Image description

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সংসদ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিতের প্রস্তাব করলেও অধস্তন আদালতের বিচারকরা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।

পৃথক বিবৃতিতে আলাদা আলদা দিনে এমন কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, সপ্তদশ বিজেএস (বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস) ফোরাম ও ইয়াং জাজেস ফর জুডিসিয়াল রিফর্ম।

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরের মাসে সচিবালয়ের উদ্বোধন করা হয়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এই অধ্যাদেশগুলো আপাতত আইনে পরিণত হচ্ছে না।

 

পৃথক এ সচিবালয়ের জন্য একজন সচিব, ১৫ জন জুডিশিয়াল অফিসার এবং ১৯ জন স্টাফ ইতোমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিৃবতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সুস্পষ্টভাবে জানাতে চায় যে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অ্যাসোসিয়েশন এবং বিচারকদের মধ্যে কোনো প্রকার বিভক্তি নেই, বরং বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক এবং আর্থিক স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অ্যাসোসিয়েশনের সকল সদস্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।

 

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাসোসিয়েশন প্রত্যাশা করে যে, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটি যথাযথ পর্যালোচনা শেষে দ্রুত আইন হিসেবে প্রণীত হবে এবং বিচার বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সপ্তদশ বিজেএস (বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস) ফোরাম বিবৃতিতে বলে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় নবগঠিত সরকারকে আমরা, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৭শ ব্যাচের বিচারকবৃন্দ, আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সদ্য প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কাঠামোকে স্বাগত জানাই এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা সমুন্নত রাখার বিষয়ে গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।

 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলায় যে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের প্রতিষ্ঠা সেই রায়ের বাস্তব প্রতিফলন। একইসাথে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা ইশতেহারে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং জুলাই সনদে সর্বসম্মতিক্রমে এর গ্রহণযোগ্যতা বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সুস্পষ্ট প্রকাশ। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে এই কাঠামোগত অগ্রগতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার স্বার্থে জেলা আদালতের বিচারকগণের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ছুটি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়াবলি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রেখে সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের আওতায় ন্যস্ত করা অপরিহার্য। একইসাথে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায় সক্ষম না করলে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে না।

 

বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের কার্যকর পৃথকীকরণ, বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিচার প্রশাসনের আধুনিকায়ন-এসব বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি। বিচারকগণ যেন নির্ভয়ে, স্বাধীনভাবে ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

পরিশেষে, আমরা, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৭শ ব্যাচের বিচারকবৃন্দ, জোরালোভাবে প্রত্যাশা করি যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের এই অগ্রযাত্রা কোনো প্রকার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধায় ব্যাহত হবে না; বরং এটি সময়ের সাথে আরও সুদৃঢ়, কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে বিকশিত হবে। একইসাথে আমরা সংশ্লিষ্ট সকল মহলের প্রতি আহ্বান জানাই, বিচার বিভাগের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখার জন্য, যাতে জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার আরও সুসংহত হয় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়।

ইয়াং জাজেস ফর জুডিসিয়াল রিফর্মের বিবৃতিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবগঠিত সরকারসহ নির্বাচিত সকল সাংসদকে ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিসিয়াল রিফর্ম’-এর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে, যা মহামান্য আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে এবং সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের সেই যুগান্তকারী রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যকরভাবে পৃথক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে আংশিক পৃথকীকরণ হলেও অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ কার্যত নির্বাহী বিভাগের হাতেই থেকে যায়। জারিকৃত অধ্যাদেশ সেই অসম্পূর্ণ যাত্রাকে পূর্ণতা দেওয়ার সূচনা করেছে।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারি দল বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার ৯ নং দফায় স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে; অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হবে এবং বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে। পাশাপাশি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ২০ নং দফায় অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করতে সংবিধান সংশোধনের অঙ্গীকার রয়েছে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ অংশে পৃথক সচিবালয়কে আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল স্পিরিট ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। জুলাই জাতীয় সনদে দেশের সকল প্রধান রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়েছে। এই জাতীয় ঐকমত্যকে সম্মান জানানোই নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব বলে ইয়াং জাজেস ফোরাম মনে করে।

এমতাবস্থায় ‘ইয়াং জাজেস ফর জুডিসিয়াল রিফর্ম’ সরকারের নিকট সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ আইন হিসেবে পাস করার জোর দাবি ব্যক্ত করছে। একইসাথে রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার এবং জুলাই জাতীয় সনদের ঐকমত্য অনুযায়ী বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনেরও অনুরোধ জানাচ্ছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জনগণের সাংবিধানিক অধিকার এবং আইনের শাসনের মূল ভিত্তি। জনগণের রায়ে দেশ পরিচালনার এই সুযোগে সরকার বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতকল্পে জারিকৃত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংসদে পাস করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এটাই আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।