Image description
অন্তর্বর্তীর ১৩৩ অধ্যাদেশ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং অনেকগুলো যাচাই-বাছাই করে পরে নতুন করে সংসদে তোলার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। অথচ যাচাই-বাছাই করতে চাওয়া অধ্যাদেশগুলো আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে অনুমোদন করা না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তেমনটা ঘটলে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যক্রমের বড় অংশ ভেস্তে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সরকার আইনে পরিণত না করে অনেক অগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। গতকাল শুক্রবার তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার বিচার বিভাগের সংস্কারের পক্ষে না বিপক্ষে? এটাই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার করা হবে, এটা তারা মুখে যতটুকু বলে বাস্তবে কতটুকু করবে—তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু, ১৫টি সংশোধনীসহ পাসের জন্য গত বৃহস্পতিবার সংসদের কাছে সুপারিশ করে সংসদের বিশেষ কমিটি। আর সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তীকালে নতুন করে বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করে কমিটি। কিন্তু ৯ এপ্রিলের মধ্যে বিল পাস না হলে রহিতকরণের চারটিসহ নতুন করে বিল আকারে উত্থাপনের ১৬টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

জুলাই জাতীয় সনদে সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় স্থাপনে বিএনপির আপত্তি না থাকলেও অধ্যাদেশটি রহিতে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী মত দিয়েছে বিশেষ কমিটি। এ ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি—এটি বহাল থাকলে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে বিরোধী দল এতে আপত্তি জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচার নিয়োগ অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে উল্লেখ করে বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় অধ্যাদেশ সরকার বাতিলের তালিকায় রেখেছে। কিন্তু এটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এটাকে পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করার জন্য নতুনভাবে উত্থাপন করে বিচার-বিশ্লেষণের পর আইন হিসেবে পাস করা উচিত।

বিদ্যমান অধ্যাদেশ বাতিল করে ভবিষ্যতে নতুন করে তোলার সুপারিশ করা ১৬ অধ্যাদেশের মধ্যে আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ। এ বিষয়ে কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের কোনো বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয়নি। এটা বড় ধরনের অসংগতি।

আর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের বিষয়ে সরকারে যুক্তি হচ্ছে—নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটক করাকে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। তবে বিরোধী দলের যুক্তি হচ্ছে—গত ১৫ বছরে গুমের শিকার পরিবারগুলো সরকারের কাছে ন্যায়বিচার পায়নি। সরকারের কাছে অনুমতি চাইলে অনুমতি কখনো মেলে না।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশটি প্রয়োজনীয় আইন বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, গুমের শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বর্তমান সরকারে আছে যারা তারাই। গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াছ আলীর তথ্য চেয়ে সংসদে কথা বলেছেন তাঁর স্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর। গুমসংক্রান্ত বিষয়ে বিএনপি বড় ভুক্তভোগী। কাজেই গুমের প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য অধ্যাদেশটি হুবহু আকারে না হলেও, বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

গণভোট অধ্যাদেশ পর্যালোচনাকালে বিশেষ কমিটি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ নিয়েও পর্যালোচনা করে। প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, সাংবিধানিকভাবে অবৈধ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে কার্যকর করার লক্ষ্যে করা গণভোট অধ্যাদেশ একটি প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যাদেশ। এই আদেশের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। এটা দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে; এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আজকের পত্রিকা বলেন, ‘এগুলো নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের (সাবেক আইন উপদেষ্টা) সঙ্গে কথা বলেন। কারণ বাতিলের সুপারিশ করা বেশির ভাগ অধ্যাদেশ ওনাদের। আর বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেন।’

একই বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না।’ আর ওই সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে বিষয়টি লিখে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের মাধ্যমে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে আরেকটি বার্তা দিয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। তিনি গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে না, এটাই বোধগম্য হচ্ছে। কারণ বাস্তবায়নের ইচ্ছে থাকলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করত। দলটি তাদের প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে বড় আকারে সরে যাচ্ছ। তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা আছে, তাই এটা করছে, তা বোঝাই যাচ্ছে।’