Image description

দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজার ইস্যু নিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে জটিলতা কাটছেই না। একের পর এক ইস্যুতে থমকে আছে কর্মী পাঠানো। বিগত সময়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ, উচ্চপর্যায়ের সফর, বৈঠক ও প্রস্তাবের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। প্রশ্ন উঠছে- কোথায় আটকে আছে এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার? সংশ্লিষ্টদের মতে, মালয়েশিয়ার নীরবতা, কঠোর শর্ত এবং অতীতের সিন্ডিকেট-অনিয়মের জটিল সমীকরণেই থমকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।

নির্দিষ্ট কয়েকটি সিন্ডিকেটের বেড়াজালে কর্মী পাঠানোসহ নানা অনিয়ম হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। যুক্ত ছিলেন দলটির অনেক প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীরা। যার প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিলেও সেটার কাঙ্ক্ষিত সাড়া দেয়নি দেশটি। এখন এই অচলাবস্থা নিরসনে আবারো উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করে সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে মানববন্ধনও করেছে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) একাংশ। একইসঙ্গে তারা আওয়ামী আমলে সৃষ্ট সিন্ডিকেট হোতাদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৮ই এপ্রিল মালয়েশিয়া সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের। তবে সফরের এই বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয় বলেও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সফরকালে তারা মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও আলোচনায় অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখনো সফরের পূর্ণাঙ্গ সূচি চূড়ান্ত হয়নি। তবে সার্বিক দিক দিয়ে পরিস্থিতি এখনো বেশ জটিল। ২০২৪ সালের ১লা জুন থেকে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। এর আগে মার্চ মাসেই দেশটি কর্মী নেয়া স্থগিতের ঘোষণা দেয় এবং ৩১শে মে পর্যন্ত প্রবেশের সময়সীমা নির্ধারণ করে। এতে শেষ মুহূর্তে প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর বিদেশযাত্রা থেমে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও তারা যেতে পারেননি। ফলে তাদের জমা দেয়া প্রায় ৮০০ কোটি টাকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো অর্থ ফেরতের দাবি জানালেও অনেক কর্মীর অভিযোগ- তারা সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাননি। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বিদেশগামী শ্রমিকদের মধ্যে হতাশার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এই বাজার চালু করতে উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। গত বছরের ১৩ থেকে ১৬ই মে সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী মালয়েশিয়া সফর করে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সে সময় বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেয়ার আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

এরপর ২১ ও ২২শে মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিরাপদ অভিবাসন ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তৃতীয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক। মালয়েশিয়ার ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হলেও সেখান থেকেও কোনো দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত আসেনি। এমনকি নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনও বাতিল করা হয়।

পরবর্তীতে মালয়েশিয়া কর্মী নেয়ার ক্ষেত্রে একগুচ্ছ শর্ত আরোপ করে। এসব শর্তের মধ্যে কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ চিঠি দিলে তারও কোনো উত্তর দেয়নি দেশটি। ফলে বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এই অচলাবস্থার মূল কারণ অতীতের সিন্ডিকেট ও অনিয়ম। ২০০৯ সালে প্রথমবার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে তা চালু হয়। সে সময় সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেয়া হয়, যা পরে সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। দুর্নীতি ও অতিরিক্ত খরচের অভিযোগে ২০১৮ সালে আবার বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালের সমঝোতার ভিত্তিতে ২০২২ সালে বাজারটি পুনরায় চালু হলেও আবারো চক্র গড়ে ওঠে। এতে কর্মীদের নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ গুনতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণে মালয়েশিয়ার পক্ষেও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ একাধিকবার কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ করেছে, বৈঠক করেছে এবং সম্ভাব্য রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাও পাঠিয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও একই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠানোর পরও মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, এমনকি নতুন করে আলোচনারও তেমন অগ্রগতি নেই।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কূটনৈতিক তৎপরতা নয়- কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া এবং অতীতের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সাবেক এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, অতীতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় (প্রায় ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা) উপেক্ষা করে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে। এসব অনিয়মই শ্রমবাজারকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এ কারণে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে কোথাও কোনো বাধা থাকলে তা দ্রুত অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বর্তমানে কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তাৎক্ষণিক কোনো একক উদ্যোগ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ও ধাপভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা জরুরি। মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ধাপে ধাপে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রথম শর্ত হলো দেশের অভ্যন্তরীণ (হোম গ্রাউন্ড) সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা। বিশেষ করে, পূর্বে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে কোনো আইনি বাধা ছিল কিনা, কিংবা কোনো সিন্ডিকেট কাজ করেছে কিনা- এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব এম টিপু সুলতান মানবজমিনকে বলেন, সকল বায়রা সদস্যদের জন্য মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের সকল দেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে হবে। এজন্য সরকার জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।