Image description

তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে হাই কোর্টের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। এই রায়ে পুনর্বহাল করা হয়েছে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ।

গত ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছিলেন। দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর গতকাল ১৮৫ পৃষ্ঠা পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এ রায়ের ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ (নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও ছুটি) এবং শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষমতা ফিরল সুপ্রিম কোর্টের কাছে।

রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে এ পর্যন্ত যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তা অবৈধ ও অসাংবিধানিক উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সংবিধানের চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীর অধীনে ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যে শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন করে, তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে রায়ে।

আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। ইন্টারভেনর হিসেবে রুল শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল (বর্তমান আইনমন্ত্রী) মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান। রুল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে মতামত দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। রায় প্রকাশের পর রিটকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের যে রায় প্রকাশিত হয়েছে, তা মানতে সরকার বাধ্য। আমরা মনে করি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপিত হলো। সরকার এই রায়ের পরিপন্থি কোনো আইন করলে তা অসাংবিধানিক হবে। রায়ের সঙ্গে মিল রেখে জাতীয় সংসদ ও সরকার ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করছি।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্টে বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিপন্থি কোনো আইন সংসদ প্রণয়ন করতে পারে না। যদি এমন আইন করা হয়, তবে তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধান সাধারণ কোনো আইন নয়। সংবিধানের কোনো বিধানকে যখন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়, তখন পূর্ববর্তী বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত বা পুনর্বহাল হয়ে যায়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলা, ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবিধানিক মামলার রায়ে এ দৃষ্টান্ত রয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছিল-বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বিনষ্ট হবে। কিন্তু হাই কোর্ট মনে করে এ যুক্তি সঠিক নয়। কারণ সংবিধানে বলা আছে বিচার বিভাগ প্রভাবমুক্ত থাকবে। তা ছাড়া রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের (আইন বিভাগ, শাসন বা নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ) মধ্যে ক্ষমতার যে পৃথকীকরণ নীতি, বিদ্যমান ১১৬ অনুচ্ছেদ সে নীতিকে খর্ব করেছে। কারণ, রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের একটি আরেকটির ওপর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না। সে কারণে আমরা মনে করি, বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক। এজন্য তা বাতিল ঘোষণা করা হলো। একই সঙ্গে আদি (বাহাত্তরের) সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলে সেটি হবে ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন।

চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের পরিবর্তিত ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ অনুচ্ছেদের অধীনে ২০১৭ সালে প্রণীত জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছর ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাত আইনজীবী রিট করেন।

রিটে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চাওয়া হয়। প্রাথমিক শুনানির পর গত বছরের ২৭ অক্টোবর হাই কোর্ট রুল দেন। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ-সংক্রান্ত ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে।

একই সঙ্গে কেন সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা-ও জানতে চাওয়া হয় রুলে। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এ রুলে চূড়ান্ত শুনানির পর রায় দেন উচ্চ আদালত।