Image description
জ্বালানি তেল সংকটে অলস ভাসছে শত শত লাইটার কার্গোজাহাজ,  খাদ্য-ভোগ্য-সেবাপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল আটকে আছে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাদার ভেসেলে : দেখতেও যাননি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-কর্তারা,  সাগর উপকূল নদী মোহনায় মাছ ধরার ভরা মৌসুমেও বেকার অগণিত জেলে : ঘাটে ঘাটে বাঁধা হাজারো ট্রলার-নৌযান,  ‘জ্বালানি সরবরাহ যাতে একদম বন্ধ হয়- সরকারের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা আছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সামাল দেয়া কতখানি সম্ভব হবে?’ Ñবিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম,  ‘সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এবং পেনিক বায়িংয়ের কারণেও সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। মনিটরিং প্রয়োজন’ : বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা আমিরুল হক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে বৈশি^ক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা বাড়ছেই। যুদ্ধ পরিস্থিতি যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে সারাবিশে^র মতো বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সঙ্কট ততই জটিল আকার ধারণ করছে। খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহন, জীবনযাত্রা, জীবনধারণে পড়েছে জ্বালানি সঙ্কটের বড়সড় ধাক্কা। বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের চরম সঙ্কটের কারণে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনে লাইটার কার্গো জাহাজ-কোস্টারের কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক কাভার্ডভ্যান ও ভারী যান চলাচল সীমিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ডিজেল ও পেট্রোলের তীব্র ঘাটতির বিরূপ প্রভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর বহির্নোঙর, মোংলা বন্দর এবং দেশের সবক’টি নৌ বন্দরমুখী ও বহির্মুখী পণ্য লাইটারিং খালাস, ডেলিভারি পরিবহন কার্যক্রম থমকে গেছে।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এলাকায় নিয়মিত চলাচলকারী লাইটারেজ জাহাজ, কার্গো জাহাজ, বার্জ, কোস্টারসমূহের জন্য দৈনিক প্রায় ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। অথচ চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ভাগ সরবরাহ মিলছে। ডিজেল ও পেেেট্রাল সঙ্কটের কারণে ছোট ছোট দেশীয় লাইটার কার্গো জাহাজ কোস্টার নৌযান আমদানি পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসা মাদার ভেসেলগুলো (বড় জাহাজবহর) থেকে পণ্য খালাস বা লাইটারিং কাজ চালাতে বহির্নোঙরে যেতে পারছে না।

আগে স্বাভাবিক সময়ে একেকটি লাইটার জাহাজ-কোস্টার পণ্য পরিবহনে দৈনিক ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেলের সরবরাহ পেতো। অথচ গত সপ্তাহ পর্যন্ত দিনে লাইটার জাহাজপ্রতি গড়ে দেড় দুই হাজার লিটার করে পাওয়া গেলেও এখন মিলছে মাত্র ৪শ’ থেকে ৫শ’ লিটার জ¦ালানি তেল। যা দিয়ে বহিনোঙর পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নৌপথে পণ্য পরিবহন স্থবির হয়ে পড়েছে। অবশ্য মেরিন বাংকারিং ( নৌযানে তেল সরবরাহকারী) সিন্ডিকেট এবং লাইটার জাহাজ মালিক বা পরিচালকদের একাধিক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে নিয়ন্ত্রণের কারণেও সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। তারা ‘সিন্ডিকেট’ ও মজুদদারি ভেঙে দেয়ার জন্য নিয়মিত মনিটরিংয়েরও তাগিদ দেন।

এই পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে প্রায় ৮০টি বড় জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আটকে আছে। অলস বসে থাকার খেসারত দিতে গিয়ে প্রতিটি মাদার ভেসেল ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার হারে ডেমারেজ বা লোকসান গুণছে। বাড়ছে জাহাজ পরিচালন (ফিক্সড অপারেটিং কস্ট) খরচ। এসব বড় জাহাজে চাল, গম, চিনি, সার, বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য, সেবা-পরিষেবা খাতের পণ্য, ভারী ও মাঝারি শিল্প-কারখানার কাঁচামাল আটকে পড়েছে। শিল্প-কারখানা সচল রাখতে তৈরি হয়েছে নতুন সঙ্কট এবং অনিশ্চয়তা। কপালে চিন্তার ভাঁজ শিল্প মালিকদের। পণ্যসামগ্রী খালাস ও পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বড় জাহাজবহরের অতিরিক্ত ব্যয় পুষিয়ে নিতে আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ‘এটা অনিবার্য পরিস্থিতি। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধস সৃষ্টি হতে পারে; এই আশঙ্কার কথা আমি আগেও বলেছিলাম। এতে আমাদের অর্থনীতির নানা খাতে বিপর্যয়গুলো মারাত্মক আকার ধারণ করবে। জ্বালানি তেলের সরবরাহে সঙ্কটের কারণে সমুদ্র বন্দর, নৌপথে পণ্য পরিবহন বিপর্যস্ত হচ্ছে। অবশ্য জ¦ালানি তেল সরবরাহ যাতে একদম বন্ধ হয়ে না যায়; সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে সামাল দেয়া কতখানি সম্ভব হবে?’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোশিয়েশনের (বিসিএমএ) ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি সাবেক বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ফেডারেশন ও চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের সঙ্কট নেই। সবাই তো তেল সরবরাহ পাচ্ছে। নেপথ্যে ফুয়েল বাংকারিং এবং লাইটার জাহাজ পরিচালনায় সিন্ডিকেটের কারণেই জ¦ালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। তাছাড়া যে যেভাবে পারছে যথেচ্ছ পেনিক বায়িং (আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয়) ও মজুত প্রবণতা এরজন্য দায়ী। তিনি প্রশ্ন করেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মনিটরিং সেল কোথায়? তারা কেন তৎপর নয়? তিনি জ¦ালানি খাতের সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপপনা ও তদারকির ওপর গুরুত্ব দেন।

বৈশি^ক জ্বালানি সরবরাহে টালমাটাল পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সঙ্কট বৃদ্ধির সাথে সাথে দুই প্রধান সমুদ্র বন্দরসহ দেশের নৌপথে পণ্যসামগ্রী পরিবহনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি তেল বিশেষত ডিজেল ও পেট্রোল সঙ্কটের জেরে বন্দরসমূহে এবং মোহনায়, ঘাটে অলস ভাসছে শত শত লাইটার কর্গোজাহাজ, কোস্টার, বার্জ।
নৌ-পরিবহন খাতে সংশ্লিষ্টরা পরিতাপের সঙ্গে বলছেন, সঙ্কটকালে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখা ও সরকারের পক্ষ থেকে আপদকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য এখন পর্যন্ত আসেননি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-কর্তারা। তাছাড়া ডিজেল ও পেট্রোলের সঙ্কটের মুখে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নোয়াখালী-চাঁদপুর, ভোলা-বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা-খুলনার বিশাল সমুদ্র উপকূল, নদ-নদী মোহনায় মাছ ধরার বর্তমান ভরা মৌসুমেও মাছ শিকার অনেকাংশে বন্ধ রয়েছে।

আয়-রোজগারের উপায় হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে অগণিত জেলে, মাঝি-মাল্লা। মৎস্য অবতরণকেন্দ্রগুলো প্রায় ফাঁকা। খাঁ খাঁ করছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ পাইকারি ও খুচরা বাজারে সামুদ্রিক মাছের আকাল চলছে। যা আছে তাও দাম আকাশছোঁয়া।

জেলেরা বলছেন, মাছের তুলনায় ডিজেলের দাম পড়ছে অনেক বেশি। সহজে পাওয়া যাচ্ছেও না। ডিজেল ও পেট্রোলের অভাবে ঘাটে ঘাটে বাঁধা আছে হাজারো ট্রলার-নৌযান, যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌকা। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ শিকারের নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা ৫৮ দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার আগেই জেলেরা জ্বালানি সঙ্কটের কারণে বসে বসে কাটাতে হচ্ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে মাছ লুটেরা ভারতীয় ও বার্মিজ জেলেরা।
জেলেসহ মৎস্যজীবীদের প্রণোদনা সহায়তা প্রদানের জন্য এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ইতঃমধ্যে দক্ষিণের বরগুনা, পটুয়াখালী, উত্তরাঞ্চলের চিলমারীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের দাবিতে স্থানীয় জেলেরা খালি বোতল নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। ডিজেল ও পেট্রোলচালিত অধিকাংশ ট্রলার নৌযান বন্ধ থাকায় মৎস্য আহরণ ও রফতানি খাত বিপর্যয়ের মুখোমুখি।

এদিকে বৈশি^ক জ্বালানি সরবরাহে সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সরবরাহের সীমাবদ্ধতায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির আওতায় সাপ্লাই চেইনে (ডিলার ও এজেন্টরা) চাহিদা অনুযায়ী জ¦ালানি তেল দিতে পারছে না। এ অবস্থায় বর্তমানে নৌ পরিবহন সমন্বয় সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) আওতায় পরিচািলত প্রায় ১৫শ’ লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অনিয়িমিত জ্বালানি তেল পাচ্ছে চাহিদার তুলনায় ১৫ থেকে ২৫ ভাগ।

তীব্র জ্বালানি সঙ্কটের কারণে অন্তত তিন ভাগের দুই ভাগ লাইটার জাহাজ কর্ণফুলী মোহনাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অলস ভাসছে। অনেক লাইটার কোস্টার জাহাজ সিরিয়াল পেয়েও জ্বালানি তেলের অভাবে পণ্য বোঝাই করতে পারছে না। নৌ-পথে পণ্য পরিবহন সচল রাখতে সঙ্কট দ্রুত উত্তরণে বিডব্লিউটিসিসি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে তেল সরবরাহের আবেদন জানিয়েছে। অন্যথায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরসহ মোংলা বন্দর এবং অন্যান্য নৌবন্দর থেকে চাল, গম, চিনি, সার এবং শিল্প কাঁচামাল সরবরাহ পরিস্থিতির আরো অবনতি এমনকি যে কোনো সময়ে পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।