সিলেটে কি ছিনতাই হচ্ছে না! নাকি পুলিশের চোখে ছিনতাই ধরা পড়ছে না। কোনটি সঠিক। কেউ বলতে পারছেন না। প্রায় ঘটনাকেই পুলিশ ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করছে। খতিয়ে দেখার আগেই বলে দিচ্ছে ফলাফল। এমন ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। গতকাল সন্ধ্যায় তো সিলেট জেলা প্রেস ক্লাব নেতৃবৃন্দ এ নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে- সিলেটে কি ছিনতাই হচ্ছে না? কিন্তু হাউজিং এস্টেট, সাগরদিঘীরপাড়, তালতলা ও সর্বশেষ দুই সাংবাদিক ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ার ঘটনা তাহলে কী? সিলেটে অপরাধ শক্ত হাতে পুলিশ কন্ট্রোল করতে পারছে না। এ কারণে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরছে না। নানা ঘটনা ঘটছে সিলেট পুলিশের ভেতরে। সরকার বদলের পর কে কোন ভালো জায়গায় যাবেন- এ নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ সরকার দলের সাজার অন্তহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গত শনিবার সিলেটে পরপর দু’টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
আক্রান্ত হওয়া সাংবাদিক দৈনিক যুগভেরীর সিনিয়র রিপোর্টার রায়হান উদ্দিন জানিয়েছেন, ভোরে নগরের তেমুখীতে ছিনতাইকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ঢাকা থেকে আসার পথে তেমুখীতে সিএনজি অটোরিকশায় আসা ছিনতাইকারীরা তার সর্বস্ব লুট করার চেষ্টা চালায়। এতে বাধা দিলে রায়হানের ওপর অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অপর ঘটনা ঘটে বেলা পৌনে ৩টায় নগরের ঈদগাহ্ রোডে। শিশুপুত্রকে নিয়ে সাংবাদিক-প্রভাষক ওহি আলম রেজা যখন ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলেন, তখন সিএনজি অটোরিকশাতে বসা ছিনতাইকারীরা শিশুর দিকে অস্ত্র তাক করে সাংবাদিক পিতা রেজার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। এর আগের রাতে নগরের তালতলা এলাকায়ও সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা এক পথচারীর ওপর হামলা করে। এই তিনটি ঘটনা নিয়ে যখন নগরবাসী রীতিমতো আতঙ্কে তখন সিলেট নগর পুলিশ দাবি করে তালতলা ও তেমুখীর ঘটনা ছিনতাই নয়। পূর্ব বিরোধের জের ধরে তালতলা ও ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার জের ধরে তেমুখীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
প্রশ্ন দাঁড়ায়- পুলিশ কীভাবে এত দ্রুতই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করলো। অথচ দু’টি ঘটনার ভুক্তভোগীরা বারবারই বলছেন তারা ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। এর আগে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনাকারীদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। সিলেট নগর এখন ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য। নগরের এমন কোনো রোড নেই যে এলাকায় ছিনতাই হচ্ছে না। এটি এখন থেকে নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে নগরে ১০-১২টি চক্র দাপিয়ে ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে। হাউজিং এস্টেট ও সাগরদিঘীরপাড়ের ঘটনায় আসামি ধরা হয়েছে বলা হলেও দুটো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা খোদ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ভয়ে কিছুই বলছেন না। একদিকে পুলিশের চাপাচাপি, অন্যদিকে ছিনতাইকারী চক্রের চোখ রাঙানিতে ভয়ে তটস্থ তারা। ফলে যারাই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই মুখ বুঝে সয়ে যাচ্ছেন। আবার যারা পুলিশের কাছে যাচ্ছেন তারাও নানা ঝামেলায় পড়ছেন। ফলে নগরে নীরব ছিনতাইয়ের ঘটনা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে।
শনিবারের দুটো ঘটনায় সিলেট নগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মো. মঞ্জুরুল আলম মানবজমিনকে জানিয়েছেন, শাহী ঈদগাহ্ রোডের ঘটনা ছিনতাই হতে পারে। সেটি পুলিশ তদন্ত করছে। ইতিমধ্যে সিসিটিভি’র ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু তেমুখীর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডায় এ ঘটনা ঘটেছে। জালালাবাদ থানার ওসি ফাইন্ডিংয়ে এমনটি খুঁজে পেয়েছেন। তবে যুক্তি উপস্থাপন করে সাংবাদিক রায়হান জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে ফেরার পথে বাসায় ফিরতে সিএনজি-অটোরিকশাতে সিগন্যাল দিয়েছিলাম। সিএনজিতে ছিনতাইকারীরা ছিল জানতাম না। কৌশলে গাড়ির নম্বর রাখার পর সেটি পুলিশকে দেই। আর পুলিশ এখন নিজেরা রেহাই পেতে যারা জড়িত ছিল, তাদের নিয়ে উল্টো ঘটনা সাজাচ্ছে। তিনি বলেন, ঘটনায় তিনি পুলিশের কাছে বিচার না পেলে আদালতে যাবেন। ছিনতাইয়ের ঘটনাকে মারামারির ঘটনায় প্রবাহিত করা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সাংবাদিক আক্রান্তের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সিলেট জেলা প্রেস ক্লাব। রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সিলেট জেলা প্রেস ক্লাব সভাপতি মঈন উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এই উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বলেন, মহানগর এলাকায় অপরাধ প্রবণতা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তাও চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, নগর জুড়ে মোটরসাইকেল ও সিএনজি-অটোরিকশা ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রের ধারাবাহিক ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। পুলিশি টহল এবং চেকপোস্ট বসানো সত্ত্বেও প্রকাশ্য দিবালোকে কিংবা রাতের আঁধারে ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনা সিলেট নগরীর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টির প্রতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে। গতকাল ৪ঠা এপ্রিল সিলেট জেলা প্রেস ক্লাবের সদস্য রায়হান উদ্দিন ও ক্লাবের সাবেক সদস্য ওহী আলম রেজা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। রায়হানকে জখম করা হয় এবং রেজার শিশুসন্তানের গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে নগদ টাকা লুটে নেয় দুর্বৃত্তরা। উভয় ঘটনাই জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাকেও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে না। পবিত্র এই নগরীতে যাতে এ রকম আর কোনো ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভূমিকা রাখবে বলেই আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই। এই ঘটনাকে কোনোভাবেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ নেই বলেও জানান তারা।