Image description

দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। লালবাগে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে প্রেরণ করেছেন আদালত। মঙ্গলবার ভোরে ধানমণ্ডির একটি বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে নেয়া হয়। পরে লালবাগ থানার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। তার দুইদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি নিয়ে রিমান্ড ও জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ওদিকে দীর্ঘদিন পর শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ায় নানা কৌতূহল দেখা দিয়েছে। এতদিন তিনি কোথায় কীভাবে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি জামিন পেতে পারেন কিনা? এমন সব প্রশ্ন এখন মুখে মুখে। ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে গেলেও সেই সময়ের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিষয়ে কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছিল না। মাঝে তার পাসপোর্ট করার তথ্য সামনে আসলে নতুন করে আলোচনা হয়। কিন্তু শিরীন শারমিনের অবস্থান ছিল রহস্যে ঘেরা। ৫ই আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের আলোচনায়ও শিরীন শারমিনের নাম ছিল। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন আরও নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। বাড়ছে কৌতূহল।

যেভাবে গ্রেপ্তার: গণ-অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে ধানমণ্ডির ৮/এ রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং লালবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
লালবাগ থানায় করা ওই মামলার বাদী মো. আশরাফুল ওরফে ফাহিম। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১১৫ থেকে ১২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। যেখানে শিরীন শারমিন তিন নম্বর আসামি। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ই জুলাই বিকাল ৫টা থেকে ৫টা ৪০ মিনিটের মধ্যে লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ নিরস্ত্র আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।

শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ নেতাদের পরিকল্পনায় পুলিশ ও দলীয় কর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেন, যাতে বহু মানুষ আহত ও নিহত হন। বাদী আশরাফুল উল্লেখ করেন, তিনি নিজেও ওই ঘটনায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন। তার বাম চোখ, মাথা, মুখমণ্ডল, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে এবং তিনি এখনো চিকিৎসাধীন। তিনি দাবি করেন, ঘটনাস্থলে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে ডিবি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এ মামলায় শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন। তিনি বলেন, লালবাগ থানার মামলায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আদালতে ২০ মিনিট: দুপুর ১টা ৫৫ মিনিট। কঠোর পুলিশি প্রহরায় আদালতে আনা হয় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরীকে। রাখা হয় সিএমএম আদালতের হাজতখানায়। ২টা ১২ মিনিটে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে তোলা হয় এজলাসে। বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এজলাস কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। ২টা ১৫ মিনিটের দিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের লালবাগ জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন দুই দিনের লিখিত রিমান্ড আবেদন পড়ে আর্জি জানান।

প্রায় ২০ মিনিটের শুনানিকালে পুরো সময়ই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন শিরীন শারমীন চৌধুরী। এ সময় তাকে বিষণ্ন চেহারায় নিশ্চুপ থাকতে দেখা যায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ঘটনার সঙ্গে শিরীন শারমিন চৌধুরীর সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মামলার অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে পরিকল্পনা ও নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, মামলায় আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি আদালতকে আরও বলেন, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তিনি অনেক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্তসহ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটন সম্ভব হবে বলে মনে করছে। পুলিশ আশঙ্কা করছে- আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পালিয়ে যেতে পারেন এবং তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতের কাছে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করছি।

পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে বলেন, এ মামলায় শিরীন শারমিন ৩ নম্বর আসামি। ২৪-এর কোটাবিরোধী আন্দোলনে হাজার শিক্ষার্থী মারা যায়। শিরীন শারমিন চৌধুরী ফ্যাসিস্টের সহকারী ছিলেন। বিনা ভোটের এমপি ছিলেন। তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি এজাহারনামীয় আসামি। এ মামলায় কারা জড়িত এবং আন্দোলনে কারা হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তদন্তের স্বার্থে এসব জানা প্রয়োজন। এ ছাড়াও আরও সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়ার জন্য, গুলির নির্দেশদাতাদের বের করার জন্য তাকে দুইদিনের রিমান্ড দেয়া হোক।

এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা শিরীন শারমিন ছিলেন পুরোপুরি নিশ্চুপ। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী যখন বলেন, ‘তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত’, তখন তাকে না-সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে দেখা যায়।

এরপর আসামিপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী কথা বলার চেষ্টা করেন। পরে রিমান্ড বাতিল চেয়ে ব্যারিস্টার মামুন আদালতকে বলেন, একমাত্র শিরীন শারমিন নিজে পদত্যাগ করেছেন। আর কেউ পদত্যাগপত্র জমা দেননি। এজন্য উনি সবার মতো না। তাকে এজাহারে ৩নং আসামি দেখানো ছাড়া আর কোনো তথ্য কিন্তু অভিযোগে নেই। মামলায় ২৪ এর ১৮ই জুলাইয়ের ঘটনা দেখিয়েছে। কিন্তু মামলা করেছে ২৫ এর মে মাসের ২৫ তারিখ। অর্থাৎ ১০ মাস ৭ দিন পরে মামলা করেছে। উনি একজন আইনজীবীর পাশাপাশি ক্লিন ইমেজের মানুষ। এ ছাড়াও তিনি একজন নারী। এই বিবেচনায় তার রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করা হোক।

আইনজীবী কাওসার বলেন, বাদীর গুলি লেগেছে। তার জন্য আমাদের সহানুভূতি আছে। কিন্তু আসামি তো সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তখন তিনি রানিং স্পিকার। তার যেতে হলে তো প্রোটোকল নিয়ে যেতে হবে। এ ধরনের মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই। এ ছাড়া, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন অসুস্থ, বয়স্ক মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। পলাতক থাকলে শরীরের যা হয়, তাই হয়েছে। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তার রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করছি। আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেজবাহ বলেন, যখন কেউ স্পিকার হিসেবে শপথ নেন, তখন আর দলীয় কোনো পদ থাকে না। তিনি নিউট্রাল হয়ে যান। ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

‘জয় বাংলা’ স্লোগান ও আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি: এরপর আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তাকে আবার সিএমএম আদালত থেকে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় আওয়ামীপন্থি কয়েকজন আইনজীবী ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। তখন হুড়োহুড়িতে সিঁড়িতে পড়ে যান তিনি। আঘাত পেয়ে শিরীন শারমিন চিৎকার করে ওঠেন।

শুনানিতে আদালতে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। আদেশ ঘোষণার পর আসামিপক্ষের আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা এজলাসের ভেতর হট্টগোল শুরু করেন। পরে মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। এজলাস থেকে বের হয়েই আদালতের বারান্দায় জয় বাংলা বলে স্ল্লোগান দিতে থাকেন আইনজীবীরা। এ সময় তাদের ‘শিরীন শারমিন ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ বলেও স্লোগান দিতে দেখা যায়। শিরীন শারমিনকে যখন সিএমএম কোর্টের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানো হচ্ছিল, এসময় আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাপক ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। ভিড়ের চাপে তিনি সিঁড়িতে পড়ে যান। এসময় নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত ধরে টেনে তোলেন।

২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসাবে জাতীয় সংসদে আসেন শিরীন শারমিন। তাকে দেয়া হয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। নবম সংসদের শেষ দিকে তৎকালীন জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর স্পিকারের দায়িত্ব থেকে প্রেসিডেন্ট হন আবদুল হামিদ। এরপর ২০১৩ সালে ৩০শে এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। তারপর থেকে তিন মেয়াদে তিনিই টানা স্পিকারের চেয়ারে ছিলেন।