বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আনুমানিক ৫০-৭০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস ও কাজ করছেন। দেশের প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৮৬৭ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে উপসাগরীয় ছয় দেশ থেকে এসেছে ৪৭ শতাংশ বা ৪৮০ কোটি ডলার। ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযান শুরু করে। যার প্রভাব পড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। পাল্টা আক্রমণ হিসেবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
এতে এসব দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জীবনে বড় প্রভাব পড়েছে। অনেক দেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। অনেকে কাজ হারিয়েছেন। অনেকের কাজ কমে গেছে। অনেক প্রবাসী অতিরিক্ত কাজ করতে পারছেন না। অলস সময় পার করতে হচ্ছে তাদের। এর মাঝে রয়েছে মিসাইল আতঙ্ক। এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হয়েছেন। সবশেষ পহেলা এপ্রিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রিফা এলাকায় একটি খামারে ড্রোন প্রতিরোধের সময় ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষে এক বাংলাদেশি নিহত হন।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের লোহাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মো. মিলন খন্দকার। ৬ মাস আগে জীবিকার তাগিদে যান কুয়েতে। বর্তমানে দেশটির দোহা শহরে বসবাস করেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর দিকে সবসময় ভয় কাজ করতো। কখন যেন মিসাইল এসে পড়ে। আবার কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নাকি। তবে ঈদের পর থেকে আর বড় কোনো হামলা হয়নি। তবুও মনের মধ্যে সন্দেহ থেকেই যায়। তাই যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ভয় কাজ করবেই। সবচেয়ে বড় ভয় কাজ নিয়ে। এজন্যই এ দেশে আসা। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে না খেয়ে থাকতে হবে। দেশে ফিরে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
মিলন বলেন, বর্তমানে কাতারে বড় ধরনের সমাগম নিষিদ্ধ রয়েছে। সরকার একসঙ্গে অনেক মানুষ জড়ো হতে দেয় না। কোথায় যাওয়া যাবে, না যাবে তার নির্দেশনা সরকার সবসময় দিচ্ছে।
কুয়েতে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন। চাঁদপুরের এ বাসিন্দা কুয়েতে ফার্নিচার ও গাড়ির ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশিরা বর্তমানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছি। যারা ব্যবসা করি তাদের বড় সংখ্যক গ্রাহক ট্যুরিস্ট। বাইরে থেকে যারা আসতো, বিশেষ করে ইউরোপিয়ানরা আমাদের বড় গ্রাহক। কিন্তু এখন ট্যুরিস্ট আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফেমিলি ভিসা বন্ধ হয়ে গেছে। যাদের এখানে আছে তারাও পরিবার দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব সব ফার্নিচার ব্যবসায়ীদের ওপর পড়েছে। এ দেশে ফর্নিচার ব্যবসায় প্রভাব পড়া মানে প্রতিটি সেক্টরে প্রভাব পড়া। বর্তমানে আমরা যারা এ ব্যবসায় আছি, কোনোমতো থেকে-খেয়ে আছি। এর ওপর আবার ভয় কাজ করছে কোন সময় যেন হামলা হয়।
তিনি বলেন, ফার্নিচারের পাশাপাশি আমি গাড়ির ব্যবসা করি। কখন কোথায় হামলা হয় এ ভয়ে বেশির ভাগ গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি। শুধু আমি না, যারা এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবাই একই আতঙ্কে রয়েছে। এর বাইরে যারা বিভিন্ন কাজ করেন তারাও আতঙ্কে রয়েছেন। কাতার সরকারের নিরাপত্তার দিক থেকে আলহামদুলিল্লাহ। সরকার আমাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিচ্ছে। আবার কীভাবে চলবো, কি করবো তার আপডেট সবসময় দিচ্ছে। যেকোনো সমস্যা হলে যোগাযোগ করতে বলে। কিন্তু এ যুদ্ধ তো মিসাইলের। তাই ভয় কাজ করাটা স্বাভাবিক।
এ প্রবাসী বলেন, বাংলাদেশি শ্রমিকরা খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সব শ্রেণির মানুষ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আমরা আগে পিয়াজ কিনতাম ১ দশমিক ২৫ কাতারি রিয়াল দিয়ে। বর্তমানে সেই পিয়াজ কিনতে হয় সাড়ে ৫ থেকে ৭ রিয়াল পর্যন্ত। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম দাম। প্রতিটি জিনিসের এভাবে দাম বেড়েছে। আগে একজন শ্রমিক দিনে ১২০ রিয়াল পর্যন্ত আয় করতো। মাসে ১৫-২০ দিন কাজ করতে পারতো। কিন্তু এখন তার মাসে ২ দিন কাজ করা কঠিন হয়ে গেছে। মানুষ থাকা-খাওয়া নিয়ে খুবই কষ্টের মাঝে আছে। কিন্তু এটা কেউ প্রকাশ করে না। সবাই বলে, ভালো আছি। বিশেষ করে দালালরা বলবে, খুব ভালো আছি, খুব ভালো চলছি। আমরা যারা এখানে আছি তারা পরিস্থিতিটা বুঝছি। আমার প্রতিষ্ঠানে ৪ জন কাজ করতেন। আমি দু’জন রেখেছি। বর্তমানে আমার পক্ষে ৪ জনকে বেতন দেয়া সম্ভব না। আমার ব্যবসা তো টেকাতে হবে- এমন অবস্থা পুরো দেশেই। আমরা মানসিকভাবে ভালো নাই। সরকারের উচিত আমাদের দিকে নজর দেয়া।
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বাসিন্দা মহসিন দেওয়ান স্টার কুয়েত প্রবাসী। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতেই সাইরেন বাজে। মাঝে মাঝেই সাইরেনের আওয়াজ পাওয়া যায়। এই আওয়াজটাই একটা আতঙ্কের নাম। মনে হয়, কখন কি হয়, কখন যে আবার মিসাইল এসে পড়ে। যদিও যুদ্ধের কারণে কোনো কিছু থেমে নেই। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। তবে জিনিসপত্রের দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। যা প্রবাসীদের জীবনযাপন কঠিন করে ফেলেছে। এর বাইরে সবাই স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানিনির্ভর, সেসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করে তারা খুব খারাপ সময় পার করছে। তারা পুরো মাস কাজ করতে পারছে না।
অনেক অফিস ১৫ দিন কাজ করে, ১৫ দিন বন্ধ রাখছে। যা আয় করে তা দিয়ে থেকে-খেয়ে বাড়িতে পাঠানো কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু পরিবারগুলো তো তাদের ওপরই নির্ভরশীল। এর বাইরে আবার অনেকে লোন করে এসেছে। তাদের লোন পরিশোধ করা আর সংসার চালানো খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরল উপজেলার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির সৌদি আরবে রয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে এখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব আমাদের কাজের মধ্যে পড়েনি। কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তবে আমাদের মাঝে একটু হলেও ভয় কাজ করছে। যদিও নির্দিষ্ট জায়গায় মিসাইল ফেলে। তবুও কখন কি হয় তা বলা মুশকিল। জানি না এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে। কখন কি হয়। কখন মিসাইল এসে পড়ে তা নিয়ে আতঙ্ক কাজ করছে।