Image description

জাতীয় সংসদে আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, আজকে আপনারা সংবিধানকে ঠিক সেই জায়গাতেই মানছেন, যেখানে তা আপনাদের পক্ষে যাচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশনের জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে তিনি এসব কথা বলেন।

হাসনাত বলেন, কিছুক্ষণ আগে আমাদের সর্বশ্রদ্ধেয় মাননীয় সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ বক্তব্য প্রদানকালে উল্লেখ করেন যে, যারা সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চায়, তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে একাত্ম। তিনি এভাবে একটি ট্যাগ আরোপ করেছেন।

এ সময় ট্রেজারি বেঞ্চের সম্মানিত মন্ত্রীরাও টেবিল চাপড়ে সেই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছেন।

 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্ধৃতি টেনে এই সংসদ সদস্য বলেন, গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে যাওয়া বেগম জিয়া বলেছিলেন—যেদিন প্রকৃত জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন এই সংবিধান নতুনভাবে বিবেচিত হবে। অথচ ট্রেজারি বেঞ্চের অনেকেই দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গেই রাজনীতি করেছেন। আজ তারা সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে এক করে দেখার মাধ্যমে কি বেগম জিয়াকেই পরোক্ষভাবে অসম্মান করছেন না—তা তাদের ভেবে দেখা উচিত।

 

তিনি আরো বলেন, আমি মূলত ভিন্ন কিছু বিষয়ের ওপর বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু মাননীয় সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্ত প্রতিউত্তর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

হাসনাত বলেন, তিনি (আন্দালিব) বলেছেন, সংবিধানের ‘কিছু কিছু বিষয়’ তারা সম্মান করেন। এর অর্থ দাঁড়ায়—কিছু বিষয় তারা সম্মান করেন না।

অর্থাৎ, সুবিধাজনক অংশ গ্রহণ এবং অসুবিধাজনক অংশ বর্জন—এমন একটি নির্বাচনী অবস্থান তারা গ্রহণ করেছেন। এই ধরনের অবস্থানকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? কখনো কনফর্মিস্ট, কখনো রিফর্মিস্ট—আসলে এটি একটি অপরচুনিস্টিক (সুবিধাবাদী) অবস্থান। সংবিধানের কিছু ধারা মানব, কিছু ধারা মানব না—এভাবে চললে কেউ একসঙ্গে সাংবিধানিক এবং অসাংবিধানিক হতে পারে না।

 

হাসনাত বলেন, এখানে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’-এর প্রশ্নও আসে। বিদ্যমান সংবিধানের ৭এ ও ৭বি অনুচ্ছেদ বলবৎ থাকা অবস্থায় মৌলিক কাঠামোতে আপস করার সুযোগ নেই।

একইভাবে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ এবং ১০৬ অনুচ্ছেদের অ্যাডভাইজরি জুরিসডিকশনের মাধ্যমেও সংবিধানের মৌলিক নীতিতে কোনো আপস করা যায় না।

 

তিনি আরো বলেন, যদি আমরা এই সংবিধানকে সম্পূর্ণরূপে মেনে চলতে চাই, তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ৬ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়ায় কারা উপস্থিত ছিলেন, কিভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া উচিত। ৬ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বেগম জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়। যদি আমরা সংবিধানকে একেবারে ধর্মগ্রন্থের মতো অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতাম, তাহলে সেই মুক্তি সম্ভব হতো না। এটি সম্ভব হয়েছে জনতার রায়ের ভিত্তিতে।

এনসিপির এই নেতা বলেন, আজকে আপনারা সংবিধানকে ঠিক সেই জায়গাতেই মানছেন, যেখানে তা আপনাদের পক্ষে যাচ্ছে। কিন্তু গ্রামবাংলায় একটি কথা আছে—গঙ্গা পার হলে মাঝিকে আর কেউ মনে রাখে না। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বহু নেতাকর্মী ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, জীবিকার জন্য রিকশা চালাতে বাধ্য হয়েছেন। অসংখ্য মানুষের রক্ত, ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে একটি শাসনব্যবস্থার পতন হয়েছে। এটি কোনো একক দলের অবদান নয়—ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত সংগ্রামের ফল। সবশেষে বলতে চাই, দেশের জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস। তারা ইতিমধ্যে সংবিধানের কোন কোন মৌলিক কাঠামোয় সংস্কার প্রয়োজন—সে বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। কাজেই এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।