একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা বলি। মহান ’৭১-এ দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করার সময় মাইন বিস্ফোরণে একটা পা হারান। ক্রাচে ভর করে হাঁটেন। অনেকে তার পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ১
অবস্থা দেখে আহা উহু! করেন। হাত ধরে এগিয়ে দিতে চান। কিন্তু তিনি কারও সাহায্য নিতে নারাজ।
একদিনের ঘটনা। তিনি বাসে উঠেছেন। সিট খালি নেই। মহিলাদের জন্য বরাদ্দ রাখা সিটে একজন পুরুষ বসে আছেন। তার পাশের সিটটা খালি। বসে থাকা পুরুষটি ক্রাচে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই আসেন, এখানে বসেন। মুক্তিযোদ্ধা বসতে রাজি হলেন না। তিনি স্পষ্টভাষী। মহিলাদের সিটে বসা লোকটিকে বললেন, ভাই সিটটা মহিলাদের। আপনার উচিত সিটটা ছেড়ে দেয়া।
কক্সবাজার সী-বিচে ‘চ্যানেল আই’য়ের এক অনুষ্ঠানে তিনি হাজির। অনুষ্ঠানে প্রচুর লোকের সমাগম ঘটেছে। অনুষ্ঠানের ঘোষক ফারজানা ব্রাউনিয়া এক পর্যায়ে সেই মুক্তিযোদ্ধাকে মঞ্চে ডাকলেন। ব্রাউনিয়া দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কাছে পেয়েছি। আমরা এখন তার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনবো। দর্শক হাততালি দিলো। বীর মুক্তিযোদ্ধা কারও সাহায্য ছাড়াই ক্রাচে ভর করে মঞ্চে উঠলেন। তিনি কথা শুরু করতে যাবেন হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। দর্শকের অনেকেই যে যেদিকে পারে দৌড়াতে শুরু করে দিলো। ব্রাউনিয়া মাইকে বললেন, প্লিজ, আপনারা যাবেন না। একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী...সবই হতে পারবেন। কিন্তু কখনোই মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবেন না। এই যে মানুষটিকে দেখছেন, মহান ’৭১-এ এর চেয়েও প্রবল বৃষ্টি, ঝড়, ঝঞ্ঝা, তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। প্রতিপক্ষ পাকহানাদার বাহিনীর হাতে ছিল আধুনিক মারণাস্ত্র। অথচ কাঁধের রাইফেল নিয়ে তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বাধীন মাতৃভূমি বাংলাদেশ এই অকুতোভয় সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই অবদান। আকাশ থেকে কি আগুনের গোলা পড়ছে যে, আপনারা যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন? সামান্য বৃষ্টিই তো। আসুন রহমতের বৃষ্টিতে ভিজি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনি।
ব্রাউনিয়ার কথা শুনে দর্শক বক্তৃতা মঞ্চের দিকে ফিরে আসতে শুরু করলো। মুক্তিযোদ্ধা কথা শুরু করলেন এভাবেÑ একটা কথা মনে রাখবেন ঐক্যই শক্তি... ঐক্যেই মুক্তি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম বলেই জয়লাভ করেছি... অবাক বিস্ময়ে সবাই দেখলো বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ পরিষ্কার। মনেই হচ্ছে না একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বার বার সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার কথাই মনে পড়ছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের বয়স দুই মাসও হয়নি। অথচ সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যে পরিস্থিতির জন্য সরকার মোটেই দায়ী নয়। অথচ সরকারের ওপর অনেকে দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে প্রাণঘাতী যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গোটা পৃথিবীতে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। তেলের পাম্পের সামনে গভীর রাতেও গাড়ির লম্বা লাইন কমছে না। বরং গভীর রাতে লাইনের দৈর্ঘ্য আরও বড় হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনেও। জ্বালানি সংকটের কারণ দেখিয়ে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী দ্রব্যসামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে জ্বালানি তেল মজুত করার মাধ্যমে কৃত্রিম সংকটকে পাহাড় সমান সংকটে পরিণত করেছে। পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জ, অফিস-আদালত, পরিবারের খাবারের টেবিলেও প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে জ্বালানি সংকট। আমার একজন পরিচিত ব্যক্তি বললেন, ভাবছি ফেসবুকে আত্মীয়স্বজনের উদ্দেশ্যে একটা স্ট্যাটাস দিবো- আমাদের বাসায় বেড়াতে এলে মিষ্টির বদলে দুই লিটার হলেও তেল আনবেন, প্লিজ...
কথাটা কৌতুকের ভঙ্গিতে তিনি বলেছেন। কিন্তু এটাই বোধকরি বাস্তবতা। অথচ এর জন্য সরকার মোটেই দায়ী নয়। তার মানে এই নয়Ñ সরকার দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে যাবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অফিস- আদালতের সময় বদলে দিয়েছে। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বাণিজ্যিক বিপণি বিতান বন্ধ করতে বলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাসের সময়সূচিও হয়তো বদলে যাবে। সরকার এর চেয়ে আর কী করতে পারে? কিন্তু আমরা দেশের সাধারণ মানুষ এই সংকটকালে যার যার অবস্থান থেকে অনেক কিছুই করতে পারি। এমন কি করা যায় না, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য আমরা যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দেই। অথবা ‘জোর’ সংখ্যার গাড়ি একদিন, ‘বেজোড়’ সংখ্যার গাড়ি পরের দিন রাস্তায় নামাতে পারি। ঢাকা সহ সারা দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহনের প্রতি জোর দিতে পারি। শহরে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে আনা- নেয়া করার জন্য বাস-মিনিবাস ব্যবহার করা হয়। সকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে আনা-নেয়া করার জন্য বাস-মিনিবাস ব্যবহার করা হয়। সকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে আনার পর এই গাড়িগুলো সারাদিন অলস সময় কাটায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অফিসের এই বাস-মিনিবাসকেও দিনের কিছু সময়ের জন্য গণপরিবহনে রূপান্তর করা যেতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমবে। জ্বালানি সাশ্রয় হবে।
এখন প্রশ্ন হলো আমরা তা করবো কি করবো না? এমনও শোনা যায় জ্বালানি তেলের জন্য দেশের পাম্পগুলোতে এই যে এত দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে তা অনেকটা ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ কথাটার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
তেল যদি আর না পাওয়া যায়। এই আশঙ্কায় একই ব্যক্তি দিনে একাধিক পাম্প থেকে তেল নিচ্ছেন। আবার এমনও শোনা যায় বিভিন্ন পাম্পে তেল সংগ্রহ করে অনেকে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ফলে সংকটের ভয়াবহতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এখানেই আসে দেশাত্মবোধের প্রশ্ন। যিনি ভাবছেন সময় থাকতেই বেশি করে গাড়িতে তেল নিয়ে রাখি। আমি আগে বাঁচি। তারপর অন্যের কথা ভাববো।
ঝামেলাটা এখানেই। ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হতে না পারার ঝামেলা। পৃথিবীতে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে তার জন্য বাংলাদেশ মোটেই দায়ী নয়। অথচ বাংলাদেশকে কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন ‘আমি’ শব্দটাকে ‘আমরা’য় পরিণত করা। একবার ভাবুন তো শহর এলাকায় ট্যাপকলে চাপ দিলেই সহজে পানি মেলে। অথচ গ্রামাঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব প্রকট। পার্বত্য অঞ্চলের অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। ‘আমি’র জায়গায় ‘আমরা’ শব্দটা গুরুত্ব পায় বলেই গ্রামের মানুষ চরম সংকটেও কাতর হয় না।
ছোটবেলায় বেশ মনোযোগ দিয়ে একটা খেলা খেলতাম। একটা ছোট দাগ আঁকার পর প্রমাণ করতে হতো এটাই বড় দাগ। কীভাবে সম্ভব! ছোট দাগের নিচে আরও একটি ছোট দাগ বসিয়ে দিতাম। ব্যস আগের ছোট দাগটিই এখন বড় হয়ে যেত।
আসলে সবকিছু নির্ভর করে মানসিকতার ওপর। এখানেই মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাহস, শক্তি ও প্রেরণার উৎস হতে পারে। মহান ’৭১-এ দেশের প্রয়োজনে বাঁশের লাঠি ও কাঠের বন্দুক নিয়ে আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। ব্যক্তি আমি তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমরা শব্দটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমান সময়েও ‘আমরা’ শব্দটার গুরুত্ব প্রয়োজন। তেলের জন্য যখন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছি তখন যেন ভাবনায় গুরুত্ব পায় আমার প্রতিবেশী তেল পেয়েছে কিনা। আমার যেখানে ২০ লিটার তেল হলেই চলবে সেখানে ৫০ লিটারের জন্য এই পাম্প থেকে সেই পাম্পে দৌড়াবো কিনা?
শ্রদ্ধাভাজন মুক্তিযোদ্ধার সেই কথাটি মনে পড়ছে। তিনি সেদিন বলেছিলেনÑ ঐক্যই শক্তি। ঐক্যেই মুক্তি। চলমান সংকট নিরসনে ঐক্যের কোনো বিকল্প নাই।
ধনধান্য পুষ্প ভরা.. ও আমার দেশের মাটি... খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি... দেশের গানগুলোর সঙ্গে ‘সবার আগে দেশ’ ভাবনার গুরুত্বটাই এখন অনিবার্য সত্য।