Image description

নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের নাম করে জুলাই সনদ ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে ৫১% ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছে, আর ৭০% জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে। এই ৫১%-কে গুরুত্ব দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে বিগত ১৭ বছরের মত উন্নয়নের কথা বলে পুনরায় মূল জায়গা থেকে জনগণকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কিনা— এমন প্রশ্নও রেখেছেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশনের জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে শফিকুল ইসলাম মাসুদ এসব কথা বলেন। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশের অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধানের সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মূলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

সংবিধান সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরতে একটি গল্প দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। বলেন, একবার রাজা তার উজিরকে কিছু কাজ দিলেন। উজির বলেছিল, আমাকে যে কাজগুলো বলেন, কোনটা কখন গুরুত্বপূর্ণ, একটা তালিকা করে দিলে ভাল হয়। তালিকা করে দেওয়া হয়েছিল। তালিকা দেখে দেখে সে কাজ শুরু করেছিল। হঠাৎ করে রাজার মনে হল সে শিকারে যাবে। ঘোড়ায় উঠতে গিয়ে রেকাবে তার পা আটকে গিয়েছিল। সেটা ছোটাতে পারছিল না। তখন সে উজিরকে বারবার ডাকছিল আমার পা টা এখান থেকে বের করে দাও। কিন্তু পাটা বের করতে যাচ্ছিল না উজির। কারণ উজির বারবার খুঁজছিল যে পা আটকে গেলে বের করে দেওয়ার কোনো বিধান ওখানে আছে কিনা। শেষ পর্যন্ত রাজার পা ওখান থেকে বের করা যায়নি বলে আমরা গল্পে জেনেছি।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ঠিক আজকের সংসদকে এরকম একটা গল্পের মত মনে হয়। আমরা যখন দেখেছি, বিগত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনকেই ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বিগত দেড় বছর আমরা লক্ষ্য করলাম— আমরা কেউ কেউ নির্বাচন এবং নির্বাচন করে করে বিচার এবং সংস্কারটা ভুলিয়ে দিয়েছিলাম। এখন আমরা দেখলাম আমাদের নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা আবার জুলাই সনদটাকে ভুলিয়ে দিতে বসেছি।

তিনি বলেন, আমি খুবই বিব্রত হই যে আমাদের সন্তানেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেদিন কি এটা লিখেছিল যে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য এখানে দাঁড়িয়েছি? সেদিন তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে। আমরা যেন সংস্কার কথাটা মাথায় নিতে পারছি না। আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন আমরা সংশোধনের দিকে যাচ্ছি। এই সংশোধনের জন্য আমাদের ছেলেরা, তরুণ-যুবকরা কাজ করেনি। এমেন্ডমেন্টের জন্য তো শেখ হাসিনাও অফার করেছিল, বলেছিল ২৪ ঘণ্টা দরজা খোলা আছে সংশোধনের জন্য আসো। তখন এই ছাত্র-জনতা মেনে নেয়নি, তারা সংস্কারের কথা বলেছিল।

ড. মাসুদ বলেন, আমি বাংলা সাহিত্যে অনার্স করা। বাংলার সাথে আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছিল। সেখানে একটা বাক্য আছে— নেসেসিটি নৌজ নো ল’জ। এই নেসেসিটিটাকে আজকে একটা সংবিধানের ধারাবাহিকতার মধ্যে আটকে ফেলেছি। আমরা লাইন খুঁজতেছি, দাঁড়ি-কমা, সেমিকোলন খুঁজতেছি! আমাদের সংস্কারের প্রস্তাবটা এজন্য এখানে উত্থাপন করা হয়েছে যে এটা ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে করার কথা ছিল, সেখানে খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষি কার্ডে গুরুত্ব দিলাম। আমরা আরও অনেক কাজে গুরুত্ব দিলাম। অথচ যেটার জন্য আজকে এখানে কথা বলার সুযোগ পেলাম সেই সংস্কারে কেন নজর দিতে পারলাম না?

তিনি বলেন, ৫১% ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছে, আর ৭০% তো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আমরা তাহলে ৫১%-কে গুরুত্ব দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে সেই ১৭ বছরের উন্নয়নের কথা বলে কি আমরা মূল জায়গা থেকে জনগণকে আবার আরেকটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাচ্ছি?

সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বলা হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা বলি সবাই মিলে বাংলাদেশ। আমি তো তা লক্ষ্য করছি না। আমাদের আশঙ্কা-উৎকণ্ঠার জায়গাটা ওইখানে, ১১টা সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ হয়েছে, সবাই মিলে যদি বাংলাদেশ হয়, তাহলে সরকারি দলের বাইরে একজন যোগ্য লোক কি ওখানে পাওয়া গেল না। ৪২টা জেলা পরিষদের প্রশাসক বদল হয়েছে। আজকে সংসদে যে কমিটি হয়, সেখানে আমরা বলি ন্যায্যতার ভিত্তিতে আপনাদের দুজন দেন। কিন্তু জেলা পরিষদে কি ন্যায্যতার ভিত্তিতে একজন জেলা পরিষদে কাউকে দিতে পারলাম না? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যখন এরকম এক-দুই জায়গায় এরকম প্রশাসক নিয়োগ হয়েছে, আমরা বললাম এটা সংবিধান লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক।

তিনি বলেন, আজকে যখন গণতন্ত্রের নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে একটা সরকার পেলাম, সেই সরকারে স্থানীয় নির্বাচনের দিকে না গিয়ে যেখানে সরকারের প্রশাসক ছিল, তাদেরকে তড়িঘড়ি করে বদল করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে নিজ দলীয় লোজ গ্রহণ করে আমরা কি বলতে পারি সবার আগে বাংলাদেশ? পারি না বিধায় আজকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং তার ভিত্তিতে আমাদেরকে এখানে শপথ গ্রহণ করানো হয়েছে। আজ আমাদেরকে এই ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে বলা হয়, এটাই নাকি অবৈধ করা হয়েছে। এই অবৈধ কাজ আমাদেরকে জাতীয় সংসদে প্লেস করেছে কে? যদি অবৈধ হয় তাহলে যারা প্লেস করেছে, তাদেরকেই তো আগে আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। এই অবৈধ কাজে আমাদেরকে কারা সহযোগিতা করেছেন? কারা প্ররোচিত করেছেন? এটা তো আমরা জোর করে কারো ঘরের থেকে নিয়ে আসি নাই। আমি তো বাউফল থেকে শপথের কাগজ নিয়ে আসিনি, এখান থেকে দেওয়া হয়েছে।