘটনা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রয়োজন বিরাট অঙ্কের অর্থ। মূলত এ তিনটি প্রধান কারণে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বড় আকারের ব্যয় পরিকল্পনা করছে। এ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কৌশল খুঁজছে এনবিআর। তবুও আগামী ২০২৬-২৭ বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি ধরা হতে পারে। তবে ঘাটতির এই মাত্রা সহনীয় রাখতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। গতকাল অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের রূপরেখা নির্ধারণে সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হারসংক্রান্ত কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সে বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে বাজেট ও অর্থনীতির সংকটের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। জানা গেছে, আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মোট আকার ধরা হতে পারে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো। যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
সে হিসাবে, আগামী বাজেট প্রায় ১৪ শতাংশ বড় হতে পারে চলতি বাজেটের তুলনায়। অতীতে প্রতিবছর সাধারণত ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে বাজেট বাড়ানো হতো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরই ছিল এর ব্যতিক্রম। যা কমানো হয়েছিল। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগামী অর্থবছরে এটি ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আসছে বাজেটে ২০২৬-২৭ মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে অর্থনীতিকে আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরাতে চায় সরকার। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। দীর্ঘ বিরতির পর বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসায় তাদেরও তো কিছু রাজনৈতিক পরিকল্পনা আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। ফলে আসছে বাজেটটা হবে সরকারের জন্য অনেক বড় পরীক্ষার বাজেট।