Image description

রাজধানীর গুলিস্তানে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারান নটর ডেম কলেজের মেধাবী ছাত্র নাঈম হাসান। ঘটনাটি ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বরের। নাঈমের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িচালকরা আজও তাদের বেপরোয়া মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি।

গত ৫ বছরে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন ময়লার গাড়িচাপায়। এদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীও। যদিও আহতের সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারো কাছে। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং দায়ী চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় দুর্ঘটনার নামে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো কখনোই ট্রাফিক আইন মানেন না। উল্টোপথে বেপরোয়াগতির এ দানবে নির্ধারিত চালকের পরিবর্তে ভিন্ন জন গাড়ি চালিয়ে থাকেন। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দুর্ঘটনার নামে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি বাড়তেই থাকবে।

সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়িগুলো আইন অমান্য করে বেপরোয়াগতিতে চলাচলের কারণে প্রায়শই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। এর অন্যতম কারণ অদক্ষ চালক, তাদের বেপরোয়া আচরণ ও ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মূল চালকের বদলে হেলপার বা বদলি চালক গাড়ি চালান। চালকরা ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালান এবং প্রায়ই উল্টোপথে যান। অনেকেরই ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নেই এবং গাড়ির প্রয়োজনীয় ফিটনেসও নেই। ব্যস্ততম সময়ে ময়লার গাড়ি চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ে। এসব চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দৃষ্টান্ত খুবই কম।

গতকাল শনিবার খিলগাঁও থানাধীন দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় নিহত হন সাজেদুল ইসলাম (৪৫) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ বনশ্রী মেইন রোডে সিঙ্গার শোরুমের সামনে থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ময়লার গাড়িটি এতই বেপরোয়া ছিল যে, ঘটনাস্থলেই সাজেদুল প্রাণ হারান। নিহত সাজেদুল খিলগাঁওয়ের ওমর আলী লেনের ১৩/৬নং বাসার আব্দুল হাকিমের সন্তান।

মাত্র মাসচারেক আগে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ডেমরায় ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে একজন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী তাহসিন তপু (২৫) ও ইউরোপিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইরাম হৃদয় (২৩)। তারা ভোরে একটি গায়েহলুদের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাড়িটি হঠাৎ দানবের ন্যায় অতিরিক্ত গতিতে চলছিল। গাড়ির চালক মাদকাসক্ত ছিলেন।

ময়লাবাহী গাড়িগুলোর চালকরা এতটাই বেপরোয়া যে তারা সড়কে চলা মানুষ ও যানবাহনকে কিছুই মনে করেন না। ধার-ধারেন না কোনো নিয়ম-কানুনের। চালকদের এমন বেপরোয়া ও উগ্রতার কারণে সংস্থার গাড়িগুলো প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। মারা যাচ্ছে মানুষ।

গত ২০২৪ সালের এপ্রিলে উল্টোপথে আসা ময়লার গাড়িচাপায় প্রাণ হারান মতিঝিল সরকারি আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মাহিন আহমেদ। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ মাহিনসহ ময়লার গাড়িচাপায় হতাহতের ঘটনার তদন্তে নামে। কিন্তু চালকের আজও বিচার হয়নি।

পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মতে, এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মূলত সিটি করপোরেশনের বর্জ্য পরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা। একাধিক দুর্ঘটনার তদন্তে গাড়িচালকদের গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। কখনো কখনো মাদকাসক্ত অবস্থায় চালকের অবহেলায় প্রাণহানিও ঘটেছে। এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও সংস্থাটির পরিবহন বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

কিছুদিন আগে টিকাটুলি মোড়ে উল্টোপথে আসা একটি ময়লার গাড়ি প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দেয়। এতে প্রাইভেট কারটির অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়রা ময়লার গাড়ি ও চালককে আটক করেন। উপস্থিত লোকজনের জিজ্ঞসাবাদে ওই সময়ে গাড়ির চালক স্বীকার করেন, মূলত তিনি ওই ময়লার গাড়ির নির্ধারিত চালক নয়। আসল চালক তার মামা। মূল চালক প্রায়ই এদিক-সেদিক থাকেন। ভাগ্নেই গাড়িটি চালাতেন। পরে ওই গাড়ি আটকে রেখে মুল চালককে ডেকে আনা হয়। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত প্রাইভেট কারের ক্ষতিপূরণ দেয়ার শর্তে জনরোষ থেকে মুক্তি পান।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ নাগরিকের গাড়ি সড়কে দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র দেখে, ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে, অপরাধ করলে মামলা দেয়। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো কখনোই চেক করে না। প্রায়ই উল্টোপথে বেপরোয়াগতিতে চলাচল করলেও সরকারি সংস্থার গাড়ি হওয়ায় ট্রাফিক পুলিশও তাদের কিছু বলছে না। একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন অমান্য করলেও তাদের কোনো শাস্তি বা মামলা হচ্ছে না। সিটি করপোরেশনও এসব চালককে মনিটরিং করে না। এ অনিয়ম বন্ধ করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মনিটরিং সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হবে। গাড়ির ভিতর ড্যাশ ক্যামেরা ও স্পিড ক্যামেরা বসিয়ে করপোরেশন থেকে মনিটরিং করা হলেই কেবল এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।