মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আঘাত হেনেছে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নিরাপত্তায় এই আঘাত স্পষ্ট। যুদ্ধের প্রথম এক মাসে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে শুধু জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিতে সরকারের লোকসান হয়েছে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জ্বালানি তেলে ক্ষতি ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং এলএনজি আমদানিতে ক্ষতি ১ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থনীতির বড় ক্ষতি আরও স্পষ্ট হবে এপ্রিল মাস থেকে। কারণ মার্চের জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অনেকটা ফেব্রুয়ারি মাসে কেনা ছিল। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যে না থামলে এপ্রিল থেকে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে দেশকে। বাড়তি দামে তেল ও গ্যাস কিনতে হলে শুধু এপ্রিলে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হবে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেল নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে সরকার। মুদ্রাস্ফীতি ও জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে বিশ্ব বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের দাম বাড়াতে পারছে না সরকার। অন্যদিকে, বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রিতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে চাপে পড়তে হবে। এখন প্রশ্ন সরকার কতদিন এই চাপ নিতে পারবে! মঙ্গলবার সরকার এক ঘোষণায় জানিয়েছে, এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকবে। যদিওবা বিশ্ববাজারে গত এক মাসে তেলের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী প্রতি মাসের ১ তারিখে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতিসহ বিভিন্ন কারণে চলতি মাসে সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার যতদিন সম্ভব ভর্তুকি দিয়ে যাবে। তবে, এক সময়তো জনগণকে এই বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এটা ঠিক যে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম নিয়ে সরকার চাপে আছে। আপাতত চলতি মাসের জন্য যে জ্বালানি তেলের দাম সরকার বাড়ায়নি, এটাকে আমরা সমর্থন করি। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। একপর্যায়ে দেশের বাজারে দাম বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকার তেল আমদানি থেকে শুল্ক নেয়। এতে করে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে। আপাতত সেই আয় দিয়ে বাড়তি ব্যয় মেটাতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সরকার চাইলে এবার অল্প করে হলেও তেলের দাম বাড়াতে পারত। কারণ ডিজেল এখন ১০০ টাকা লিটার বিক্রি হয়। কয়েক মাস আগে এটি ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। লিটারে ১০ টাকা কমানোর ফলে পরিবহণ খাত এত দিন লাভ করেছে। তাদের ভাড়া কিন্তু কমেনি। এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং পরিস্থিতি জটিল হলে তেলের দাম আকাশচুম্বি হয়ে যাবে। তখন সরকার একলাফে দাম অনেক বাড়ালে জনগণ তা ভালোভাবে নেবে না।
বর্তমান বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। এর মাত্র ১০ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ৭০ ডলারের জ্বালানি তেল এখন ১১৫ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।
জানা গেছে, যুদ্ধের এক মাসে জ্বালানি তেলের একটি প্রাথমিক হিসাব জমা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। ওই হিসাবে তেলের বাড়তি দামের ক্ষতিও উল্লেখ করা হয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে বেশির ভাগ তেল কেনা থাকা সত্ত্বেও মার্চে বিপিসিকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল এবং অন্যান্য জ্বালানি তেল কিনে লোকসান দিতে হয়েছে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি। ওই সময়ে বাজারে ১০০ টাকা লিটার ডিজেলের মূল্য থাকলেও বিপিসিকে কিনতে হয়েছে ১৫৫ টাকায়। অকটেন ও পেট্রোলে প্রতি লিটারে লোকসান দিতে হয়েছে ৩০ টাকার বেশি। মার্চের শেষে এবং এপ্রিলের শুরুতে ডিজেল প্রতি লিটার কিনতে হচ্ছে ১৯০ টাকা করে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই মূল্য আরও বাড়বে। তবে এপ্রিলে সরকারকে কত টাকা বেশি দিতে হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না বিপিসি। ধারণা করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি শান্ত না হলে এপ্রিলে তেল কিনে সরকারকে লোকসান দিতে হতে পারে ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান জানান, সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দামের বিষয়টিও খেয়াল রাখছে।
এদিকে দেশে দৈনিক গ্যাস ব্যবহার হয় ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৯৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে দেশে সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধের আগে প্রতি ইউনিট গ্যাস আমদানিতে খরচ পড়ত ৭৫ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৬ টাকায়। আগে দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে আমদানি গ্যাস মেশালে প্রতি হাজার ঘনফুটে দাম পড়ত ২৮ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩২ টাকা ২০ পয়সায়। বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস বিক্রি করে ২৩ টাকা ৪৬ পয়সায়। গত অর্থ বছরে আমদানি করা এলএনজির সঙ্গে দেশে উৎপাদিত গ্যাস মেশানোর পর গড় মূল্য পড়েছে প্রতি ইউনিট ২৮ টাকা। বছর শেষে পেট্রোবাংলা লোকসান দিয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। যা অর্থ মন্ত্রণালয় পরে ভর্তুকি হিসাবে তাদের দিয়েছিল। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেছেন, যুদ্ধ না থামলে জুন পর্যন্ত পেট্রোবাংলার বাড়তি ব্যয় হতে পারে ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। তিনি বলেন, মার্চে স্পট মার্কেট থেকে মাত্র দুই কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এ কারণে সেই মাসে লোকসান হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিলে বেশির ভাগ এলএনজি কার্গো কিনতে হচ্ছে স্পট থেকে। এতে করে প্রতি মাসে বাড়তি ব্যয় হবে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা।
কাতার ও ওমানের গ্যাসের অন্যতম ক্রেতা হচ্ছে পেট্রোবাংলা। ওই দুই দেশের গ্যাস কোম্পানি এবারের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কমেছে ১৭ শতাংশ। এটি মেরামত করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে। ওমান ও কাতার আপাতত কোনো এলএনজি কার্গো পেট্রোবাংলাকে দিচ্ছে না। চলতি মাসের শেষের দিকে কাতার ও ওমান তাদের গ্যাস সরবরাহের ব্যাপারে পেট্রোবাংলাকে জানাবে।
জানা গেছে, চলতি মাসের ১০ তারিখের পর অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটনে আইএমএফের বৈঠকে যাচ্ছেন। সেখানে তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। আইএমএফের ঋণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং সারে যথাসম্ভব ভর্তুকি কমিয়ে আনা। বাজেট ঘোষণার আগে সেই ভতুর্কি কমিয়ে আনতে সরকারকে বড় চাপ দিতে পারে আইএমএফ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেছেন, জ্বালানি খাতে উন্নয়নের নামে অনেক লুটপাট হয়েছে। তাছাড়া জ্বালানি খাতে এখনও আগের দুর্নীতি চক্র বহাল আছে। এই চক্রকে ধ্বংস করতে পারলে জ্বালানি খাতের ব্যয় অনেক কমে আসবে।