বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কূটনৈতিক প্রচারণার ক্ষেত্রে নানা উপায় গ্রহণের উদাহরণ আছে। বিগত সময় দেখা গেছে, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানরা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আম উপহার পাঠিয়েছেন, কূটনৈতিকভাবে যা ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়েছে। আমের পাশাপাশি উপহার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হয়েছে ইলিশ। এছাড়া বিদেশি অতিথিদের জামদানি শাড়ি উপহার দেওয়ারও নজির আছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনীতি এসব থেকে ভিন্ন। তিনি চিঠি পাঠিয়েই কূটনীতির সূচনা করেছেন। পর্যবেক্ষকরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতে প্রতিবছর আম পাঠানো হতো উপহার হিসেবে। ভারতের রাষ্ট্রপতি ধ্রুপদি মুরমু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এবং ভারতীয় অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যও আম ও মৌসুমি ফল পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বিদেশি কূটনীতিকদের স্ত্রীকে বাংলাদেশি জামদানি শাড়ি উপহার দেওয়া হয়েছে। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকেও পাঠানো হয়েছে আম। পাকিস্তান থেকে উপহার হিসেবে কেনু ফল এসেছে। ভারত থেকে রাখি বন্ধনের উপহার হিসেবে এসেছে মিষ্টি, রাখি এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের বাঁধানোর ছবি। ত্রিপুরা থেকে উপহার হিসেবে এসেছে আনারস। ভারতকে বিভিন্ন সময় পদ্মার ইলিশ উপহার দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের পক্ষ থেকে ভুটানের রাজা ও প্রধানমন্ত্রী, ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, নেপালের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের কাছে আম পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীকে হাঁড়িভাঙা আম উপহার দিয়েছেন ড. ইউনূস।
২০২৪ সালের ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ৮ আগস্ট। এরপর ১৮ মাস ক্ষমতায় থেকে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হবে সম্পূর্ণ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা দেশের মানুষের স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে। তিনি কোনও নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার কথা জানান।
তারেক রহমানের ফরেন পলিসির ব্যাখ্যা দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘‘পরস্পরের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, নন-ইন্টারফেরেন্স, কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, ন্যাশনাল ডিগনিটি, জাতীয় সম্মান-মর্যাদা এবং পারস্পরিক সুবিধা, একতরফা কিছু না। আমরা পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডে আমাদের জাতীয় স্বার্থ পই পই করে বুঝে নেবো। এক হিসাবে আমরা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ফরেন পলিসিতে ফেরত যাচ্ছি।’’
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার কিছু দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের কাছে একটি চিঠি লেখেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান চিঠিতে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরের চিঠিতে তিনি ১৯৭৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনের কথা জানান এবং উল্লেখ করেন, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন করা দেশের উন্নয়নের জন্য জরুরি। সেই চিঠিতে তিনি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও তুলে ধরেন।
১৯৮০ সালের ২ মে, বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নেতাদের কাছে দূত মারফত চিঠি পাঠান, যাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তার ভাবনার ভিত্তিতে ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠা হয়।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রপ্রধানদের চিঠি দেওয়ার সেই রীতি আবারও চালু করেছেন। ঈদের শুভেচ্ছা হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গত ২০ মার্চ চিঠি পাঠান তারেক রহমান। চিঠিতে তারেক রহমান ঈদ উপলক্ষে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের বন্ধন এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। এর আগে নরেন্দ্র মোদি ঈদের শুভেচ্ছা জানান ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সংহতি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার পক্ষ থেকে চিঠিগুলো বিশেষ দূত হিসেবে নিয়ে গেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির।
গত ৩০ মার্চ কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বরাবর একটি সংহতিপত্র পাঠান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ওই চিঠি হস্তান্তর করেন।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কাতারের নেতৃত্ব, সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি ব্যক্ত করেন। তিনি কাতারে বসবাসরত প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসীকে নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কাতার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। একইসঙ্গে কাতারের যেকোনও প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জরুরি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাতায়াতে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় কাতারের আমিরের মহানুভবতার কথাও তিনি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
এরপর ১ এপ্রিল ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিককে সংহতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করা হয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ বদর বিন হামাদ বিন হামুদ আল-বুসাইদীর সঙ্গে সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এ চিঠি পৌঁছে দেন।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ওমানের নেতৃত্ব, সরকার এবং ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ করেছেন। ওমানের ওপর হামলা এবং প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ জানান।
এছাড়া, ওমানে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে গৃহীত পদক্ষেপের জন্য ওমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রয়োজনে ওমান সরকারের পাশে থাকার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।
একদিন পর ২ এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে হুমায়ুন কবির দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের কাছে লেখা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করেন। চিঠিতে চলমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইউএই’র নেতৃত্ব, সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতি প্রকাশ করা হয়। আমিরাতে সাম্প্রতিক হামলা, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। পাশাপাশি দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। একইসঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দিতে অনুরোধ জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। উত্তরণ পেছানোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী ওই চিঠি দিয়েছেন।
তারেক রহমান ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীনের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। দিল্লি সফররত প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির ওই চিঠি মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতে বিজেপির আন্তর্জাতিক শাখার প্রধান বিজয় চোথাউওয়ালের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে চিঠির বিষয়বস্তু নিয়ে কিছু জানানো হয়নি।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি দিয়েছেন তারেক রহমান। আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চিঠিটি হস্তান্তর করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের পারস্পরিক চিঠি আদান-প্রদানের রীতি আছে। এটাকে কূটনীতিতে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়। তাদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি আনুষ্ঠানিক ও কৌশলগত মাধ্যম, যা অভিনন্দন, সমবেদনা বা বিশেষ বার্তা আদান-প্রদানে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি দেশের অন্য দেশের প্রতি বন্ধুত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, যা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ভাষায় লেখা হয় ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এটাকে কূটনীতির এক ধরনের প্রক্রিয়া বলা যায়। এক দেশের সরকার আরেক দেশের সরকারকে চিঠি দেওয়ার রীতি আছে। এর বাইরেও কূটনীতিক আদান-প্রদানের মাধ্যম আছে, তবে এটাকে আমি ভালো উদ্যোগই বলবো।’’
সাবেক একজন কূটনীতিক বলেন, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তাতে সংহতি জানিয়ে বার্তা দেওয়াও কিন্তু কূটনীতির অংশ। এতে কার জন্য কেমন সমর্থন, সহানুভূতি, সংহতি—তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বিপুল সংখ্যক কর্মী কাজ করেন এবং অবস্থান করছেন। তাদের স্বার্থে সংহতি জানানো জরুরি বলেও মনে করেন তিনি। সেটা যেকোনও মাধ্যমে হতে পারে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও চিঠি লিখতেন। তারই ফরেন পলিসির অংশ হয়তো তিনি অনুসরণ করছেন।’’