Image description

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের আবদারে কেনা হয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই মেশিন। কিন্তু ব্যয়বহুল এসব ভোটিং যন্ত্রের বেশির ভাগ অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিছু গেছে খোয়া। অবশিষ্টগুলোও নষ্টের পথে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগকৃত কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়- ইভিএম আর কখনো ব্যবহার করা হবে না। এমনকি আইন করেই বাতিল হলো ভোট প্রয়োগের এই যন্ত্রটি। রাষ্ট্রের অর্থে কেনা এই অকেজো মেশিন হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা। নির্বাচনে প্রয়োগ হবে না। কিন্তু বছরের পর বছর যোগ হচ্ছে মজুতকরণ ভাড়া। অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রের অর্থ। এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠন হওয়া নির্বাচন কমিশনও কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না। পুরোপুরি নষ্ট হতে যাওয়া এই ইভিএম নিয়ে গত ২০ মাসেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে নিম্নমানের ইভিএম কিনে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের অভিযোগে একটি অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেটিও গত এক বছরে শেষ হয়নি।

ইসি সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ) ৮৬ হাজার ২৩৩টি, সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুর অঞ্চলে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনা অঞ্চলে ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশাল অঞ্চলে ৫ হাজার ৮৭টি, ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম রয়েছে। নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট ও দু’টি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫৭টি। সবমিলিয়ে ইসির হিসাবে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। বাকি ১ হাজার ৫৯৯টির কোনো হদিস নেই। প্রতিটি ইভিএম কেনা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। সে হিসাবে ১ হাজার ৫৯৯টি ইভিএমের মূল্য প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা।

সূত্র আরও জানায়, ইভিএমের ভাড়া বাবদ বিএমটিএফ ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করছে। এতে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ধরা হয়েছে ১৩৪ টাকা। বকেয়া টাকা দিতে ও ওয়্যারহাউজ খালি করতে সর্বশেষ গত ১৫ই ডিসেম্বর ইসিকে চিঠি দিয়েছে বিএমটিএফ। তবে প্রকল্পের ডিপিপিতে ইভিএম সংরক্ষণের বিষয়টি না থাকায় বকেয়া টাকার বিষয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। যার কারণে এই টাকা পরিশোধ করতে পারছে না ইসি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। ফলে এ বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া, মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় ইভিএম রাখতে যে গুদাম ভাড়া করা হয়েছে, তাতে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকার ওপরে ভাড়ার নামে গচ্চা যাচ্ছে। কারণ ইভিএম সংরক্ষণের জন্য যেসব সুবিধা থাকা দরকার, তার কিছুই নেই এসব গোডাউনে।

বিভিন্ন সময় ইভিএম নিয়ে যেই প্রশ্ন উঠেছিল যেমন ইভিএমে কারচুপি করা যায় সেটি কি আপনারা কোনো তদন্ত করছেন কিনা জানতে চাইলে ইসি’র সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে বলেছি যে জাতীয় নির্বাচনে এটা ব্যবহার হয়নি এবং স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে আমাদের এখনো পর্যন্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে ‘না’। এখানে দুর্নীতি দমন কমিশন একটা বিষয়ে তদন্ত করছে। অডিট ডিপার্টমেন্ট থেকে একটা করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের তিনটি নির্বাচন নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। যে জিনিসগুলো পর্যালোচনার ভেতরে আছে, সে বিষয়ে আমার কথা বলাটা বোধহয় সমীচীন হবে না।

তাহলে কতোদিন ইভিএমের জন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা হবে- এমন প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, আপাতত আমার কাছে টাইমলাইন নেই। টাইমলাইন দিতে পারলে তো আমি সবচাইতে খুশিই হতাম। আমি যদি বলতাম আগামী এতদিনের ভেতরে এটা হবে- তাহলে তো আমার জন্য সবচাইতে ভালো হতো। এখন আমি অব দ্য পকেট কিছু বলতে পারবো না। ইভিএমের পেছনে আমাদের যে সংরক্ষণ ব্যয় তার অ্যাকাউন্টিংটা করা নেই।

২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে চেয়েছিল হাবিবুল আউয়াল কমিশন। সে কারণে নতুন করে আরও ২ লাখ ইভিএম কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় ওই কমিশন। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। সে সময় ইসি জানায়, ৪০ হাজার ইভিএম মেরামত অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বাকি প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম মেরামত করতে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা দাবি করেছিল বিএমটিএফ। ইসির মতে, বিএমটিএফ ইভিএমগুলোকে ব্যবহারযোগ্য করতে মেশিনগুলোর ব্যাটারি, তার, টাইমার এবং অন্যান্য কিছু অংশ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। তাতেও সরকার সাড়া দেয়নি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কোনো ইভিএম শতভাগ ভালো থাকার কথা নয়। কারণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুন মাসে। ২১ দিন পরপর ইভিএমের ব্যাটারি চার্জ দিতে হয়। কিন্তু গত দেড় বছর ইভিএমগুলো ওভাবেই পড়ে আছে। তা ছাড়া, মাঠপর্যায়ে যেখানে ইভিএম সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেগুলোর দরজা-জানালা সার্বক্ষণিক বন্ধ থাকা উচিত এবং স্যাঁতসেঁতে হওয়া যাবে না। পাশাপাশি ওই জায়গা বন্যা বা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সেখানে বাতাস চলাচলের জন্য ফ্যান থাকতে হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যেখানে ইভিএম সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গায় এ ধরনের সুবিধা নেই।