Image description
লিটারে ৩৪ টাকা বেশি গুনছেন ক্রেতা

সয়াবিন তেলের বাজারে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামকে রীতিমতো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটার মহোৎসবে মেতেছেন তারা। কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে বাজার থেকে সুকৌশলে বোতলজাত তেল উধাও করে দেওয়া হচ্ছে। আর সেই সুযোগে ড্রামে ভরে খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বেশি দরে। কাগজে-কলমে মূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে চরম প্রহসনে। চোখের সামনে এমন প্রকাশ্য ‘ডাকাতি’ চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব প্রশাসন। ফলে বাড়তি দামে তেল কিনতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের।

রাজধানীর একাধিক বাজারের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সেটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রোববার প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৮৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৯৬ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে দশমিক ২৬ শতাংশ। এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১৭৫-১৮৬ টাকা। সেক্ষেত্রে মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৫.৫৪ শতাংশ। আর গত বছর একই সময় বিক্রি হয়েছে ১৬০-১৬৫ টাকা। সেক্ষেত্রে বছরের ব্যবধানে মূল্য বেড়েছে ১৭.২৩ শতাংশ।

এদিকে সরকারি সংস্থা টিসিবি খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিনের মূল্য ১৮৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৯৬ টাকা উল্লেখ করলেও বাজারের চিত্র আরও ভয়াবহ। রোববার রাজধানীর নয়াবাজার, জিনজিরা, মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন কিনতে ক্রেতার ২১০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৭৬ টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে খুচরা বাজারে ক্রেতার কাছ থেকে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।

টিসিবির মূল্য অনুযায়ী দেখা যায়, রোববার প্রতি লিটার খোলা পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ১৬৮ টাকা দরে। যা সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৬২ টাকা। ক্রেতার কাছ থেকে লিটারপ্রতি বাড়তি নেওয়া হয় ৬ টাকা। ৭ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর লিটারপ্রতি ৬ টাকা বাড়িয়ে মূল্য ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। যা ৮ ডিসেম্বর থেকে বাজারে কার্যকর হয়। সংগঠনের তরফ থেকে নতুন দাম অনুযায়ী এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হবে ১৯৫ টাকায়। যা আগে সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৮৯ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হবে ১৭৬ টাকা। যা আগে ১৭০ টাকা ছিল। অন্যদিকে প্রতি লিটার পাম তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬৬ টাকা। সঙ্গে ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৫৫ টাকা।

এর আগে ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২৪ নভেম্বর তারা আবারও মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে দুবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় তখন সাড়া দেয়নি। এ পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারকে পাত্তা না দিয়ে অনুমতি ছাড়াই প্রতি লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম উল্লেখ করে বাজারে ছাড়া হয় তেল। তখন ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হয়েছে। সরকারকে না জানিয়ে নভেম্বরে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তখন ব্যবসায়ীদের শোকজও করা হয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের পর লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ভোক্তার স্বার্থরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার এক প্রকার ব্যর্থ ছিল। যে সময় তেলের দাম বাড়ানোর কথা নয়, সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চাপে পড়ে মূল্য বাড়িয়েছে। তখন থেকেই নির্ধারিত মূল্যে বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে না। সে সময় তদারকি হয়নি, এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের সময়ও বাজারে কঠোর তদারকি হচ্ছে না। ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার কার স্বার্থে এই মূল্য নির্ধারণ করেছে, আর বর্তমানে কেনই বা অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন। তিনি বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজিয়ে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি যারা অনিয়ম করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি বিক্রেতা মো. সাগর বলেন, আমরা কী করতে পারি। আমরা জানি, কোম্পানিগুলো সরকারকে ৪ দফা চাপে ফেলে লিটারে ৬ টাকা সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে। সেই দরে আমাদের বিক্রি করার কথা। কিন্তু কোম্পানিগুলো আমাদের যে তেল সরবরাহ করছে তার দাম অনেক বেশি। যে কারণে আমাদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি দরে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। বেশি দামে কেনায় বেশি দামে বিক্রি করছি।

বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে একজন সহকারী পরিচালক জানান, বাজারে তেলের দাম নিয়ে কাজ করা হবে। তদারকি করে দেখা হবে কোন পর্যায়ে কারসাজি হচ্ছে। প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

বেড়েছে সবজির দাম : বাজারগুলোতে গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে বরবটি কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি কেজি বেগুন প্রকারভেদে ১০ টাকা বেড়ে ৬০-৮০ টাকা, কচুর লতি ৮০ টাকা, করলা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০-৭০ টাকা, পটোল ৬০-৮০ টাকা, কচুরমুখী ৮০-১০০ টাকা, সাজনা ৮০-১০০ টাকা ও ধুন্দল প্রতি কেজি ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কাঁচামরিচ ১০০-১২০ টাকা কেজি, পেঁপে ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৪০ টাকা, দেশি শসা ৬০ টাকা ও হাইব্রিড শসা ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।