ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশে যে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে, সেটা উপলব্ধির জন্য গবেষক হওয়ার দরকার নেই। ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেল নিয়ে হাহাকার এখন প্রতিদিনের চিত্র। জ্বালানিসংকট সহসাই কমার লক্ষণ নেই। জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আর এ ডিজেল নিয়েই যত উদ্বেগ। বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু সামনে বোরো মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, সংকটে পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে দুই মাসের কম সময়ে দেশের দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতেই দুর্নীতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ড. ইউনূস সরকারের আমলে এ দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত তো হয়নি, বরং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার দুর্নীতির কারণে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। অসম চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ না নিয়ে বিগত সরকার অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইউনূস সরকার ক্ষমতা নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি তদন্তের কথা বলেছিল, কিন্তু গত দেড় বছরে এ তদন্তের কোনো অগ্রগতি হয়নি। অনিয়ম খতিয়ে দেখতে অন্তর্র্বর্তী সরকার একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। ২০২৪-এর নভেম্বরে সেই কমিটি রিপোর্ট জমা দেয়। পর্যালোচনা কমিটি এমন সব তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছিল যা আন্তর্জাতিক সালিশি আইন ও কার্যধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের সহায়তায় শীর্ষমানের এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক আইন এবং তদন্ত সংস্থাকে অবিলম্বে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিটি অন্তর্র্বর্তী সরকারকে আরও জানিয়েছিল তারা নিশ্চিত করতে চায় যে তদন্তগুলো আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আলোচনা ও সালিশে গ্রহণযোগ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের গড্ডায় নির্মিত আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট ডুয়াল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জে ১৯৫ মেগাওয়াট গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রামের বাঁশখালী ৬১২ (প্রথম ইউনিট) মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেঘনাঘাটে সামিট গ্রুপের ৫৮৩ মেগাওয়াট ডুয়াল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মেঘনাঘাটে ইউনিক গ্রুপের ৫৮৪ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল অন্যতম। দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ২০১০ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ করে আওয়ামী লীগ সরকার। দুই বছরের জন্য করা এ আইনের মেয়াদ পরে তিন দফা বাড়ানো হয়। এতে আইনটি ১৪ বছর ধরে স্থায়ী হয়। এ আইনের অধীনে বাস্তবায়ন হয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বহু প্রকল্প। এ আইনের আওতায় প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিদ্যুৎ, জ্বালানি কেনা ও অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়। এমনকি এর বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। তাই এটি দায়মুক্তি আইন হিসেবেও পরিচিতি পায়। বিতর্কিত এ আইন কার্যকর করে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আওয়ামী লীগ সরকার বিপুল অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একচেটিয়া বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে কাজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করার অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে ৯১টি বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে, যার উৎপাদনসক্ষমতা প্রায় ১১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে অনেক কেন্দ্রকে বসিয়ে রেখেই বিগত সরকার বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে, যা নিয়ে বেশ সমালোচনাও হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের অধীনে করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে গত ৫ সেপ্টেম্বর হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে সরকার।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, কমিটি তাদের কাজের জন্য যেকোনো সূত্র থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় যেকোনো নথি নিরীক্ষা করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে আহ্বান করতে পারবে কমিটি। এ ছাড়া কমিটি ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিগুলোয় সরকারের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষা করবে। নিরীক্ষার ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করবে এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কমিটিকে সাচিবিক ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেবে। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গত ৩ অক্টোবর আদানি, সামিট, বেক্সিমকোসহ ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য চায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে। এর মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ড জেলার গড্ডায় স্থাপিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তি সই করে বিপিডিবি। অভিযোগ রয়েছে, আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওই চুক্তি সইয়ে গোপনীয়তা অনুসরণ করা হয়। কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বিপিডিবির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে ২৫ বছর মেয়াদি। শর্ত অনুযায়ী, চাহিদা না থাকলেও বিপিডিবিকে ৩৪ শতাংশ বিদ্যুৎ কিনতে হবে। পাশাপাশি এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে কয়লা ব্যবহার হয় সেখানেও নেওয়া হচ্ছে বেশি দাম।
দেশের প্রথম আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট থারমাল পাওয়ার প্ল্যান্ট (প্রথম পর্যায়)। প্রকল্পটি সমান মালিকানায় যৌথ কোম্পানি বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) এবং চায়না ন্যাশনাল মেশিনারিজ ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) যৌথভাবে এটি পরিচালনা করছে। প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।
কিন্তু পরে রহস্যজনক কারণে এসব চুক্তি অন্তর্র্বর্তী সরকার বাতিল বা বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু করেনি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইকবাল হাসান মাহমুদকে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতসহ বিদেশি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলোকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন। বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিবিড়ভাবে জড়িত। অথচ আগের সরকার এ বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিয়ে একের পর এক দেশবিরোধী চুক্তি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ চুক্তিই জাতীয় স্বার্থবিরোধী।
মন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকারের নীতি ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। অথচ দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদনসক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাত এবং বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি। ভারতের আদানি চুক্তিসহ বিগত সরকারের সময় করা সব বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার সবে দায়িত্ব নিয়েছে। দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই প্রতিটি চুক্তি খতিয়ে দেখা হবে। যেসব চুক্তি দেশবিরোধী বলে প্রতীয়মান হবে, সেগুলোর বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্র অন্য দেশের সঙ্গে করা চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং যাচাইবাছাই করতে পারে। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের চুক্তি যাচাইয়ের বিশেষ ব্যবস্থা আছে। ভারত যখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করে তখন তা দুই ভাবে যাচাই করা যায়। ভারতের পার্লামেন্টে এ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা যায়। এ ক্ষেত্রে স্পিকার একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে দেন। কোনো গোপন চুক্তি হলেও তা সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা করা যায়। এ ছাড়া ভারতের সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো চুক্তি যাচাই করার এখতিয়ার রয়েছে। কোনো চুক্তি যদি দেশের স্বার্থবিরোধী হয়, তাহলে তা বাতিলের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট দিতে পারেন।
১৯৯৩ সালে ভারত চীনের সঙ্গে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে লংজু চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি নিয়ে ভারতের পার্লামেন্টে তীব্র প্রতিবাদ হয়। পরে এ চুক্তি আর কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৭৪ সালে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি হলেও তা দীর্ঘ ৩৭ বছর পর বাস্তবায়িত হয়। কারণ ১৯৭৪ সালের ১৬ মের চুক্তি ভারতের পার্লামেন্টে অনুমোদিত না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি। ২০১১ সালে ভারতের লোকসভায় (পার্লামেন্ট) অনুমোদিত হওয়ার পরই তা কার্যকর হয়। ২০০৮ সালে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি নিয়েও লোকসভায় বিতর্ক হয়। পওে ভারত চুক্তির কিছু অংশ সংশোধন করে। ২০১৬ সালে ভারত ইরান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে চাবাহার চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে এ চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
এ রকম অনেক উদাহরণ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে যেকোনো চুক্তি কংগ্রেসের বিশেষ কমিটি যাচাই করে। যুক্তরাজ্যে সব ধরনের বৈদেশিক চুক্তি যাচাই করার জন্য বিশেষ পার্লামেন্টারি কমিটি রয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। মনে রাখতে হবে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। প্রতিটি চুক্তির সঙ্গে দেশের জনগণের স্বার্থ জড়িত। তাই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এ চুক্তি মূল্যায়ন এবং যাচাই করার অধিকার রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে অসম চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এ টাকা জনগণের করের। জনগণের টাকা এভাবে অপচয় করার এখতিয়ার কোনো সরকারের নেই। এটাও এক ধরনের লুণ্ঠন। এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আছে। শক্তিশালী সংসদ আছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ সার্বভৌম। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। এজন্য সরকারের যে কাজ করা প্রয়োজন-
১. অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সময়ে যে চুক্তি হয়েছে তা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে সব চুক্তি যাচাই করার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। কমিটি যদি মনে করে চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী, তাহলে তা বাতিলের সুপারিশ করবে। এ সুপারিশ জাতীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে। এ নিয়ে আলোচনা করে চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
২. অধিকাংশ চুক্তির সঙ্গে আর্থিক ও আইনগত দিক রয়েছে। অনেক চুক্তি আছে যেখানে চুক্তি বাতিল করলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্ত থাকে। এসব ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে একটি জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যে কমিশন চুক্তির আইনগত দিকগুলো পর্যালোচনা করবে। চুক্তির অসমঞ্জস দিকগুলো চিহ্নিত করবে। যেন চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা হলে আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।
৩. চুক্তিগুলো বাতিল বা সংশোধন করতে হবে কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে। যে দেশের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে। মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মতের মিল না-ও হতে পারে, কিন্তু তা সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর যেন প্রভাব না ফেলে তা লক্ষ রাখতে হবে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কথাবার্তা বলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছে আবার কোনো চুক্তিও বাতিল করেনি। ক্ষতি হয়েছে দেশের জনগণের। সে রকম দায়িত্বহীন আচরণ করা যাবে না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো বাতিল বা পরিমার্জনের জন্য কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে দ্রুত।
৪. সরকারকে আলোচনার পাশাপাশি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। চুক্তি বাতিল হলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অনেকে সালিশি আদালতে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে যেন বিপর্যয় না হয়, সেজন্য আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ল ফার্ম এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে আইনি জটিলতা সৃষ্টির আগেই।
সরকারের হাতে আলাদিনের চেরাগ নেই। বিদ্যুৎ সংকটের শর্টকাট কোনো সমাধান নেই। কিন্তু সরকারকে প্রমাণ করতে হবে তারা আন্তরিক। এজন্য এ খাতে অপচয় বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে টেকসই সমাধানের পথে যেতে হবে।