রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবৈধ কারখানা। এসব কারখানা থেকে প্রতিদিনই ঢাকার সড়কে নামছে শত শত অটোরিকশা। রাজধানীর বাইরের আশপাশের জেলা থেকেই আসছে এসব অটোরিকশা। অদক্ষ চালকরা এসব অটোরিকশা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন রাজধানীর অলিগলি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রশাসন অভিযান না চালানোর কারণে দিন দিন বাড়ছে এসব অবৈধ কারখানার সংখ্যা। কম বিনিয়োগে অধিক মুনাফার আশায় এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মহল্লায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে এই রিকশার সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। দৈনিক এসব রিকশা ব্যবহার করেন ১১ কোটির বেশি মানুষ। তবে, অটোরিকশার এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সমান্তরালভাবে বেড়েছে বিশৃঙ্খলা। নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও টাকা জমিয়ে দুই-চারটি রিকশা কিনে সড়কে নামাচ্ছেন।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরি ও বিক্রি করার একাধিক কারখানা খুঁজে পেয়েছে মানবজমিন। সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা, কেরানীগঞ্জ, বেড়িবাঁধ, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, কমলাপুর, তেজগাঁও, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায়, মূলত পাড়া-মহল্লাগুলোয় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য ওয়ার্কশপ। চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারি, মোটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে তৈরি চাকা, বসার সিট, রিকশার বডি যোগ করে এসব যান তৈরি করা হয়। অটোগুলোর কোনোটি চিকন চাকার, কোনোটির চাকা মোটা। কোনোটির কাঠামো লোহার, কোনোটিতে লোহার কাঠামোর সঙ্গে উপরে বেতের ছাউনি। কোনোটি শুধু পায়ে চালিত রিকশার মধ্যেই মোটর লাগিয়ে অটোতে রূপান্তর করা হয়েছে, কোনোটিতে আবার কাঠামো পরিবর্তন হয়েছে।
ঢাকার আশেপাশের জেলা নরসিংদী, গাজীপুর এলাকা থেকে সরাসরি তৈরি হওয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলে আসে ঢাকায়। বড় ট্রাকে করে এসব ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। কিছু রিকশা সরাসরি আসে না। সেসবের পার্টসগুলো আমদানি করতে হয়। আমদানিকৃত পার্টস ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলার দোকানে দোকানে বিক্রি হচ্ছে। কেউ পার্টস কিনে নিয়ে অর্ডার করে রিকশা তৈরি করেন, কেউ রেডিমেট রিকশা কিনে নেন।
ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা ও কমলাপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মেরামত ও বিক্রির কারখানা খুঁজে পাওয়া গেছে। তেজগাঁও এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্রেতা সেজে বিভিন্ন দোকান ও রিকশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কথা হয়। ওই এলাকার অনেক জায়গায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ছোট-বড় গ্যারেজের খোঁজ পাওয়া গেছে। আশপাশের এলাকা যেমন মগবাজার, হাতিরঝিল সমগ্র তেজগাঁও এলাকাসহ মহাখালী এলাকার অটোরিকশাগুলো এখানে মেরামত করা হয়। ওইসব এলাকার রিকশাচালকরা জানান, তেজগাঁও, মুগদা মিরপুর এলাকায় এ ধরনের রিকশার গ্যারেজ রয়েছে। তবে তেজগাঁওয়ে আশপাশের এলাকার রিকশা কেনাবেচা হয়ে থাকে।
গ্যারেজে গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের উপরেই সারি সারি ব্যাটারিচালিত রিকশা রেখে দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগই মেরামতের জন্য রাখা হলেও বিভিন্ন পার্টসপাতি দিয়ে নতুন অটো তৈরি করতে দেখা গেছে। গ্যারেজের মালিক পাশে ছাউনিতে বসে ছিলেন। গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ভিন্ন জায়গা থেকে আলাদা আলাদা পার্টস কিনে এনে দিলে ওই দোকানে আস্ত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বানিয়ে দিতে পারেন। প্রতিটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বানানোর জন্য ৩ হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক নেন। তিনি জানান, পার্টস কিনতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। পুরাতন অটোরিকশাও বিক্রি করেন তিনি। যদিও স্টকে তাৎক্ষণিক বিক্রির মতো কোনো রিকশা ছিল না।
পূর্ব তেজতুরি বাজারের রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় পার্টসের দোকানে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, সম্পূর্ণ রিকশার পার্টস ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। সেখান থেকে পার্টস কিনে বাইরের গ্যারেজগুলোতে নিয়ে পার্টস লাগিয়ে তৈরি করা হয় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। অটোরিকশার দোকানি জানালেন, প্রতিটি ব্যাটারির দাম ২৫-৩০ হাজার টাকা। এর বাইরে রিকশার বডি ও মোটর আলাদা করে কিনে নিতে হয়। রিকশার ফিটিংয়ের জন্য আলাদা ৫-৬ হাজার টাকা খরচসহ একটি রিকশায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়।
ঢাকায় সবচেয়ে বড় অটোরিকশা বিক্রয়ের মার্কেট খুঁজে পাওয়া গেল কমলাপুর এলাকায়। কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম গ্যালারির পেছনেই গড়ে উঠেছে রিকশা বিক্রির বিশাল মার্কেট। স্টেডিয়ামের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, বিভিন্ন দোকানের সামনে খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে অটোরিকশা। স্টেডিয়াম মার্কেটের সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি হচ্ছে, মিস্ত্রিরা লোহা ঝালাইয়ের কাজ করছেন। মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, কেউ রিকশার বডি তৈরি করছেন আবার কেউ ব্যাটারি ফিটিং করছেন।
ক্রেতা সেজে সেখানকার বিক্রেতা ও দোকান মালিকদের সঙ্গেও কথা বলেছে মানবজমিন প্রতিবেদক। সরজমিন স্টেডিয়াম মার্কেটে দেখা গেছে, কোনো দোকানে পার্টস বিক্রি হচ্ছে, কোথাও রেডিমেট অটো, কোথাও শুধুমাত্র ব্যাটারি বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতা ও দোকান মালিকরা জানান, সাধারণত, চায়না অটোরিকশা যা সরাসরি রেডিমেট হিসেবে ঢাকায় আসে। সেগুলোর দামও কিছুটা বেশি পড়ে। অন্যটি দেশীয়। যা পার্টস আমদানি করে নির্দিষ্ট দোকানের কারিগররা সেগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে নিজস্ব ডিজাইনে অটোরিকশা তৈরি করে। কমলাপুর স্টেডিয়ামের ব্যবসায়ীরা জানান, বিভিন্ন দামের অটোরিকশা বিক্রি করেন তারা। আলাদা আলাদা পার্টস কিনে বিভিন্ন মডেলের অটোরিকশা তৈরি করতে ৭৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে আড়াই লাখ টাকার প্রয়োজন পড়ে। বড় ৬-৭ জন বসতে পারে এমন অটো আড়াই লাখ টাকা; মিশুক অটো ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং চিকন ও ওজনে হালকা অটোরিকশা ৭৪ হাজার টাকায় বানানো যাচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার পাইকারি খুচরা দোকান আইকন ইজিবাইকের দোকান মালিক মো. মনির হোসেন বলেন, আমাদের দোকান থেকে চাইলে পার্টসপাতি কিনে অটোরিকশা বানানো যাবে, অথবা রেডিমেট অটোও আমরা বিক্রি করি। সেগুলোও কেনা যাবে।
যাত্রাবাড়ীর মৃধাবাড়ি এলাকার অটোরিকশাচালক সোহেল বলেন, আমি ভাড়ায় অটোরিকশা চালাই। প্রতিদিন জমা দিতে হয় ৩৫০ টাকা, ইনকাম হয় ৮০০-১০০০ টাকা। ব্যাটারিচালিত ছাড়া প্যাসেঞ্জার উঠতে চায় না। কারণ ওগুলোতে সময় বেশি লাগে। এই রিকশার কোনো লাইসেন্স নাই। পুলিশ ধরলেই ১২০০ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়। সরকার যদি লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে আর ঝামেলা পোহাতে হতো না। পুলিশ আমাদেরই ধরে অথচ যেখানে এই রিকশার কারখানা ওইখানে প্রকাশ্যে অটোরিকশা বিক্রি হচ্ছে। কারখানাগুলো বন্ধ করে দিলেই তো নতুন করে অটোরিকশা রাস্তায় নামবে না। যারা এই ব্যবসা করছে তারা একচেটিয়া ব্যবসা করে গিয়েছে।
একই কথা বলেন, গাইবান্ধা থেকে দিনমজুরের কাজ ছেড়ে আসা অটোরিকশাচালক সবুজ হোসেন। তিনি বলেন, অটোরিকশা বন্ধ করলে আমাদের কর্মসংস্থানের একটা ব্যবস্থা করে দিক সরকার। এখন পুলিশ রাস্তায় আমাদের রিকশা ধরে নিয়ে যায়, একবার ধরলেই ১২০০ টাকা দিয়ে থানা থেকে রিকশা ছাড়িয়ে আনতে হয়। সবসময় তো টাকা থাকে না। ১ দিনই ইনকাম করি মাত্র ১ হাজার টাকার মতো। তার মধ্যে ভাড়া দিতে হয় ৪৫০ টাকা। আমাদেরকে না ধরে যেখানে অটোরিকশাগুলো তৈরি হয় সেই কারখানাগুলো বন্ধ করুক। সেখানে কোনো অভিযান চালায় না। চিকন অটোরিকশার ভাড়া ৩৫০ টাকা আর মোটা চাকার অটোরিকশা ৪৫০ টাকা করে দিতে হয়। সরকার শুনেছি লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দিবে, সেটা করলে খুবই ভালো হয়। কমলাপুর, পোস্তাগোলা, মুগদা মেডিকেল, কামরাঙ্গীরচর ও তেজগাঁও এলাকায় এগুলোর কারখানা রয়েছে বলে জানান তিনি।