Image description

মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট নিরাপত্তা পরিস্থিতির ৩৮ দিন পার হয়েছে। এ সময়টাতে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে। এতে করে ওই সব রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না বিভিন্ন এয়ারলাইন্স। প্রতিদিনই বাতিল হচ্ছে অনেক ফ্লাইট। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ই এপ্রিল পর্যন্ত বাতিল হয়েছে ৯৭২টি ফ্লাইট। ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারার কারণে এয়ারলাইন্সগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার সঙ্গে বড় সংকটে পড়েছে দেশের ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরা। একমাসের উপরে স্বাভাবিক ফ্লাইট চালু না থাকায় টিকিট, ভিসা প্রসেসিংসহ কোনো কাজই করতে পারছে না এজেন্সিগুলো। অনেকটা অলস ও বেকার সময় কাটাচ্ছেন এজেন্সির মালিক-কর্মচারীরা। অফিস ভাড়া থেকে শুরু করে কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না অনেক এজেন্সির মালিক। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে এভিয়েশন খাতে বড় বিপর্যয় আসবে। শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ই মার্চ ৩৩৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ১০ই মার্চ থেকে ১৯শে মার্চ বাতিল হয়েছে ২৭৫টি, ২০শে মার্চ থেকে ২৯শে মার্চ ২২৬টি ও ৩০শে মার্চ থেকে ৬ই এপ্রিল ১৩২টি নিয়ে এখন পর্যন্ত ৯৭২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এভিয়েশন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশ্ব রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ এভিয়েশন শিল্পেও। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পথপরিক্রমার কারণে খরচের বোঝা সামলাতে পারছে না অনেক এয়ারলাইন্স। কিন্তু ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারলেও পার্কিং চার্জ, মেইনটেন্যান্স খরচসহ সবকিছু বহন করতে হচ্ছে। একইভাবে ফ্লাইট ওঠানামা না করায় সিভিল এভিয়েশন অথরিটির আয় কমেছে। এক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বেবিচকের আয়েও প্রভাব পড়েছে। বড় ধরনের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওভারফ্লাইং চার্জ ও ল্যান্ডিং ফি থেকে বড় আয় আসে। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যকার রুটে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার কমে যাওয়ায় সংস্থাটির রাজস্বে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্স এখন দক্ষিণ এশীয় রুট এড়িয়ে বিকল্প পথে চলায় বেবিচকের মাসিক আয় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে। শাহ্জালালে সাধারণত প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে এবং ৪৫ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। সংঘাত শুরুর পর প্রতিদিন গড়ে ৪২টি ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। ফলে অবতরণ ও পার্কিং ফি, নেভিগেশন চার্জ, যাত্রীসেবা ফি, নিরাপত্তা ফি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ থেকে আয় কমে গেছে। বাংলাদেশে সব বিদেশি এয়ারলাইনসকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ের মতো ফ্লাইট না থাকায় ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও লোকসানে পড়েছে। টিকিট বিক্রি করতে না পারা, ভিসা প্রসেসিং করতে পারছে না এজেন্সিগুলো। এমন পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে থাকলে অনেক ছোটখাটো ট্রাভেল এজেন্সিতে তালা ঝুলবে। কারণ তারা অফিসের কর্মচারীদের বেতন, অফিস ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক সকল খরচ চালাতে পারছেন না। তবে এখনও চলার মতো অবস্থা আছে। তবে আরও ২/১ মাস যদি এই অবস্থা চলতে থাকে তবে অনেক ট্রাভেল এজেন্সি কর্মচারী ছাঁটাই শুরু করবে। অনেকে ছোট পরিসরে অফিস নিবে। আর একেবারে ছোটখাটো এজেন্সিগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

এদিকে, জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি হওয়াতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের টিকিটের মূল্য বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের উপর। এছাড়া ফ্লাইটবিহীন বিভিন্ন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ পার্কিং ফি দিয়েও পকেট খালি হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোর। সবমিলিয়ে এভিয়েশন খাতের এই মন্দা কাটাতে গিয়ে বেগ পেতে হবে।
গো ওয়াল্ড এভিয়েশনের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম মানবজমিনকে বলেন, ব্যবসা কমে গেছে। আমাদের প্রবাসী যাত্রীরা দেশে আসতেও পারছে না আবার যেতেও পারছে না। স্বল্প পরিসরে কিছু ফøাইট চললেও ভাড়া বেশি। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে আরও সংকট তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যারা ব্যবসা করে তাদের জন্য বেশি সমস্যা হচ্ছে। আল সামিও ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস এর মালিক শাকিল ইসলাম লতিফ মানবজমিনকে বলেন, পরিস্থিতি ভালো না। বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট যাচ্ছে না। এজন্য যাত্রীরা যাওয়া-আসা করতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে আমার স্টাফ কমিয়ে আনতে হবে। অফিস ভাড়া কমানোর সুযোগ নাই। এ ছাড়াও অন্যান্য খরচও কমিয়ে আনতে হবে।

আটাবের সাবেক সভাপতি ও এয়ার স্পিড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম আরেফ মানবজমিনকে বলেন, দেশের প্রায় ৭০ ভাগ এজেন্সি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ব্যবসা করে। শ্রমিক যাত্রীদের আসা-যাওয়া, যেসব যাত্রী ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়া-আসা করেন তারাও মধ্যপ্রাচ্যর রুট ব্যবহার করেন। কিন্তু এই রুটে অনেক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই ট্রাভেল এজেন্সিগুলো অলস সময় কাটাচ্ছে। তাদের কাজকর্ম নাই। এভাবে কতদিন টিকে থাকবে? অনেক ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ সব রুটেই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক রুটেও ভাড়া বাড়িয়েছে এয়ারলাইন্স। এতে করে সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাহিরে চলে গেছে ভাড়া। সবার পক্ষে টিকিটের খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো স¦াভাবিক না থাকায় অনেক যাত্রী আসতে যেতে পারেনি। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ঢাকায় এসে তারা আবার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ব্যবহার করেন। সেটিও হচ্ছে না। তিনি বলেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ রুটে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ভাড়া বাড়ালে হয়তো খরচ এডজাস্ট করা যাবে কিন্তু বাস্তবে যাত্রী কমে যায়। সেটার প্রভাবও পড়ছে। যাত্রীরা এখন আকাশপথ ব্যবহার না করে অন্য রুটে যাতায়াত করছে। এতে করে এভিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট সবখাতে গিয়ে প্রভাব পড়ছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট ও যাত্রী কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ফ্লাইট পরিচালনা করে এমন এয়ারলাইন্স বড় ধরনের চাপের সম্মুখীন হয়েছে। ফ্লাইট পরিচালনা না করলেও তাদের মেইনটেন্যান্স খরচ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি সিভিল এভিয়েশন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ এয়ারপোর্টে একটা বিমান ল্যান্ড করলে গ্রাউন্ডহ্যান্ডেলিং চার্জসহ সার্ভিসচার্জ দিতে হয়। ফ্লাইট না নামার কারণে সেগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যাত্রীরা কোথাও যেতে পারছেন না এজন্য ট্রাভেল ট্যাক্স পাচ্ছে না। সরকারও বিভিন্নভাবে রাজস্ব হারাচ্ছে। এজেন্সিগুলো টিকিট বিক্রিসহ কোনো কাজই করতে পারছে না। তারা অলস সময় কাটাচ্ছে। এছাড়াও দেশ থেকে প্রচুর কার্গো বিমান যায় এবং বিদেশ থেকেও কার্গো আসে। এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এটা থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে যদি চলতে থাকে কিছু এয়ারলাইন্স অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে। আর অনেক ট্রাভেল এজেন্সিও বন্ধ হয়ে যাবে।