Image description

২০১৬ সালের ৩রা জুন। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের একটি বারে বাংলাদেশি তরুণী ফারহানা করিমের সঙ্গে পরিচয় হয় মার্কিন তরুণ গ্যারিসন রবার্ট লুট্রেলের। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্ম-সবকিছু ছাপিয়ে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় রূপ নেয় গভীর প্রেমে। সম্পর্কে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম। ফারহানা করিম মুসলিম, আর লুট্রেল ছিলেন খ্রিষ্টান। তবে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার টানেই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন লুট্রেল। ২০১৮ সালের ৩রা আগস্ট মুসলিম শরিয়াহ্ অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রেই শুরু করেন সংসার। বিয়ের দুই বছর পর তাদের সংসারে জন্ম নেয় প্রথম সন্তান ফাতমির ওয়াল ইকরাম লুট্রেল। ভালোই চলছিল দাম্পত্য জীবন। কিন্তু হঠাৎ করেই ফাটল ধরে সম্পর্কে। তিক্ততা থেকে বাড়ে দূরত্ব। একপর্যায়ে সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন ফারহানা। স্বামী লুট্রেলকে পাঠান তালাকের নোটিস। সন্তানের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেন ফারহানা। বন্ধ করে দেন যোগাযোগ। সন্তানকে ফিরে পেতে সুদূর আমেরিকা থেকে ঢাকায় আসেন লুট্রেল। দ্বারস্থ হন আদালতের। সন্তানের জিম্মা চেয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। মামলার শুনানি শেষে সপ্তাহে দু’দিন ছেলের সঙ্গে বাবার সময় কাটানোর সুযোগ দিতে আদেশ দেন বিচারক। কিন্তু আদালতের রায় তোয়াক্কা না করে সন্তানকে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান ফারহানা। সন্তানের মুখ এক নজর দেখতে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকায় অবস্থান করে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন লুট্রেল। কিন্তু তারপরও প্রতিকার পাচ্ছেন না।

লুট্রেলের অভিযোগ, ২০২৩ সালে ফারহানা কানাডিয়ান নাগরিক ৬২ বছরের রেইডাস কুইটিনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ায়। একদিন জানতে পারেন ফারহানা গর্ভবতী। এই কথা শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কীভাবে গর্ববতী হলো জানতে চাইলে ফারহানা তাকে জানান- তিনি তার বোনের জন্য টেস্টটিউব বেবি গর্ভে ধারণ করেছেন। এ নিয়ে শুরু হয় তাদের দ্বন্দ্ব। সম্পর্কে ধরে ফাটল। হঠাৎ জানতে পারেন- ওই ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন ফারহানা। ২০২৩ সালের ২৭শে জুন সন্তান প্রসবের জন্য ফারহানা করিম চলে আসেন বাংলাদেশে। এরপর থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ওই বছরের অক্টোবর লুট্রেলও বাংলাদেশে চলে আসেন। সন্তানের জিম্মা চেয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। তার আর্জি শুনে শিশু সন্তানসহ ফারহানা করিমকে আদালতে হাজির করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সে অনুযায়ী ২০২৩ সালের ২৮শে নভেম্বর আদালতে হাজির হন ফারহানা।

বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের বেঞ্চ লুট্রেল ও ফারহানার বক্তব্য শোনেন। পরে আদেশে বলা হয়, ঢাকার উত্তরা ক্লাবে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বড় ছেলের সঙ্গে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময় কাটাতে পারবেন লুট্রেল। তার আইনজীবী শহিদুল ইসলাম জানান, আদালতের আদেশের পরও ফারহানা করিম সন্তানের সঙ্গে বাবার দেখা করার সুযোগ দিচ্ছেন না। তিনি (লুট্রেল) যেন সন্তানকে পাওয়ার চেষ্টা করতে না পারেন, কোর্টের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, সেজন্য তারা (ফারহানার পরিবার) অনেকগুলো মামলা দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে। উভয়পক্ষে এ পর্যন্ত ১৬টা মামলা হয়েছে।
লুট্রেল আইনি পরামর্শদাতা এডভোকেট মো. মিজানুর রহমান জানান, জিম্মার শর্ত লঙ্ঘন করে শিশুসন্তানকে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে জিম্মা গ্রহণকারী ফারহানা করিমের বিরুদ্ধে আদালত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণ দর্শাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এই আইনজীবীর তথ্য মতে, গত ২রা ফেব্রুয়ারি শুনানিতে নিম্ন্ন আদালতের মূল নথি উপস্থাপন করা হলে বাদীপক্ষ ভিকটিম শিশু ফাতমির ওয়াল ইকরাম লুট্রেলকে উদ্ধারের আবেদন করেন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে উপস্থিত থাকলেও জিম্মা গ্রহণকারী ফারহানা করিমের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। শুনানিকালে জানানো হয়, উত্তরা পশ্চিম থানার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ফারহানা করিম তার সন্তানকে নিয়ে বাসা ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন। এতে জিম্মার শর্ত স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আদালত মত দেন।

এ প্রেক্ষিতে আদালত ২০২৪ সালের ৩রা নভেম্বর দেয়া জিম্মার আদেশ বাতিল করেন। তবে ভিকটিমের জিম্মা সংক্রান্ত বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশ উচ্চ আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করবে বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, জিম্মার শর্ত ভঙ্গ করে শিশু নিয়ে আত্মগোপন করায় ফারহানা করিমের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- সে বিষয়ে তার নিয়োজিত আইনজীবীকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আদালত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত ভিকটিমকে উদ্ধার করে আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদেশের অনুলিপি ঢাকা পুলিশ কমিশনার ও উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত ৭ই এপ্রিল দুপুরে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে উপস্থিত হন লুট্রেল। লুট্রেলের অভিযোগ, শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে আত্মগোপনে রয়েছেন ফারহানা। সন্তানের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন সময় তার কাছে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি চাই বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আমার সন্তানের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক এবং তাকে দ্রুত আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। বিষয়টি নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।