কমেছে তেল, কয়লা ও গ্যাস সরবরাহ। তাই চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্রীষ্মের শুরুতে শনিবার এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, এবারের গরমের মৌসুমে লোডশেডিং বাড়বে। এমন দুঃসংবাদের পাশাপাশি বকেয়া বিল না পাওয়ায় ফার্নেস অয়েলের মজুত কমে এসেছে। তাই ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) এবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেশনিং শুরু করেছে।
এদিকে তেলের অভাবে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানির গোদনাইল ডিপোতে ফার্নেস অয়েলে পানির পরিমাণ বেশি পাওয়ায় তাদের তেল কিনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল)। ওই কোম্পানির গাজীপুর প্ল্যান্টের ম্যানেজার রোববার যুগান্তরকে জানান, মেঘনার ফার্নেস অয়েলে মাত্রারিক্ত পানি। ওই ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাবে না। তাই মেঘনা পেট্রোলিয়ামের তেল নেওয়া হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, এটি একটি বড় অভিযোগ। অথচ আমি জানতে পারলাম না। বিষয়টি আমি দেখছি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিন বিতরণ কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনার ডিপোতে ৬২ হাজার ২৫১ টন ফার্নেস অয়েল মজুত আছে বলে জানা গেছে। কিন্তু ১ এপ্রিল থেকে পিডিবি এবং সরকারি কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে ফার্নেস অয়েল বিক্রি করছে না বিপিসি।
পিডিবি জানায়, এখনই বিদ্যুতের অবস্থা বেশ খারাপ। লোডশেডিং কমানো নিয়ামক একমাত্র বৃষ্টি। কারণ, এখন চাহিদা পিক আওয়ারে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৪ হাজারের মতো। রোববার বিকাল ৫টায় দেশে লোডশেডিং হয়েছে ৭৬৫ মেগাওয়াট। ওই সময়ে (পিক আওয়ার নয়) বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা গেছে ১২ হাজার ৫৪৯ মেগাওয়াট। এর আগে শনিবার রাত ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১০০ মোগওয়াট। আর সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট। রাত ১২টায় লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। রোববার সারা দেশে তাপমাত্রা কিছুটা কম ছিল। কিন্তু এরপরও লোডশেডিং কমছে না। আবহাওয়া অফিস জানায়, সারা দেশে বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টি হলে হয়তো লোডশেডিং কমবে।
পিডিবি জানায়, এবার কয়লা সরবরাহ কম। কয়লার অভাবে নরেনকোর ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ইউনিট বন্ধ। এছাড়া একই কারণে ১৩২০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী জাতীয় গ্রিডে এখন মাত্র ৩৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। এর বাইরে কয়লাভিত্তিক ভারতের আদানি গ্রুপের দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ। এ কারণে আদানি থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও এবার পেট্রোবাংলা গ্যাস বরাদ্দ দিয়েছে ৯৩ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। তাও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। তাই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ৪০০ মেগাওয়াটের মতো। কর্মকর্তারা জানান, নরেনকোর একটি ইউনিট ১০ এপ্রিল এবং বাকি ইউনিট মে মাসে চালু হবে। আদানির বন্ধ ইউনিট চালু হবে ১১ এপ্রিল। মাতারবাড়ীর পুরো উৎপাদন আগামী সপ্তাহে আসতে পারে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র এলে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হতে পারে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি চিন্তা ফার্নেস অয়েল নিয়ে। পিডিবির ১০টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেল মজুতের ক্ষমতা আছে ৯৭ হাজার ৭৯০ টন। আর এখন মজুত আছে মাত্র ৩০ হাজার ১২১ টন। এর মধ্যে হাটহাজারীসহ কয়েকটি কেন্দ্রে তেল আছে মাত্র ৪ দিনের। পিডিবি জানায়, যুদ্ধের কারণে ফার্নেস অয়েলের দাম এক লাফে ৪০০ ডলার থেকে প্রতি টন ৮০০ ডলারের বেশি হয়েছে। এ কারণে বিপিসি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়াতে আবেদন করেছে। দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের আগে ১ এপ্রিল থেকে ফানের্স অয়েল বিক্রি অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছে বিপিসি। ১ এপ্রিলের পর থেকে তীব্র গরমে লোডশেডিং হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কিছু ফার্নেস অয়েল দিতে জ্বালানিমন্ত্রীকে অনুরোধের পর তার নির্দেশনায় শনিবার ৮০০ টন ফার্নেস অয়েল দিতে রাজি হয় বিপিসি। এর মধ্যে পদ্মা থেকে ৪০০ টন এবং মেঘনা থেকে ৪০০ টন। মেঘনায় ৪০০ টন ফার্নেস অয়েল আনতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের তেলে পানির পরিমাণ বেশি। সাধারণত ১ শতাংশের নিচে পানি থাকতে হয়। কিন্তু পানি আছে এর চেয়ে বেশি। তাই মেঘনার তেল নিতে রাজি হয়নি আরপিসিএল।
পিডিবি জানিয়েছে, ফার্নেস অয়েলের দাম এ দফায় এক লিটার ১২৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ওই দাম হলে ফার্নেস অয়েল দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হবে ২৬ টাকার বেশি। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, বিপিসি ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। কিছু কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। শিগ্গিরই এ ব্যাপারে জানানো হবে।
আইপিপিগুলো ফার্নেস অয়েল দিয়ে দেশে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। ফার্নেস অয়েল দিয়ে এখন তারা বিপাকে আছে। কারণ, কারও কাছে ১০ থেকে ১৫ দিনের বেশি মজুত নেই। বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত রোববার যুগান্তরকে বলেন, সরকারের কাছে আইপিপিগুলোর ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা। ৭-৮ মাস তারা কোনো বিল পাচ্ছে না। এ অবস্থায় তেল কেনার মতো অবস্থা তাদের নেই। বকেয়ার কারণে ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে চাইছে না। সরকারও আইপিপিগুলোর সঙ্গে বসছে না।
এ অবস্থায় বিপ্পার সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফার্নেস অয়েলের রেশনিং করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মোটামুটি চালিয়ে যাবে। এর মানে, তেলের অভাবে পুরো উৎপাদন করা যাবে না। বিপ্পা সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টে এখন সক্ষমতার ৫০ শতাংশ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। এভাবে রেশনিং করা হলে হয়তো লোডশেডিং করে হলেও এ মাসটা চালানো যাবে। তবে পুরো উৎপাদন করলে ২০ এপ্রিলের মধ্যে সব ফার্নেস অয়েল শেষ হয়ে যাবে।
দেশ এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাভিদুল হক জানান, পিডিবি কয়েক মাসের বিল বাকি রেখেছে। ২০০ মেগাওয়াটের চাঁদপুর প্ল্যান্টে ১০-১৫ দিনেরও ফার্নেস অয়েল নেই। তাই রোববার পিডিবিকে এক চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, এখন থেকে প্ল্যান্টে রেশনিং করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। কারণ, তেল না থাকলে প্ল্যান্ট চলবে না। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, অনেক চিঠি দিয়েছি। কিন্তু পিডিবি কোনো জবাব দেয় না।
পিডিবি জানিয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট এবং শপিংমল বন্ধ হলে পিক আওয়ারে দেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ১২ হাজার ৪৭২, কয়লাভিত্তিক ৬ হাজার ২৭৩, ফার্সেস অয়েলের ৫ হাজার ৬৪১, ডিজেলের ৭৬৮, জলবিদ্যুৎ ২৩০, সৌরবিদ্যুৎ ৮৩৯ এবং ভারত থেকে আমদানি করা হয় (আদানিসহ) ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট।