Image description

অধ্যাদেশ বাতিল বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শিশির মনির।

 

তিনি বলেন, গুম ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের যে ব্যাখ্যা সরকার দিয়েছে, তা আইনগতভাবে সঠিক নয়।

 

 

সোমবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ডাকা জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন।

 

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, গুম অধ্যাদেশে গুমের যে সংজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের যে সংজ্ঞা দুটি একই। এজন্য সরকার এটি বাদ করছেন- তাদের এই বক্তব্যটি আইনগতভাবে কোনো সঠিক কথা নয়।

 

শিশির মনির বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুম ‘ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি’-এর একটি অংশ, যা বিচারযোগ্য হতে হলে ‘ওয়াইডস্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হতে হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে আলাদাভাবে গুম করার ঘটনা এই আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে গুম অধ্যাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের সংজ্ঞা এক নয়- এ কথা স্পষ্ট।

 

তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইনে তদন্ত, সময়সীমা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনো বিধান নেই, সরকারের এমন বক্তব্যও সঠিক নয়। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে ৩০ দিনের সময়সীমা, তদন্ত প্রক্রিয়া ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

 

গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার নিজেই একে ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালিড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়।

বিচারকদের শোকজ নোটিশ নিয়ে শিশির মনির বলেন, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেছে। ফলে সেই আইনের ভিত্তিতে শোকজ করা ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’।

 

এছাড়া ব্যাংক রেজুল্যুশন অধ্যাদেশে নতুন ধারা সংযোজনের মাধ্যমে আগের মালিকদের কাছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

 

ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৯৩(ডি) অনুচ্ছেদের ৩০দিনের সময়সীমা শেষে দেখা যায়, ১১৭টি অধ্যাদেশ পাস হয়েছে-কিছু হুবহু, কিছু সংশোধিত আকারে; ৭টি রহিত এবং ১৬টি ল্যাপস হয়েছে। অর্থাৎ সংসদে উপস্থাপনই করা হয়নি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়গুলো ল্যাপস বা বাতিল করায় জনগণের প্রত্যাশা আন্ডারমাইন হয়েছে।

 

তিনি জানান, তারা দুই দফায় ওয়াকআউট করেছেন। বিশেষ কমিটিতে মতবিরোধহীন বিষয় পাস ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ থাকলেও তা মানা হয়নি। সংসদে কথা বলার সুযোগ না পাওয়ায় তারা বাইরে এসে বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলসহ কিছু সরকারদলীয় সদস্যের নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।

 

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ বিষয়ে কথা ছিল। বিশেষ কমিটিতে সরকারি দল বলেছিল এই বিলের ৮৬ অধ্যাদেশের অপরাধের কথা ও ৮৮ অধ্যাদেশে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলো যেহেতু সুন্দরভাবে ডিফাইন করা হয়নি, তাই এই বিধিটা ল্যাপস করা হবে। পরে দেখা গেল বিলটি সংশোধিত আকারে রাখা হয়েছে। বিল উত্থাপনের মাত্র ১০ মিনিট আগে বিলের কপি দেয়া হয় সংসদ সদস্যদের কাছে। আগের অধ্যাদেশকে ল্যাপস না করে নতুন বিল আকারে আনা হয়েছে। অধ্যাদেশে ব্যাংক ডাকাতদের অর্থ ফেরত না নিয়ে কেবল একটি অঙ্গীকার নিয়ে ব্যাংকগুলো ফেরত দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই অনিয়মগুলো হয়েছে।

 

জুলাই জাদুঘর বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিলের বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেননি। মন্ত্রীকে প্রধান করে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এমনকি পরিচালক যারা থাকবেন তাদের অপসারণের ক্ষমতা প্রধানকে দেয়া হয়েছে। বিলটি সংশোধিত আকারে পেশ করা হলেও আমাদের কোনো প্রকার নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এর ফলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা চূড়ান্তভাবে ওয়াকআউট করেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কামাল হোসাইন এমপি, জয়নুল আবেদীন এমপি, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সিনিয়র সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান প্রমুখ।