Image description

জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় তিন দিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

 

তবে শিক্ষাবিদরা বিষয়টিকে মিশ্রভাবে দেখছেন। তারা এটিকে যুক্তিসংগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আবার নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে বলছেন। আর কেউ কেউ এই পদ্ধতির উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ খরচ কমবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমও চালু রাখা সম্ভব হবে। তবে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

অনেক অভিভাবক বলছেন, দেশের সব এলাকায় এখনো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা নেই। ফলে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত হতে পারে। পুরান ঢাকার অভিভাবক জাহিদ তানভীর বলেন, সরাসরি ক্লাসে পড়াশোনার যে মান, সেটি অনলাইনে থাকে না। শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর ইন্টারেকশন অনলাইনে হয় না। স্বাভাবিকভাবেই একজন অভিভাবক হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। এই সিদ্ধান্ত কতটুকু কার্যকর হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে।

 

রাশেদুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, বাচ্চারা বাসায় থাকলে স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনা একটু কম হয়। স্কুলে থাকলে তারা একটা পড়াশোনার পরিবেশের মধ্যে থাকে। তবে যেহেতু দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটা তো মানতেই হবে।

 

অন্যদিকে শিক্ষাবিদরা বিষয়টিকে মিশ্রভাবে দেখছেন। তাদের মতে, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন ক্লাস একটি যুক্তিসংগত পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি কার্যকর করতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। ডিজিটাল বৈষম্য দূর না করলে এই ধরনের সিদ্ধান্ত সবার জন্য সমানভাবে উপকারী হবে না। শুধু অনলাইন ক্লাস চালু করলেই হবে না, বরং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যেমন আমরা যেটাকে বলি যে অনলাইনে ক্লাস নিলে সরাসরি ক্লাসের যে অ্যাটেন্ডেন্স, সেটা তো থাকে না। দ্বিতীয়ত, আমরা কোভিডের সময় দেখেছিলাম, অনলাইনে ক্লাস করে শিক্ষার্থীদের অনেক লার্নিং গ্যাপ ছিল। এই লার্নিং গ্যাপের কারণে প্রমোশনসহ অনেক বিষয়ে শিক্ষার্থীরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

তিনি বলেন, এখন আবার যদি আমরা অনলাইনে যাই, কোভিডের সময় কিন্তু একটা সুবিধা ছিল যে বাবা-মারাও লকডাউনে ছিলেন, বাড়িতে ছিলেন। তখন বাচ্চাদের হাতে ডিভাইস দিয়ে তাদের চলে যাওয়া লাগেনি, কাজে যাওয়া লাগেনি। এখন দেখা যাবে যে মা-বাবারা তো কাজে যাবেন, বাচ্চাদের বাসায় রেখে এই যে ডিভাইসগুলো ডাটাসহ দিয়ে যাবেন, এর একটা নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট তো আছেই। এ ছাড়া কয়টা ফ্যামিলিরই বা এই সামর্থ্য আছে? আমরা আগেও দেখেছিলাম যে অনেকের কিন্তু নেটওয়ার্ক থাকে না, সুযোগ-সুবিধা নেই কোনো কিছু।

 

তবে আরও ভালো বিকল্প খুঁজে বের করা দরকার ছিল মন্তব্য করে অধ্যাপক মুজিব বলেন, তিন দিন অনলাইন, তিন দিন অফলাইন—এভাবে না করে আরও বিকল্প বের করা যেত। সরকার ব্রেইন স্ট্রোমিং করে যদি এগুলো একমোডেট করত; মানে এককভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে যারা এক্সপার্ট আছে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে করত, তাহলে ভালো একটা সলিউশন আসত।