চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশুদের ৯০ শতাংশেরই নিউমোনিয়া হচ্ছে। কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের নিউমোনিয়ায় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা তীব্র হলেই নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর অথবা আইসিইউ সাপোর্ট লাগছে। কিন্তু হাসপাতালগুলোয় চাহিদার তুলনায় শিশুদের নিবিড় পরিচার্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ বা আইসিইউ) সংকটে অভিভাবকদের ভোগান্তি বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি কোভিডের মতো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামজনিত রোগে শিশুদের নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট লাঘবে ‘বাবল সিপ্যাপ’ (একধরনের ভেন্টিলেশন সাপোর্ট যন্ত্র) সেবা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় রোববার থেকে হামের জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। যেসব উপজেলায় শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, প্রথমে ওইসব উপজেলায় এই টিকা কার্যক্রম শুরু করা হবে। বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে কাল (আজ) এবং পরশুর (শুক্রবার) মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বেশি আক্রান্তপ্রবণ উপজেলায় দুদিনের মধ্যে ভ্যাকসিন এবং সিরিঞ্জ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। রোববার সকাল থেকে টিকাদান শুরু হবে।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ শুরু করব। এজন্য ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সব ছুটি আগামীকাল (আজ) থেকে প্রত্যাহার করে নিলাম। কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে, তারা সবাই আন্ডার সুপারভিশন অব লোকাল অফিসার থাকবে এবং কাজ করবে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যতটা ভয়াবহভাবে মিজেলস (হাম) আমাদের আক্রমণ করেছে, এর চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রতিহতের চেষ্টা করেছি। কিছু ক্যাজুয়ালটি হয়েছে। আমরা প্রপারলি এটা ম্যানেজ করেছি। হাসপাতালে ওয়ার্ড ম্যানেজ করেছি বিভিন্ন জায়গায়। ত্বরিত গতিতে বেসরকারি খাত থেকে ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করেছি। ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করে সব জায়গায় এর ব্যবস্থা করেছি, যাতে ভেন্টিলেশন দেওয়া যায়। বাচ্চারা যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যায়।’
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসের হামের একটি ক্যাম্পেইন হয়েছিল। তবে সবাইকে তখন এর আওতায় আনা হয়নি। অসম্পূর্ণ অবস্থায় ওই ক্যাম্পেইন শেষ করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির কাছে ২১ দশমিক ৯ মিলিয়ন হামের টিকার মজুত রয়েছে। এ টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া টিকা কেনার জন্য ৬০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেনা হলে গ্যাভির কাছ থেকে নেওয়া টিকা রিপ্লেস করা হবে। আগে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সি শিশু টিকা পেলেও বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোররা এ টিকা নিতে পারবে।
এ পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এটি গত কয়েক বছরের নীতি ঘাটতি, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল বাস্তবায়নের ফল। বিশেষ করে টিকা সংগ্রহে ধীরগতি, সময়মতো ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন না করা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা এ সংকট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বুধবার দুপুরে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পঞ্চম তলার আইসিইউ ইউনিটের সামনে কয়েকজন অভিভাবককে অসহায়ভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। তাদের একজন ইয়াসমিন আক্তার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তার ৬ মাস বয়সি একমাত্র মেয়ে মরিয়ম হাম নিয়ে চারদিন ধরে আইসিইউতে ভর্তি। চিকিৎসকরা কোনো আশা দিচ্ছেন না।
তিনি আরও বলেন, মাসখানেক আগে মেয়ের নিউমোনিয়া হয়। তীব্র শ্বাসকষ্ট ও কাশি দেখা দেয়। দ্রুত পুরান ঢাকার বেসরকারি ন্যাশনাল মেডিকেলে নিলে অক্সিজেন ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার কথা বলে। সেখানে খরচ জোগাতে না পেরে পাশের মিটফোর্ড হাসপাতালে গেলে আটদিন ভর্তি থেকে বাড়ি নিয়ে যাই। দুদিন পর মেয়ের শরীরে গোটা গোটা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াও বাড়ে। ফের মিটফোর্ডে গেলে দুদিন ভর্তি রেখে ঈদের দিন রাতে চিকিৎসকরা জানান হাম হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে শিশু হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে শয্যা খালি না থাকায় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল রেফার্ড করে। প্রথমে চারতলার শিশু ওয়ার্ডে রাখা হয়। নিয়মিত অক্সিজেন, ইঞ্জেকশন পুশ, মুখ ও মলদ্বারে ঘা শুকাতে মলম ও চোখে ড্রপ দেয়। ৬ দিনেও পরিস্থিতি উন্নতি না হয়ে হামের সঙ্গে নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। অবশেষে আইসিইউতে দেয়।
আইসিইউ ইউনিটের ৩ নম্বর শয্যায় নেতিয়ে শুয়েছিল ১০ মাস বয়সি আরেক শিশু আলী হোসেন। শিশুটির মুখে অক্সিজেন মাস্ক, ডান পায়ে লাগানো ক্যানুলা দিয়ে লিকুইড ওষুধ ও বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে পালস অক্সিমিটার ক্রপ লাগিয়ে মনিটরে অক্সিজেন স্যাচুরেশন পরিমাপ করা হচ্ছে। চোখে-মুখে চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে ছেলের পাশে বসেছিলেন মা শারমিন ও দাদি আঁখি বেগম। শারমিন যুগান্তরকে বলেন, ২৪ দিন আগে ছেলের তীব্র জ্বর, কাশি সর্দির সঙ্গে শরীরের র্যাশ উঠলে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে নিই। চিকিৎসকরা হাম হয়েছে জানিয়ে ১২ দিন ভর্তি রাখে। হাম সেরে গেলে নিউমোনিয়া দেখা দেয়। এবার চিকিৎসকরা মির্জাপুরে কুমুদিনি হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে নিউমোনিয়া নিয়ে আরও ১২ দিন ভর্তি থাকলেও উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা দ্রুত ঢাকায় নিয়ে পিআইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার কথা বলে। এই হাসপাতালে আসার পর আইসিইউতে ভর্তি করেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছে, হাম থেকে নিউমোনিয়া হয়েছে। বুকে কফ জমেছে। শরীরে রক্তের মাত্রা কমে ৬ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সুস্থ্য হতে সময় লাগবে।
বড়দের আইসিইউতে শিশুদের চিকিৎসা : সরেজমিন দেখা যায়, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশুদের জন্য পৃথক আইসিইউ বা পিআইসিইউ নেই। বড়দের জন্য আইসিইউতে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আইসিইউ শয্যা পাঁচটি। চাপ সামলাতে আরও দুটি বাড়িয়ে সাতটি শয্যায় চিকিৎসা চলছে। এইচডিইউ (হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট) ওয়ার্ডের পাঁচটি শয্যার প্রতিটিতেই হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে শিশুদের ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। শয্যা সংকটে এক বছরের বেশি বয়সিদের ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিলা জাহান বলেন, এখানে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের সেবা দেওয়া হয়। হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, চোখের ইনফেকশন, ডায়রিয়ার চিকিৎসা হচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম থাকছে। অনেকের ভেন্টিলেশন বা আইসিইউ সাপোর্ট দরকার পড়ছে। দৈনিক গড়ে ১০ জন আইসিইউ সেবা পেতে অপেক্ষাধীন থাকছে। পরিস্থিতি মোকাবিলয়ায় হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্সসহ সব ধরনের জনবল বাড়ানো দরকার।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা স্বল্পতা এবং সেখানে থাকা অন্য রোগীদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কায় হামে আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে না। হাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী আসছে। শয্যা না থাকায় তাদের ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক যুগান্তরকে বলেন, শয্যা সংকটে অন্যত্র রেফার্ড করা হচ্ছে। হামের রোগীদের শ্বাসকষ্ট লাঘবে ২০টি বাবল সিপ্যাপের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরঞ্জাম চলে আসছে।
সারা দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে কতটি আইসিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউ এবং এইচডিইউ আছে, এর সঠিক তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। এ বিষেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান যুগান্তরকে বলেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল। এ সংখ্যা পরিবর্তন হয়। তবে করোনাকালে বেশকিছু আইসিইউ চালু করা হয়েছিল। আগেরগুলোসহ কোভিড সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশের আইসিইউর আপডেট সংখ্যা গণমাধ্যমে নিয়মিত দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, হাম আক্রান্তদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় আইসিইউ, পিআইসিইউ বা ভেন্টিলেশন খুব বেশি লাগছে না। যাদের ভেন্টিলেশন সাপোর্টের প্রয়োজন হচ্ছে তাদের জন্য আইসিডিডিআরবি উদ্ভাবিত ‘বাবল সিপ্যাপ’ নামে একটি যন্ত্র হাসপাতাল থেকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কাল (আজ) সকালে এবং শনিবার শিশু হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সদের বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার শেখানো হবে। আরও যেখানে প্রয়োজন হবে, পর্যায়ক্রমে সেসব হাসপাতালে পাঠানো হবে।
করোনাকালে ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্পের অধীনে দেশের ১০টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও ৪৩টি জেলা সদর হাসপাতালে ৫৬টি আইসিইউ ইউনিট গড়ে তোলা হয়, যেখানে মোট শয্যার সংখ্যা ৫৬০টি। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতেই সেই অবকাঠামোর বড় অংশ অচল হয়ে যায়। বর্তমানে ৯টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিভাগীয়সহ সব মিলে ১৪০টি আইসিইউ শয্যা সচল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এনআইসিইউ (নবজাতক আইসিইউ) ৩৮টি, পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিকস আইসিইউ) ১৬টি, বার্ন ইউনিট আইসিইউ ১২টি, ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সার্ভিস (ওসেক) ১২টি, সিসিএম (ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন) ১০টি, মেডিসিন আইসিইউ ১০টি শয্যার সঙ্গে মূল আইসিইউ ৪০টি শয্যা। এছাড়া হাসপাতালে অবস্টেটিক এবং কার্ডিয়াক সার্জারি আইসিইউ সেবা চালু রয়েছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০টি আইসিইউ এবং ১০টি এইচডিইউ মিলিয়ে ৩০টি শয্যা রয়েছে। রাজশাহী মেডিকেলে ২৭টি, রংপুর মেডিকেলে ১০টি, খুলনা মেডিকেলে ২৫টি, খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ১০টি, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেলে ৩৪টি, চট্টগ্রাম মেডিকেলে ১১৮টি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১৮টি এবং বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে।