Image description
সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যু

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ গড়াচ্ছে রাজপথে। গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ ১১ দলীয় জোট।

তারা বলছে, সংবিধান সংস্কারে দেশের জনগণ জুলাই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার না করে তাদের পছন্দমতো কিছু বিষয় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি জনরায়কে উপেক্ষা করা। এ কারণে ন্যায্য দাবি আদায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি দিতে ৭ এপ্রিল বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।

এদিকে সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ অস্তিত্বহীন। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এজন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হবে। রোববারের মধ্যেই গঠন করা হবে এ কমিটি।

অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণভোট আয়োজন করেছে, বৃহস্পতিবার সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ অবস্থায় গণভোট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া ছাড়াও বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে। কেউ কেউ এও বলছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলে পুরো গণভোট অবৈধ হয়ে যাবে।

এদিকে ৩ মার্চ গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ফলে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একধরনের আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। এতে সবকিছু মিলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে-এমনটিই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, গণভোট অধ্যাদেশটি বাতিলের জন্য সংসদীয় কমিটি সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। এখন অধ্যাদেশটি ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, শুরুতেই অধ্যাদেশটি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কারণ, এতে এমন কিছু আছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না।

তবে ব্যারিস্টার আহসানুল করিম যুগান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশের মানে হলো-এটি আর আইনে রূপ নেবে না। তবে গণভোট অধ্যাদেশটি আইনে রূপ না নিলেও গণভোট বাতিল হবে না। কারণ, ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে গণভোট হয়ে গেছে। আর এটি আইনে রূপ নেওয়ার মানে হলো-ভবিষ্যতে এই আইনের মাধ্যমে মানুষের জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কিন্তু সেটির আর প্রয়োজন নেই।

প্রসঙ্গত, জুলাই জতীয় সনদ বাস্তবায়নে ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অধিবেশন ডাকা হয়নি।

এ কারণে সংসদের বাইরেও রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে বিরোধী দল। এবারের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। অর্থাৎ, ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা আদেশে বলা নেই। এতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়তো আদালতের মাধ্যমে সুরাহা হতে হবে।

রাজপথে বিরোধী দল : গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট। উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টি অন্যতম।

শনিবার বিকাল ৫টায় তারা বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে। দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, সরকার সংসদে গণভোটের সমাধান না করলে ১১ দলের উদ্যোগে আন্দোলন চলবে।

বিক্ষোভ সমাবেশের পাশাপাশি গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনমত গঠনের চেষ্টা করবে বিরোধী দল। একই সঙ্গে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করা হবে। এরপরও সরকার জনমতকে উপেক্ষা করলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে বিরোধী দল। তিনি বলেন, সরকারি দল গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটা দুঃখজনক ঘটনা। এর মাধ্যমে যে প্রতিশ্রুতির আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও নির্বাচন হয়েছে, সেটিকে অস্বীকার করা হয়েছে। জাতিকে অপমান এবং প্রতারণাও করা হয়েছে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার কর্তৃত্ববাদ, স্বৈরাচার তৈরির রাস্তা উন্মুক্ত করে গেছে। সেই রাস্তায় শেখ হাসিনা সাংবিধানিক স্বৈরাচার হয়েছিল। বর্তমান সরকারও সেই রাস্তায় হাঁটছে। এটা ভুল পথ। সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারই করতে হবে। সংস্কার করতে হলে গণভোট মানতে হবে। সেজন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হলে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া বিরোধী দলের আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, সরকারি দল সংসদ পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার মতোই ফ্যাসিবাদী রাস্তায় হাঁটছে।

সংস্কারকে ধামাচাপা দিয়ে সরকার সংবিধানে শুধু তাদের মনমতো কিছু সংশোধনী আনতে চায়। অথচ জুলাই সনদের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ রায় দিয়েছে। সেটা মানতে সবাই বাধ্য। বিএনপিসহ আমরা সেই অঙ্গীকার করেছিলাম এবং তা সংসদেই সমাধান চেয়েছিলাম। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তারা ক্ষমতায় গিয়ে এখন সেটা থেকে সুস্পষ্টভাবে সরে এসেছে। তাই রাজপথের আন্দোলন ছাড়া ১১ দলের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে, যা জনগণকে অপমান করা এবং রক্তাক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থি।

তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন মহান সংসদের এখতিয়ার এবং একটি নিয়মিত কাজ। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বুধবার সংসদে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আরোপিত আদেশ একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ সময় তিনি ১৩ নভেম্বর জারি করা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। তিনি সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়ে নিজেই তা ভঙ্গ করেছেন। বিএনপির দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, সারা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা আছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা দুটি দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে প্রথমত, ১৮০ কার্যদিবস তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসাবে কাজ করবেন। এরপর তারা নিয়মিত আইনসভার সদস্য হিসাবে কাজ করবেন। এজন্য তাদের দুটি শপথ নিতে হবে। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটের মাধ্যমে জুলাই আদেশ পাশ হয়েছে।