বিরোধী দলের আপত্তির মুখেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ। আলাদা দু’টি বিল পাসের মাধ্যমে গতকাল এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীরবিক্রম। ‘সুপ্রিম কোর্টের
বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হয়। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। এই বিল পাসের ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বতন্ত্র এই সচিবালয়ের উদ্বোধনও করা হয়েছিল। বর্তমান আইনমন্ত্রী ও তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে বিচারালয় ফের পুরনো ধারায়ই ফিরে যাচ্ছে। অধ্যাদেশগুলো বাতিল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে বিচার ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। হতাশা প্রকাশ করেছেন আইনজ্ঞরাও।
দেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগের দাবি। নানা পক্ষের এই দাবির মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার এসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন।
সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়। ওই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত বছর ২০শে নভেম্বর অন্তর্বর্তী সররকারের অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০শে নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়। এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়ে করার কথা। গত ১১ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গতকাল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এতে আপত্তি জানান বিরোধী দল জামায়াত দলীয় সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে। বিচার বিভাগ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ায় কিছু বিচারককে শোকজও করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগে মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হতো, এখন সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাইকোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তন অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে এবং মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত’ হয়েছে। সে অনুযায়ী বিচারিক কার্যসম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছে।
জামায়াতের এই এমপি বলেন, সে রায় বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। সেখানে রায়টি স্থগিত হওয়া কিংবা বাতিল হওয়া ছাড়া এটিকে বিলুপ্ত করা, সেই সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার জন্য বিল আনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার শামিল। বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোরও প্রস্তাব দেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, রহিতকরণ বিলটি অসাংবিধানিক। এটা কোনোভাবেই পাস করা যাবে না। সংসদ সার্বভৌম বলে আদালতের রায় না মানার যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, তা জনমতকে বিভ্রান্ত করছে। তিনি একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কেউই সার্বভৌম নয়; সংবিধানের সীমার মধ্যেই তাদের কাজ করতে হয়। কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে আদালত সেটি বাতিল করতে পারে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়নি। সে অবস্থায় এখন রহিতকরণ বিল আনা জনগণের সঙ্গে ‘প্রতারণার’ শামিল।
বিরোধী দলের এই সদস্যের জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কিনা, তা বলতে পারে; কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করতে ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না। মাসদার হোসেন মামলার বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারে, কিন্তু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত। সেই সুপ্রিম কোর্ট থেকেই ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ এর জন্ম হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচারের অভিযোগও উঠেছে। সেই সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছর থেকে ১০ বছর জেল দিয়েছিলেন। রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চালানো হয়েছে। এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট একজন বিচারকের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
বিচারকদের শোকজ দেওয়ার বিষয়ে বিরোধী দলের এমপি’র অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কেউ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। কেউ কেউ ক্লাস নেয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, কেউ কেউ ফেসবুকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাজির হচ্ছেন। সে কারণেই তাদের বিষয়ে নোটিশ দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মতো প্রশ্নে আরও আলোচনা ও যাচাই-বাছাই দরকার। পরে কণ্ঠভোটে নাজিবুর রহমানের আপত্তি নাকচ হয় এবং বিলটি পাস হয়। এই বিল পাসের পর আইনমন্ত্রী ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের জন্য প্রস্তাব করেন। এতে আপত্তি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, অতীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তাতে ‘দলীয় আনুগত্যসম্পন্ন ও বিতর্কিত’ ব্যক্তিরাও বিচারপতির পদে যেতে পেরেছেন। বিচারপতিরা সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েও কীভাবে ‘রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে’ বিচারকার্য চালিয়েছেন, কীভাবে বেগম খালেদা জিয়ার সাজার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার গোড়াতেই সমস্যা ছিল।
আখতার হোসেন বলেন, এই যে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ তৈরি হলো, খায়রুল হকের মতো বিচারপতি তৈরি হলো। আখতার বলেন, কোনো একটা ঘুড়িকে আপনি আকাশে উড়িয়ে দিয়েছেন, সেই ঘুড়ির নাটাই যদি আপনার হাতে থাকে, ঘুড়িকে আপনি যতই উড়ার স্বাধীনতা দেন না কেন, আকাশের মধ্যে সেই ঘুড়ি সেখানেই পাক খাবে, আপনি যখন টান দেবেন, তখন আপনার কাছেই ফিরে আসবে। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ ও ৪৮ অনুচ্ছেদে প্রধান বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়ে কি বলা হয়েছে, তা তুলে ধরেন তিনি।
তার ভাষায়, এই কাঠামোর কারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নিয়োগ সম্ভব হয়েছে। সেই ধরনের একটা পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনের দিনে চলুক, এটা তো আমরা কেউই চাই না। অন্তর্বর্তী সরকারের আনা অধ্যাদেশে বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করা হয়েছিল। ওই অধ্যাদেশে বয়স, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক গুণাবলী ও প্রকাশনার মতো যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা অতীতে ছিল না। অধ্যাদেশটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণার জন্য রিট হয়েছিল, কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দিয়েছিল। সেই অধ্যাদেশের মধ্যে কোনো অসাংবিধানিকতা নাই।
আখতার হোসেনের এই বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তাত্ত্বিকভাবে তিনি বিরোধী সদস্যের বক্তব্যের সঙ্গে একমত যে অতীতে বিচারপতি নিয়োগে ভয়াবহ সমস্যা ছিল। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আমলে পার্টি ক্যাডারদেরকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে খায়রুল হকের জন্ম হয়েছে। সরকারও চায় বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হোক, ভালো বিচারপতি নিয়োগ হোক, সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক।
তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি আগে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ছিল তৎকালীন সরকারের পক্ষে আইনি অবস্থান তুলে ধরা। এখন তিনি এই সরকারের মন্ত্রী, আর সরকারের নীতি হলো-বিচার বিভাগে নিয়োগে ‘সম্পূর্ণরূপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’ নিশ্চিত করা।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিচারক নিয়োগের বিষয়টি সংবিধানে নয়, আইনে করার কথা বলেছে। সেই অবস্থান থেকেই সরকার বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের পথে যেতে চায়। তিনি বলেন, আমরা বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবো। আমরা সংবিধান সংশোধনের যে বিশেষ কমিটি করতে চাচ্ছি, আমরা সেই কমিটির কাছে ফিরে যাই। বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, মানদণ্ড, কাঠামো ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সব প্রশ্নই সেই আলোচনায় আসতে পারে। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো খায়রুল হক গজায় উঠুক। আমরা চাই না আর কোনো বিচার বিভাগীয় কিলিং হোক। পরে কণ্ঠভোটে আখতার হোসেনের আপত্তি নাকচ হয়ে যায় এবং বিলটি পাস হয়। বিল পাসের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারপতির নামের শেষে একটি বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ‘অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই বাছাই’ দরকার হওয়ায় এই রহিতকরণ বিল আনা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, অধ্যাদেশ দু’টির অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে। একইসঙ্গে সচিবালয়ের হাতে থাকা বাজেট, গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচি আইন ও বিচার বিভাগে হস্তান্তরিত হবে। সচিবালয়ের জন্য সৃজিত পদও বিলুপ্ত হবে। তবে অধ্যাদেশ বাতিলের পরও সুপ্রিম কোর্ট, রেজিস্ট্রি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, অধস্তন আদালত ও অন্যান্য দপ্তরের জন্য সৃজিত পদ, সাংগঠনিক কাঠামো, যানবাহন ও অফিস সরঞ্জাম বহাল থাকবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেগুলো আইন ও বিচার বিভাগে ন্যস্ত হবে।
বিলে আরও বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চাকরি অধ্যাদেশ জারির আগে যে আইনে পরিচালিত হতো, বাতিল হওয়ার পর আবার সেই আইনের অধীনেই তা পরিচালিত হবে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া: সুপ্রিম কোর্ট অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আইন অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট শিশির মনির গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্তকে বিচার বিভাগের জন্য ‘কালো দিন’ হয়ে থাকবে। তার ভাষায়, এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হাইকোর্টের রায় আপিল নিষ্পত্তির পর কার্যকর হবে। তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে শিশির মনির বলেন, কোনো রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ না থাকলে তা মানা বাধ্যতামূলক। এই নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অধ্যাদেশ বাতিল করা সংবিধানের পরিপন্থি বলে তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল হলে আইনি শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের এক রিটে হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার রায় দেন। ওখানে সচিবালয়ের নির্দেশনা আছে। কাজেই সচিবালয় না থাকলে তো ওইটা আদালতের রায় পরিপন্থি হবে। আর এই অধ্যাদেশ বাতিল হলে বিচার বিভাগ আগের অবস্থায় ফিরে যাবে কিনাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সব আগের অবস্থায় চলে যাবে বলাটাও এত সহজ হচ্ছে না। কারণ হাইকোর্টের একটা রায় আছে। এই রায় তো নির্বাহী বিভাগ মানতে পারতো। আপিলও করে নাই। আপিল করে স্টেও তো নেয় নাই।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মনজিল মোরশেদ মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটিতে একটু গ্যাপ ছিল। আমরা ওটা নিয়েও সমালোচনা করেছি। কারণ বিচারপতি নিয়োগ কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। এতেও স্বচ্ছ নিয়োগ সম্ভব ছিল না। তাই আমি বলবো অধ্যাদেশটি বাতিল করার সময় যেহেতু সরকার বলেছেন তাদের ইশতেহার অনুযায়ী তারা বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় নতুন আইন করবেন। এখন দেখা যাক তাদের নতুন আইন হয় কিনা। এবং তাদের আইনে কি রাখা হয়। এখন এই অধ্যাদেশ বাতিল হলেও তারা যদি এরচেয়ে ভালো একটি আইন করেন, তখন সমালোচনা করার কিছু থাকবে না। আমি তাদের কিছুদিন সময় দিতে চাই। এবং দেখতে চাই বিএনপি কি করে। তখন সমালোচনা করা যাবে। আর বিএনপি যদি এটা বাস্তবায়ন না করে তবে এটা বিচারবিভাগের জন্য অত্যন্ত খারাপ হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী এডভোকেট মহসিন রশিদ মানবজমিনকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে বিএনপি যেটা করলো, তা খুবই দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। বিএনপি’র কাছ থেকে কেউ এটা আশা করেনি। কারণ গত ১৭ বছর আওয়ামী বিচারবিভাগে দ্বারা তারাই সবচেয়ে বড় ভিকটিম ছিলেন। এই চেষ্টা তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। বিএনপি চাইলে ইন্টেরিমের অধ্যাদেশ সংস্কার করতে পারতো, কিন্তু একবারে বাতিল করে দেয়া দূরভিসন্ধিমূলক। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে একটি বড় বিষয় ছিল বিচারবিভাগের সংস্কার।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশে কি ছিল: ২০২৫ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ করে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। মূলত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাইপূর্বক প্রধান বিচারপতি কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ প্রদানের উদ্দেশ্যে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশে কি ছিল: এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটি বিষয়ক সব সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় এই সচিবালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির ওপর থাকবে এবং সচিবালয়ের সচিব প্রশাসনিক প্রধান হবেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। পরে অধ্যাদেশটি সংশোধন করে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ওপর ন্যস্ত করার লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করা হয়।
সরকার কেন অধ্যাদেশগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলো: সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা ও পরামর্শ কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচারক নিয়োগের অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে বলা হয়, বর্তমান ব্যবস্থায় সরকার ও বিচারবিভাগের মধ্যে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ রয়েছে। বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের (বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা) বিষয়ে সরকারের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ ব্যবস্থায় বিচারকরা কারও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। ফলে তাদের একজন ব্যক্তির অন্যায় সিদ্ধান্তের শিকার হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এতে আরও বলা হয়, অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। সরকারের সঙ্গে কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। অবশ্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা ও পরামর্শ প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংশোধনীসহ অধ্যাদেশটি সংসদে পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে; কিন্তু সংসদের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশ করে। এ নিয়ে বিশেষ কমিটিতে থাকা বিরোধী দলের তিন সদস্যের আপত্তি ছিল।