গ্যাস সংকটে একে একে দেশের সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানাসহ বেশ কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এদিকে, বোরো মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সময়মতো সার না পেলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ধান ও ভুট্টা চাষে ইউরিয়া সারের চাহিদা বেশি থাকায় এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সার সংকটে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানায় (পিএলসি) ২৭ দিন পর সার উৎপাদন শুরু হয়েছে। এ সম্পর্কে ব্যুরো ও প্রতিনিধির পাঠানো খবর-
চট্টগ্রাম ও কর্ণফুলী : দেশের দুই বৃহৎ সার কারখানা সিইউএফএল ও কাফকোর সরবরাহ অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাধ্যমে ডিএপিএফসিএলে ইউরিয়া সার উৎপাদন হয়ে থাকে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে কারখানা দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অ্যামোনিয়া সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। ১০ দিনের মধ্যে অ্যামোনিয়া সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ডিএপিএফসিএলের সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এ বিষয়ে ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনুল হক বলেন, এ কারখানায় অন্য সার কারখানার মতো বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হয় না। আবাসিক এলাকায় ব্যবহৃত গ্যাসের মতো স্বল্প গ্যাস দিয়ে কারখানা চালু রাখা সম্ভব। তবে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য সিইউএফএল ও কাফকো থেকে অ্যামোনিয়া সরবরাহ না পাওয়ায় আগামী সপ্তাহ থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) : ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (এসএফসিএল) উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সংকটে এক মাসের জন্য সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, ২৮ মার্চ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে জরুরি সভায় এসএফসিএল ও আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে এপ্রিল-জুন রেশনিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আলোকে শুক্রবার থেকে ফেঞ্চুগঞ্জের সার কারখানা এক মাসের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার গ্যাসের ‘রেশনিং বা নিয়ন্ত্রিত বণ্টন নীতি’ গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার পাওয়ায় শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শাহজালাল সার কারখানায়। শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) রেজাউল করিম বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মে মাসের আগে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এজন্য সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : গ্যাস সংকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অচল অবস্থায় পড়ে থেকে ঝুঁকির মুখে পড়ছে কারখানার কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার ইউরিয়া সার উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। এতে মাসে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকার।
এদিকে, কারখানাটি চালুর দাবিতে কারখানার শ্রমিক ও কর্মচারীরা একাধিকবার আন্দোলন, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে কারখানাটি চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। এ বিষয়ে আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু কাউসার বলেন, বিদেশি সার আমদানিকারক কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিতে সরকারের ভেতরে থাকা একটি অসাধু চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের সার উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কারখানাটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে, চলতি সংসদ অধিবেশনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সার কারখানাটি দ্রুত চালু করার দাবি জানিয়েছেন। আশুগঞ্জ সার কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, গ্যাস পাওয়া গেলে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কারখানা পুনরায় উৎপাদনে যেতে পারবে।
জামালপুর : গ্যাস সংকটে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে এ ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও দেখা দিতে পারে। যা দেশের কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
যমুনা সার কারখানার জিএম অপারেশন ফজলুল হক যুগান্তরকে জানান, ২৩ মাস কারখানা বন্ধ থাকার পর চলতি বছর চালু হয়। কিন্তু চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করায় পুনরায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, এখানে প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ টন দানাদার ইউরিয়া সার উৎপাদন হয়। এ কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় দিনমজুররা মজুরি না পেয়ে পরিবার নিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এদিকে, বোরো মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
পলাশ (নরসিংদী) : ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কারখানায় ২৭ দিন পর সার উৎপাদন শুরু হয়েছে। ৩১ মার্চ পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করায় ধাপে ধাপে উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করা হয়। সোমবার পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু হয়েছে। এর আগে ৪ মার্চ থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলে উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ফখরুল আলম জানান, কারখানাটি চালু রাখতে প্রতিদিন ৭২ পিএসআই গ্যাস প্রয়োজন।
গ্যাস সংকটে ভবিষ্যতে উৎপাদন আবারও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে তিতাস গ্যাসের সরবরাহ ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।