মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত এই সংকট দূর না হলে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিপর্যয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি আমদানি ও সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর কাছে সহজ শর্তের ঋণ সহায়তা চাইবে সরকার। ১৩-১৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বসন্তকালীন সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের তীব্র জ্বালানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত এ খাতে ঋণ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানা যায়, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তেল, গ্যাস, কয়লা ও এলএনজি আমদানি করে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আগামী এক বছর আমদানি খরচ আরও ৩ থেকে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উত্তোলন কমে যাওয়ায় এলএনজি আামদানি বেড়েই চলছে। এ অবস্থায় জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ মেটাতে অর্থ সংস্থানে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর এবারের বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সারা বিশ্বেই এখন জ্বালানি সংকট চলছে। ডিজেল, এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও নাজুক।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। ওই বৈঠকেই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রচলতি ঋণ কর্মসূচির বাইরে জ্বালানি খাতের জন্য বিশেষ ঋণ সহায়তা চান। ওই সময় অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আইএমএফ-এর সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা পাওয়া যায় কি না, সেই বিষয়ে বসন্তকালীন বৈঠকে আলোচনা হবে। ১১ এপ্রিল ওয়াশিংটনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন অর্থমন্ত্রী। উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকে আরও অংশগ্রহণ করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর একাধিক সাইড মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করবেন অর্থমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর এবার বস্তকালীন বৈঠকে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থায়ন, বাজেট সহায়তা এবং অবকাঠামো ও বিনিয়োগের মতো তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি কার্যপত্র তৈরি করা হয়েছে, যেটি অর্থমন্ত্রী বৈঠকে তুলে ধরবেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় অর্থমন্ত্রীকে জ্বালানি আমদানিতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ছুটে যেতে হচ্ছে।
এছাড়া ১১ জুন মহান সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। কয়েক বছর ধরেই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নতুন বিনিয়োগ কম হওয়ায় চাপের মুখে দেশের অর্থনীতি। সরকারের রাজস্ব আয়ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। ফলে সরকারের ব্যয়ের খরচ বাড়লেও আয় বাড়েনি। এতে বিদেশি ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণও বাড়ছে। এরই মধ্যে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে দেশে। দ্রুত জ্বালানি আমদানি ব্যর্থ হলে অর্থনীতিতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
আর এ কারণে এবার জ্বালানি খাতে ঋণ সহায়তাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে সরকার জ্বালানি খাতে ঋণ সহায়তা চাইবে, এটা ঠিকই আছে। এ মুহূর্তে দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবে আইএমএফ থেকে জ্বালানি খাতের ঋণ সহায়তার বিষয়টি সহজ নয়। কারণ, সংস্থাটির ঋণ সহায়তা নেওয়া হলে তারা (আইএমএফ) প্রথমেই বিদ্যুৎসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরামর্শ দেবে। কিন্তু এ মুহূর্তে বিশ্ববাজারে সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়লেও দেশে বাড়ানো হয়নি। তিনি বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হয়তো এ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু আইএমএফ-এর ঋণ নিতে হলে ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। তিনি জানান, সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে তাতে সব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ রয়েছে কি না, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। এগুলো নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। এছাড়া এবারের বসন্তকালীন বৈঠকে ঋণ পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। কারণ, সবাই ঋণ চাচ্ছে। এক্ষেত্রে যে ধরনের নেগোসিয়েশন দরকার তাতে আরও সক্ষমতা অর্জন করা প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সম্প্রতি এক বৈঠক শেষে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি ও রপ্তানি খাত গভীরভাবে পরস্পর নির্ভরশীল। জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি শিল্পোৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রভাব ফেলে। এজন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কী পরিমাণ অর্থ পাওয়া যেতে পারে : বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ২৫০-৫০০ মিলিয়ন ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তাও পাওয়া যেতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সরকার জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি নিশ্চিত করতে কয়েকশ কোটি ডলার বৈদেশিক অর্থায়ন খুঁজছে।
আইএমএফ-এর পাশাপাশি নতুন অর্থায়ন জোগাড় করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বড় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরকার আলোচনা করছে বলে জানা গেছে। তেল ও জ্বালানি খাতে সহায়তার জন্য বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো থেকে অর্থ পাওয়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এছাড়া আইএমএফ-এর সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে এ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। ওয়াশিংটনে বসন্তকালীন বৈঠকে এবার ষষ্ঠ কিস্তির বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ।