পুলিশ সংস্কার নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হলেও বাহিনীটিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব বলয়ে রাখার মানসিকতা ও আমলাতন্ত্রের প্রভাবে আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর আবারও পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের করা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে পুলিশ প্রধান (আইজিপি) নিয়োগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলির সিদ্ধান্তে পুলিশের অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন সুপারিশ যুক্ত হয়। তবে সদ্য নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের করা পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ‘সংশোধন’ করে বিল হিসাবে উপস্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়ায় বাহিনীর সদস্যরা নাখোশ।
সাবেক একাধিক আইজিপিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ সংস্কার কমিশন নিয়ে আগে থেকেই বাহিনীর মধ্যে নানা প্রশ্ন ছিল। বর্তমান সরকার পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাশ করলে তাতে কমিশনকেই দুর্বল করা হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পুলিশের ওপর রাজননৈতিক ও আমলাতন্ত্রের প্রভাব টিকে থাকলে স্বাধীন পুলিশিং কখনো সম্ভব হবে না। দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে নিন্দিত হতে চায় না পুলিশ। সব ধরনের চাপমুক্ত রেখে শুধুমাত্র আইনের মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা চায় সবাই। তাহলেই কেবল জনবান্ধব পুলিশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে বলে মনে করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এই কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত আকারে সংসদে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করে। সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে ১৫টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল করা ও ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে, অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। যে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, তার একটি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা ও পরামর্শ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী, কমিশনের কাজ হবে আইজিপি নিয়োগের সুপারিশ করা। তবে এই ধারাটি বাদ দিয়ে বিলটি সংশোধিত আকারে সংসদে উত্থাপন হতে যাচ্ছে। এছাড়া আরও কিছু শব্দ বাদ দেওয়া হচ্ছে। যেমন-জনবান্ধব। এর ফলে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতা ও নাগরিক সমাজের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জনবান্ধব পুলিশিংয়ের স্বপ্ন ভেস্তে যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সংস্কার তো বাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। অধিকাংশ সদস্যের চাওয়া, আমরা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে নিন্দিত হব না, জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেব না, অন্যের কারণে কাঠগড়ায় দাঁড়াব না। কিন্তু কেন এটি আলোর মুখ দেখে না, সেটি বোধগম্য নয়। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মহলসহ অনেক স্টেকহোল্ডার সরকারকে বোঝায় যে, পুলিশ সংস্কার হয়ে গেলে তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তাদের দিয়ে ইচ্ছেমতো ছড়ি ঘুরানো যাবে না। তবে পুলিশের চাওয়া আইনের মধ্যে থেকে দেশ ও জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করা। একইসঙ্গে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের নিশ্চয়তা।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, সংস্কার কমিশন অধ্যাদেশের নানা বিষয় বাদ দিয়ে বিল আকারে উপস্থাপনে মনে হচ্ছে বর্তমান সরকারের পুলিশ সংস্কারে সদিচ্ছা নেই। আগেও একাধিকবার এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকায় আলোর মুখ দেখেনি। কাটছাঁট করে নতুন করে অধ্যাদেশটি পাশ করা হলেও সেটি একটি নামকাওয়াস্তে কাগুজে কাঠামো ছাড়া আর কিছুই হবে না।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশ বাহিনীকে একটি জনবান্ধব এবং পেশাদার বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন তার কোনো প্রতিফলনই অধ্যাদেশটিতে নেই। এটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবিত বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, এ অধ্যাদেশ বলে যদি পুলিশ কমিশন গঠিত হয়, তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান, যা এ ধরনের কমিশনের মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাস পর ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্কার কমিশন একটি পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত। তবে এটি সাংবিধানিক সংস্থা নাকি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হবে, সে সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং পুলিশি সেবাকে জনবান্ধব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি ‘পুলিশ কমিশন’ গঠন করা হবে।
এই কমিশনের উদ্দেশ্য হবে-১. শৃঙ্খলা বাহিনী হিসাবে পুলিশ যাতে আইনানুগ ও প্রভাবমুক্তভাবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়, তা নিশ্চিত করা; ২. পুলিশ বাহিনীর যে কোনো সদস্যের উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তিকরণ; ৩. নাগরিকদের পক্ষ থেকে পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিষ্পত্তি করা।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি পুলিশ অধ্যাদেশ সংশোধনের সুপারিশ করলেও কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সংসদ-সদস্য ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দেন। তারা অধ্যাদেশটি ‘অপরিবর্তিত’ অবস্থায় পাসের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা বলেন, এই কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব আইজিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুপারিশ করা। এতে আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হলে পুলিশ বাহিনী রাজনৈতিক প্রভাব মুক্তভাবে পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনী হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে।
পুলিশের সদ্য সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম যুগান্তরকে বলেন, একজন সাধরণ কনস্টেবল থেকে ঊর্ধ্বতন সবার দাবি, সব ধরনের চাপমুক্ত থেকে কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। পুলিশের যে দায়িত্ব, বিশেষ করে মামলা তদন্ত ও পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। একইভাবে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা পুলিশ সংস্কার কমিশন নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও সংস্কার যে বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটিতে আশাব্যঞ্জক ছিল বাহিনীর সদস্যদের কাছে। জুলাই সনদে পুলিশ কমিশনের অধীনে পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সাধারণ সদস্যরা যেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে পারেন, সেই সুযোগ থাকা দরকার ছিল।