Image description
ভোগাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট

দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, গত মার্চে পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৪৮ কোটি ডলার, যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে রপ্তানি ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর রপ্তানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি। সাধারণত মাসিক রপ্তানি আয় ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে থাকলেও মার্চে তা উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে এসেছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, টানা আট মাস রপ্তানি ক্রমাগত কমছে। দেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি কমার ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। রপ্তানির এ নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কম দামে পণ্য সরবরাহ করে বাজার দখলের চেষ্টা করছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর চাপ বাড়ছে।

পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা রপ্তানি খাত আরও চাপে ফেলতে পারে। মার্চে রপ্তানির বড় পতনের একটি তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ঈদুল ফিতর। এ সময় গড়ে ৮ থেকে ১০ দিন শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন ও জাহাজীকরণ কার্যক্রম কমে যায়। ফলে মাসজুড়ে রপ্তানি আয় কমে যায়।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকেও বড় ধাক্কা লেগেছে। মার্চে এ খাতের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আয় হয়েছে ২৭৮ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ৩৪৫ কোটি ডলার।

শুধু পোশাক নয়, অন্যান্য বড় খাতেও নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ, ওষুধে ২০ শতাংশ, সবজিতে ৪৫ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ৭ শতাংশ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ শীর্ষ পাঁচটি খাতেই রপ্তানি কমেছে, যা সামগ্রিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বর্তমানে ক্রয়াদেশ কমে গেছে, তার ওপর উৎপাদন খরচ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলা যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় এ সংকট আরও বাড়তে পারে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং দ্রুত নীতিগত সহায়তা দেওয়া না হলে রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। রপ্তানি কমলে অনেক কিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। তা ছাড়া রপ্তানির সঙ্গে দেশের অনেক কিছু জড়িত থাকে। যদি রপ্তানি কমে তাহলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র?্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘রপ্তানির এ ধারাবাহিক পতন দেশের বৈদেশিক আয়ের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসি কৌশল সব মিলিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বাজার খোঁজা এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি।’