নেই ফিটনেস, নেই চালকদের লাইসেন্স, তবুও রাজধানীর প্রধান সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শুধু রাজধানীর ভিআইপি সড়ক নয়, অলিগলিও তাদের দখলে। বেপরোয়া গতির কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। গত দেড় দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়েছে গাণিতিকহারে। সড়কের গলার কাঁটা হয়ে ওঠা এই যান এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা করেও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। লাখ লাখ নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে যন্ত্রণার এই যানের বিকল্প নিয়ে ভাবছে সরকার। এসব অটোরিকশার বিকল্প হিসেবে ই-রিকশা নামানোর চিন্তা করা হচ্ছে। তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে আপাতত সেটিও বাস্তবায়ন করতে পারছে না। উন্নত বিকল্প যান বাজারে এনে চালকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গাণিতিকহারে বাড়তে থাকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। খেয়ালখুশি মতো রিকশা তৈরি করে নামিয়ে দেয়া হয় সড়কে। ফলে অলিগলি থেকে প্রধান সড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়ায় রিকশাগুলো। তখন সরকার জানায়, লাখ লাখ রিকশা রাতারাতি তুলে দেয়া সম্ভব নয়। অবৈধ হলেও এসব রিকশার সঙ্গে অনেক মানুষের আয় আর কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে এসব রিকশার বিষয়ে কঠোর হতে পারেনি সরকার। বরং বিকল্প চিন্তা শুরু করে। বিকল্প চিন্তা হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই-রিকশার প্রচলন শুরু করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)- কোনো প্রতিষ্ঠানই অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে।
সাধারণত মোটরযান নির্মাণে নকশা অনুমোদন, ফিটনেস পরীক্ষা ও সড়কে চলাচলের লাইসেন্স বিআরটিএ দিয়ে থাকে। তবে অটোরিকশা মোটরযানের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না- এমন যুক্তিতে বর্তমানে এই বাহন কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়েছে। এদিকে সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান না দিয়ে হাইকোর্ট থেকে একাধিকবার ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
গত বছর দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করেছিল সরকার। সর্বশেষ নীতিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। পরে সেটিও আর আলোর মুখ দেখেনি। অটোরিকশা চালকরা সরকারের কাছে লাইসেন্স দেয়ার ব্যবস্থা করার দাবি করছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশ প্রতিবার ধরলে ১২০০ টাকা জরিমানা নেয়, ফলে তাদের পুরো দিনের আয় নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি, চালকরা মনে করেন তাদের ওপর অভিযান চালানোর পরিবর্তে যেখানে এসব রিকশা তৈরি করা হয়, সেখানে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে পাল্লা দিতে বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ই-রিকশার প্রচলন করে সরকার। চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার আফতাবনগরে ই-রিকশার উদ্বোধন করে সিটি করপোরেশন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখভাল করছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন জিগাতলা এলাকায় পৃথক দু’টি অনুষ্ঠানে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উত্তর সিটির বাড্ডা-রামপুরা সড়ক থেকে আফতাবনগরে প্রবেশকারী নির্ধারিত সড়কে ই-রিকশার পরীক্ষামূলক চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। দক্ষিণ সিটির ধানমণ্ডি এলাকায় নতুন ই-রিকশা এবং মতিঝিল এলাকায় রূপান্তরিত ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। বর্তমানে এই এলাকাগুলোতে ই-রিকশা চলছে।
ডিএনসিসি সূত্র মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে, বাজেট শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ই-রিকশা প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সিটি করপোরেশন থেকে প্রস্তাব পাঠিয়ে দিয়েছে ডিএনসিসি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেলে বাণিজ্যিকভাবে এসব রিকশা সড়কে নামানো যাবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসি’র কর্মকর্তারা। ডিএনসিসি সূত্র জানিয়েছে, নতুন ই-রিকশা ইতিমধ্যে তৈরি করা শুরু করেছে। সর্বশেষ নতুন নকশার ব্যাটারিচালিত এসব রিকশা চালাতে ৩০০ জন রিকশা চালকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করে ডিএনসিসি। সরকারিভাবে সেই প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। প্রশিক্ষকের বা ‘মাস্টার ট্রেইনারের’ প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হচ্ছে মোট ৫৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ই-রিকশার পরিকল্পনায় ছিল নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, মানসম্মত যানবাহন চালু এবং বৈধ চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় সীমিত পরিসরে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সার্বিক পরিস্থিতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে যেসব অটোরিকশা চলছে এগুলো সব অনিরাপদ। এগুলো উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে জোর করা যায় না, কারণ তারা আন্দোলন করে। বুয়েটের যে ডিজাইন অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি মাঠে নামানো হবে এবং বর্তমানে যেগুলো চলছে সেগুলো উঠিয়ে দেয়া হবে। আমরা ইতিমধ্যে পাঁচটা কোম্পানিকে অনুমতি দিয়েছি অটোরিকশা তৈরি করার জন্য, অনুমতি পেলেই তারা মাঠে নামবে। ইতিমধ্যে ৩০০ জন প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১০ হাজার চালককে ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ মানবজমিনকে বলেন, অটোরিকশার লাইসেন্স নিয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। সিটি করপোরেশন শুধু প্যাডেলচালিত রিকশার লাইসেন্স দিয়ে থাকে। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছি।
রাজধানীতেই প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শত শত অটোরিকশা
খোদ রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্কশপেই প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শত শত অটোরিকশা। ব্যাটারিচালিত রিকশা আমদানি হয় না বাংলাদেশে। এগুলো দেশেই তৈরি হয় দেশীয় কারিগরদের হাতে। কোনো ধরনের নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই ওয়ার্কশপগুলোতে তৈরি হচ্ছে অটোরিকশা। রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, বসিলা, কেরানীগঞ্জ, বেড়িবাঁধ, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়, মূলত পাড়া-মহল্লাগুলোয় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য ওয়ার্কশপ। চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারি, মোটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে তৈরি চাকা, বসার সিট, রিকশার বডি যোগ করে এসব যান তৈরি করা হয়। প্রতিটি অটোরিকশা তৈরি করতে খরচ পড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকা। এগুলোর কোনোটি চিকন চাকার, কোনোটির চাকা মোটা। কোনোটির কাঠামো লোহার, কোনোটিতে লোহার কাঠামোর সঙ্গে ওপরে বেতের ছাউনি। কোনোটি শুধু পায়ে চালিত রিকশার মধ্যেই মোটর লাগিয়ে অটোতে রূপান্তর করা হয়েছে, কোনোটিতে আবার কাঠামো পরিবর্তন হয়েছে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)’র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে এই ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। দৈনিক এসব রিকশা ব্যবহার করেন ১১ কোটির বেশি মানুষ। তবে অটোরিকশার এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সমান্তরালভাবে বেড়েছে বিশৃঙ্খলা। সিপিডি জানিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ২১ শতাংশের সঙ্গে অটোরিকশা জড়িত। এ ছাড়া, প্রতিদিন এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয়; যা প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট। দেশে রয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৩ হাজার ৩০০ বৈধ স্টেশন।
ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য প্রধান করণীয় হলো- এগুলোকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনা। এজন্য একটি বাই-লজ প্রণয়ন করে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও চালকদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। চালকদের দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া, ওয়ার্ডভিত্তিক সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল সীমিত করতে হবে এবং বড় সড়ক বা মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে। যেহেতু এগুলো মোটরযান নয়, তাই রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্সিংয়ের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা উচিত।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, প্রধান সড়কগুলোতে ছোট যানবাহন বন্ধ করে বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। রিকশা বা অটোরিকশাকে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন দেয়া সমাধান নয়, বরং এটি বড় ভুল হতে পারে। কারণ অতীতেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে হলে আবেগ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়ন দরকার। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে এসব যানবাহন তুলে দিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।