জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর দেড় বছরের বেশি সময় অন্তর্ধানে থাকার বিষয়টি রহস্যে ঘেরা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি উধাও ছিলেন। আওয়ামী লীগের অনেক হেভিওয়েট নেতা একে একে গ্রেফতার হলেও ছয়টি মামলার আসামি হয়েও রীতিমতো এতদিন দেশেই আত্মগোপনে ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী, যা হতবাক হওয়ার মতো বিষয় এবং তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্বর্তী সরকারের সময় আত্মগোপনে থেকেই স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রাণ বাঁচাতে সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন-এমন তথ্য প্রকাশ পায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে। তবে সেখান থেকে বের হওয়ার পর তিনি কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মুখরোচক তথ্যও ছড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে তিনি গ্রেফতার এড়িয়েছিলেন-এমন আলোচনাও রয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রিফাইন্ড বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগের হাল ধরা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। তাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত করার জোর আলোচনাও রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
অবশেষে দেড় বছরের বেশি সময় আত্মগোপনে থাকার পর মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় জাতীয় সংসদের সাবেক এই স্পিকারকে। রাজধানীর লালবাগ থানা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যাচেষ্টার এক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে মঙ্গলবার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করে রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ নম্বর সড়কের ৫৭ নম্বর বাসার এ/৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মঙ্গলবার ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে গ্রেফতার করা হয় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। গ্রেফতারের সময় একেবারেই স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশকে সহায়তাও করেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, ধানমন্ডির ওই বাসাটি তার এক চাচাতো ভাইয়ের। সেখানেই তিনি ছিলেন। তবে কতদিন ধরে সেখানে অবস্থান করছিলেন, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ফলে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে তিনি এতদিন আসলে কোথায় ছিলেন এবং কেন তাকে এতদিন গ্রেফতার করা হয়নি-সেসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখন পর্যন্ত অজানা ও রহস্যঘেরাই থাকছে। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি (শিরীন শারমিন চৌধুরী) জানিয়েছেন, এতদিন দেশের মধ্যে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন।’
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মুখে ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের প্রথম সারির বেশির ভাগ নেতা ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। যারা পালাতে পারেননি, তাদের অনেকে গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। এছাড়া অনেকে গ্রেফতারও হন।
জনরোষে প্রাণহানির আশঙ্কায় সেসময় অনেকে বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সাধারণ পুলিশ সদস্যও ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
ওই সময় আইএসপিআর-এর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে এবং আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে জীবন রক্ষা করতেই তাদের সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও গত বছরের ২২ মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতার সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল। এদিকে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান।
শিরীন শারমিন কীভাবে সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, এর একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের আদালতে দেওয়া একটি জবানবন্দিতে। গত বছরের এপ্রিলে পলক আদালতকে জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে ‘লুকিয়ে ছিলেন’। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান। কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন জুনাইদ আহমেদ পলক। কিন্তু শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো খোঁজ তখনও পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ অন্তত ছয়টিতে আসামির তালিকায় নাম রয়েছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসাবে জাতীয় সংসদে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরপর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসনটি ছাড়ার পর ওই আসনে নির্বাচন করেন শিরীন শারমিন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার একই আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
নবম সংসদের শেষদিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেসময়কার স্পিকার আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতি করে আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১৩ সালে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি টানা তিন মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি। পরে কমনওয়েলথ স্কলার হিসাবে যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১০ সালে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভূমিকার জন্য তিনি এশিয়া সোসাইটি হিউম্যানিটারিয়ান সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।