সরকার বলছে, সারের পর্যাপ্ত মজুত আছে। অথচ গ্রামগঞ্জে কৃষকের নাভিশ্বাস উঠেছে সারের বাড়তি দাম আর সেচের পানির অভাবে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি সারে ৫ টাকা থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণ-তিনগুণ দাম রাখছেন। এর ওপর জ্বালানি তেলের সংকটে সেচ পাম্প চালাতে না পারায় শুকিয়ে চৌচির হচ্ছে কৃষকের ফসলি জমি। চরম এই সংকটের মাঝেই কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে প্রকাশ্যে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে মহামূল্যবান সার, বিপরীতে ঢুকছে মরণনেশা মাদক। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে দেশে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরপরও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ভয়াবহ অনিশ্চয়তা আর হতাশার মুখে পড়েছেন দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক কৃষক।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রফিকুল ই মোহামেদ যুগান্তরকে বলেন, বাজারে সারের দাম বেশি রাখা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তবে সময়ের অভাবে এ বিষয়ে মিটিং করতে পারছি না। কারণ, প্রধানমন্ত্রী ১৪ ফেব্রুয়ারি কৃষি কার্ড বিতরণ করবেন। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা ব্যস্ত। তবে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সার পাচার হচ্ছে-এমন অভিযোগ শুনিনি। বিষয়টি নিয়ে আমরা শিগ্গিরই বৈঠক করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।
জানতে চাইলে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক যুগান্তরকে বলেন, আমার জানামতে, দেশে সব ধরনের সার অতিরিক্ত রয়েছে। বাড়তি মজুত থাকায় সারের দাম বাড়ার কথা নয়। আগামী আমন মৌসুম পর্যন্ত মজুত সার দিয়ে চলবে। বাড়তি সারের প্রয়োজন হলে সরকার আমদানি করবে। তিনি আরও বলেন, দেশের গ্রামগঞ্জে সারের দাম বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে, এটা সরকার দেখবে। এছাড়া জ্বালানি তথা তেল আমদানি করে কৃষি উৎপাদনে সহায়তা করবে। খাদ্য উৎপাদন কম হলে খাদ্যশস্য মিলবে না। বিষয়টি সরকারকে স্মরণ রাখতে হবে।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সব ধরনের সারের দাম বাড়িয়ে রাখছেন বিক্রেতারা। সরকার নির্ধারিত ডিলাররা ৪০ কেজি সারে বাড়িয়ে নিচ্ছেন ১০০ থেকে ১৩০ টাকা। আবার ওয়ার্ড পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা বেশি নিচ্ছেন। ৪০ কেজির বস্তায় তারা ২৪০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। ফলে সারের জন্য অনেক কৃষকের চাষাবাদে বেগ পেতে হচ্ছে। আবার জ্বালানি তেলের ঘাটতি থাকায় তারা সেচ দিতে পারছেন না।
কক্সবাজারের রামু প্রতিনিধি জানান, প্রতিদিন প্রকাশ্যে ট্রাক ভরে মিয়ানমারে সার পাচার করা হচ্ছে। জেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে এই পাচার হচ্ছে। এর ফলে কৃষক অতিরিক্ত মূল্যেও সার পাচ্ছেন না। আবার মিয়ানমার থেকে আসছে মাদকদ্রব্য। এর ফলে দেশের যুবসমাজ বিপথে যাচ্ছে। রামু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুশান্ত যুগান্তরকে বলেন, এলাকায় সারের কোনো সংকট নেই। সরকারিভাবে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একটি চক্র গুজব ছড়িয়ে উচ্চমূল্যে সার বিক্রি করছে।
রামু থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়া এলাকা দুর্গম হওয়ায় ওই এলাকায় অভিযান ও টহল জোরদার করা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বাজারে সব ধরনের সার প্রতি কেজি ৫/৬ টাকা বেশি দামে ক্রয় করছেন কৃষক। দাম মনিটরিংয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শুধু বলা হচ্ছে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক যুগান্তরকে বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। বাড়তি দাম আদায়ের কারণে ডিলার লাইসেন্স বাতিল এবং খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করা হচ্ছে। আশা করি, এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বোরো মৌসুমে তীব্র ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। সেচ পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে উপজেলার কয়েকশ কৃষক চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারায় অনেক ফসলি জমি শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, যা ধান উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের রাকুদিয়া এলাকায় কৃষকদের হতাশাজনক চিত্র। স্থানীয় কৃষক জাকির ফরাজি যুগান্তরকে জানান, ধারদেনা করে তিনি এবার ১ একর জমিতে ইরি-বোরো ধান আবাদ করেছেন। শুরুতে সেচের ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও বর্তমানে ডিজেলের অভাবে পাম্প বন্ধ থাকায় তার জমিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
বাগমারা (রাজশাহী) প্রতিনিধি জানান, তেল (ডিজেল) সংকটের প্রভাব পড়েছে সেচ পাম্পগুলোয়। উপজেলার দ্বীপপুর ইউনিয়নের বিলসতি বিলের একটি গভীর নলকূপের মালিক ইসলাম সরদার জানান, তার গভীর নলকূপের আওতায় ৩২০ বিঘা জমিতে এবার বোরো ধানের চাষ হয়েছে। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে তিনি ডিজেল সংগ্রহ করতে পারেননি। এ কারণে তার সেচ পাম্প বন্ধ রয়েছে।
দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। যমুনার তীরবর্তী চরাঞ্চলের কৃষক শরিফুল বলেন, ডিলারের কাছে সার আনতে গেলে সার পাই না। সাত বিঘা জমিতে ইরি, ভুট্টা ও মরিচের চাষ করেছি। ইউরিয়া কিনেছি প্রতি বস্তা ১ হাজার ৪৫০ টাকায় (সরকারি মূল্য ১৩৫০ টাকা), ডিএপি ১ হাজার ৭০০ টাকায় (সরকারি মূল্য ১০৫০ টাকা) এবং টিএসপি ২ হাজার ৫০০ টাকায় (সরকারি মূল্য ১৩৫০ টাকা)। সার কেনার সময় কোনো মেমো দেন না বিক্রেতারা। অতিরিক্ত মূল্যে সার কিনে ফসলে দিলে কৃষক কীভাবে লাভবান হবে। চর হলকা হাবরাবাড়ীর কৃষক মকবুল ও সোনা মিয়া জানান, ইউরিয়া প্রতি বস্তা ১৫শ টাকায় কিনছেন তারা।
গাইবান্ধায় অবরোধ-বিক্ষোভ : গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাফার গোডাউনে অনিয়ম করে সার সংকট সৃষ্টি করেন। এর প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার দুপুরে তুলসীঘাট বাফার গোডাউনের সামনে গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী মহাসড়ক ঘণ্টাব্যাপী অবরোধ করে স্থানীয় জনসাধারণ ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এই কর্মসূচি পালন করে।