Image description
অনুসন্ধান

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গঠন করা হয় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। এ লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ফাউন্ডেশনটি। পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করায় এবং জুলাই ফাউন্ডেশনের জন্য নতুন করে কোনো বরাদ্দ না আসায় ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চলবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফাউন্ডেশনের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। এ ছাড়া কার্যক্রম শুরুর প্রথম থেকেই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, কেনাকাটায় অনিয়ম, গত দেড় বছরে ফাউন্ডেশনের কোনো টেকসই আয়ের উৎস না থাকা, মব কালচারের মাধ্যমে ফাউন্ডেশনের সিইওকে সরানোর ব্যর্থ ষড়যন্ত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রাজনৈতিক গ্রুপিংসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ফাউন্ডেশনটির বিরুদ্ধে। এদিকে নিয়োগের পরে এখন পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো পদোন্নতি না হওয়ায় ক্ষোভ বিরাজ করছে তাদের মধ্যে।

ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, ফাউন্ডেশনের শুরু থেকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পদোন্নতি কিংবা বেতন বৃদ্ধি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা সোহেল মিয়ার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে টেন্ডার বাণিজ্য ও ফাউন্ডেশনের অফিসে বহিরাগত লোক নিয়ে মিটিং করার অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ফাউন্ডেশনের সব জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এমনকি সিইও’র রুমেও সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু সোহেল মিয়ার রুমে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাতে দেননি তিনি। পরে সিইও ফাউন্ডেশনের ফ্রন্ট ডেস্কে প্রতিদিন ফাউন্ডেশনে কে আসলো ও কে গেল সে সম্পর্কে রেজিস্টার ফাইল খুলে তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের বর্তমান প্রধান আইটি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেনাকাটায় অনিয়ম করে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অধিক টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঐ কর্মকর্তা আরও বলেন, পূর্বে আইটি প্রধান সাকিব ফাউন্ডেশনে ভেন্ডার হিসেবে কাজ করতো। তখন থেকেই তার বিরুদ্ধে বেশি দামে ফাউন্ডেশনে পণ্যে সাপ্লাইয়ের অভিযোগ আছে। কিন্তু তৎকালীন সিইও মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধকে এসব ব্যাপারে বললে সে সাকিবকে ফাউন্ডেশনের আইটি প্রধানের চাকরি দিয়ে এখানে নিয়ে আসে। এসব অভিযোগ নিয়ে বর্তমান সিইও’কে বললেও তিনি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বর্তমান সিইও মানবজমিনকে বলেন, ফাউন্ডেশনে বর্তমানে রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এসব কারণেই অভিযোগগুলো হয়তো এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে করছে। তবে আমরা যাচাই বাছাই করে এগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। কোনো অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না।

সূত্র জানায়, জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সোনালি ব্যাংকের রমনা ব্রাঞ্চে দু’টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। একটি মাদার অ্যাকাউন্ট অপরটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য অপারেশন অ্যাকাউন্ট। নিয়ম অনুযায়ী, মাদার অ্যাকাউন্টের টাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয় করতে পারবে না। কিন্তু অপারেশন অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় মাদার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চলছে ফাউন্ডেশনটির যাবতীয় কার্যক্রম। এখন ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার থেকে নতুন করে বরাদ্দ না দেয়ায় এবং পর্যাপ্ত অনুদান না আনতে পারায় শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সহায়তা প্রদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা অনুদান দেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে। এসময় বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ কোটি টাকা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি ৫ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আরও ৯ কোটি টাকাসহ মোট ১১৯ কোটি টাকা অনুদান আসে ফাউন্ডেশনের জন্য। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অনুদানের মোট ১১৯ কোটি টাকার মধ্যে ফাউন্ডেশনের মাদার অ্যাকাউন্টে আছে ৪ কোটি ৬ হাজার ৬৯১ টাকা ৩২ পয়সা। এ ছাড়া অপারেশন অ্যাকাউন্টে আছে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ফাউন্ডেশনের মিডিয়া প্রধানের ভাষ্যমতে প্রতি মাসে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বেতন, অফিস ভাড়া ও সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সে হিসাবে মার্চ মাসের ব্যয় মেটানোর পরে অপারেশন অ্যাকাউন্টে লক্ষাধিক টাকা অবশিষ্ট থাকবে। পরের মাসগুলোর ব্যয় কীভাবে হবে সে সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেনি তারা। 

এদিকে গত বছর ২৩শে এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে। এ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকার জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের ভাতা দেয়াসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ, পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন কাজ করছে। ফাউন্ডেশনও প্রায় একই ধরনের কাজ করায় এখন ফাউন্ডেশনটির প্রয়োজন আছে কিনা সে সম্পর্কে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য: ফাউন্ডেশনটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর মানবজমিনকে বলেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ৩৩৭ কোটি টাকা চাহিদার প্রেক্ষিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি খাত থেকে মোট অনুদানের ১১৯ কোটি টাকা জমা হয়। এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জনের মধ্যে ৮২২ জন শহীদ পরিবারের সদস্যদের ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত ৫ শহীদ পরিবারকে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য আইনি নোটিশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গেজেটভুক্ত আহতদের মধ্যে এ ও বি ক্যাটাগরিভুক্ত (অঙ্গহানিসহ গুরুতর আহত) সাড়ে ৬ হাজার জনকে ১ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। তবে ৮ হাজার ২০০ জন এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাননি। এর মধ্যে ২ হাজার জন অঙ্গ হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিও রয়েছেন।

তিনি বলেন, আন্দোলনে আহতদের অস্ত্রোপচার, হোটেল সুবিধা, যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, ওষুধ কেনা, হুইলচেয়ার কেনা, ফিজিওথেরাপি করানো, আন্দোলনে শহীদদের মায়েদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয়ের জন্য সরকার আলাদা করে বরাদ্দ দেয়নি। আমরা অপারেশন অ্যাকাউন্ট থেকে এটি দিয়ে আসছিলাম। কিন্তু এই অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স স্বল্পতার কারণে মাদার অ্যাকাউন্ট থেকে ঋণ নিয়েছি।

সিইও কামাল আকবর আরও বলেন, ফাউন্ডেশনটি যখন গঠন করা হয় তখন দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছিল। তখন যদি কোনো কর্মকর্তা তার পরিচিত কাউকে এনে সার্বিক কার্যক্রম চলমান রাখতে এখানে চাকরি দিয়ে থাকে তাহলে এটি দোষের কিছু না। কিন্তু আমরা আজকে থেকে সকল কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, তাদের এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) তৈরি করছি। তাদের পারফরমেন্স অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে হলে দিবো। এক্ষেত্রে কিছু কর্মকর্তাকে বাদ দিতে হলে তাও করবো। কেনাকাটায় অনিয়মের ব্যাপারে তিনি বলেন, ফাউন্ডেশনে প্রত্যেকটি কেনাকাটার জন্য ক্রয় কমিটি গঠন করা হয়। এমনকি যদি চিনিও কেনা হয় তবে ৩ সদস্যের কমিটি করে দেই তারা গিয়ে কিনে নিয়ে আসে। সুতরাং কেনাকাটার মাধ্যমে অনিয়ম করে ফাউন্ডেশনের টাকা নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। এ ছাড়া কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্যের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।‘মব’ করে সিইও’কে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল স্বীকার করে কামাল আকবর বলেন, ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনুসারী রয়েছে। আবার নিরপেক্ষ লোকও রয়েছে। মার্চের শুরুর দিকে কিছু কর্মকর্তা আমার বিরুদ্ধে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমি বিষয়টি টের পেয়ে তাদের ডেকে বলি যদি আমার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ থাকে বলো। অন্যথায় মব করার চেষ্টা করলে আমি তোমাদের চাকরি থেকে প্রয়োজনে অব্যাহতি দেবো। পরে, বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা আর অগ্রসর হয়নি।