মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এরপরেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির কারণে সরকার সফল হচ্ছে না। কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না দেশের জনগণ। সরকারের নানা পদক্ষেপেও জ্বালানি সংকটের সুরাহা হচ্ছে না কেন? জানতে চাইলে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মানবজমিনকে বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির কারণে সরকার সফল হচ্ছে না। কাঙ্ক্ষিত সুফলও পাচ্ছে না মানুষ। শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আমরা ডলারের অভাবে কম দামের সময় কিনতে পারিনি। এখন দাম বাড়লে আমরা বেশি কিনতে পারবো না। কারণ ডলারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে সমস্যা হবে। দেশে তেলের সংকট আগেও ছিল। যুদ্ধ লাগার কারণে আরও সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার নানা পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সংস্কার করতে হবে। যাদের কারণে এ খাতের ক্ষতি হয়েছে এবং লুণ্ঠনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার করতে হবে। তাহলেই মানুষ সুবিধা পাবে।
এ প্রসঙ্গে দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার নানা পদক্ষেপ তো নেবেই। এটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে গ্রহণ করা পদক্ষেপগুলো কার্যকর হতে হবে। না হলে কোনো লাভ হবে না। তিনি কয়েকটি পরামর্শ দিয়ে বলেন, সরকারি অফিস সপ্তাহে আরও একদিন বন্ধ রাখতে হবে। তা বিদ্যমান দু’দিন ছুটির সঙ্গে নয়। সপ্তাহের মাঝখানে। এছাড়া রাস্তায় একদিন জোড়সংখ্যার গাড়ি এবং অন্যদিন বিজোড় সংখ্যার গাড়ি চলবে। এতে জ্বালানির বেশ সাশ্রয় হবে। বিদ্যুতের লোডশেডিং করানোর পরামর্শ দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এখন বিদেশ থেকে ডিজেল আসছে বেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- অকটেন ও পেট্রোলে। ড. ইজাজ জানান, ঢাকায় প্রায় ১০ লাখ মোটরবাইক রয়েছে। স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে এখন বেশি করে জ্বালানি নিচ্ছেন এসব গ্রাহক। এতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, আবার অনেক পাম্পমালিক অভিযোগ করে বলেছেন, বড় বড় পাম্পে তেল পেলেও ছোট পাম্পগুলো ঠিকমতো তেল পায় না। তাতে বড় পাম্পে চাপ বাড়ছে। সবমিলিয়ে সমস্যা হচ্ছে। এতে সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আমাদের মোটরবাইকের তেল নেয়ার পদ্ধতিও ভালো নয়। ফলে লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সক্ষমতাও কম। এদিকে নজর দিতে হবে।
অফিস সকাল ৯টা-৪টা, মার্কেট বন্ধ সন্ধ্যা ৬টায়:
এদিকে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। জরুরি সেবাগুলো নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
জরুরি সেবাগুলো নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচি: নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অফিসের সময় ১ ঘণ্টা কমিয়ে আনা হয়েছে। আগামী কার্যদিবস থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর লেনদেন চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত; তবে আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে বিকাল ৪টায় ব্যাংক বন্ধ করতে হবে।
বাজার ও বিপণিবিতান: দেশের সব মার্কেট, দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখতে হবে। তবে জনদুর্ভোগ এড়াতে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকানের মতো জরুরি সেবাগুলো এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক নির্দেশনা দেয়া হবে, যা আগামী রোববার থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে যানজট নিরসন ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ‘ইলেকট্রিক বাস’ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যেসব স্কুল এই উদ্যোগে অংশ নেবে, তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। তবে কোনো পুরনো বাস আমদানি করা যাবে না।
আলোকসজ্জায় নিষেধাজ্ঞা: জ্বালানি সংকটের এই সময়ে কোনো ধরনের বিয়ে বা সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
ব্যয় সংকোচন: সরকারের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বাজেট থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী তিন মাস পর্যন্ত সরকারি কোনো নতুন গাড়ি (সড়ক, নৌ বা আকাশযান) এবং কম্পিউটার সামগ্রী কেনা যাবে না। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের সব বিদেশ ভ্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের ৫০ শতাংশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন খরচও ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ ও বিকল্প উৎস: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ লাইন কিছুটা অনিরাপদ হয়ে পড়ায় সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সচিব জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকার সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।