এক-এগারো সরকারের অন্যতম ‘কুশীলব’ সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন গুম, খুন ও সেই সময় তৈরি করা আয়নাঘরের বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন। গুম-খুনের ঘটনায় তারা কোনো দায় নিচ্ছেন না। তবে এসবের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে দাবি করেছেন। যদিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্তুতি গেয়েছেন তারা। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে এসব তথ্য দিচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এসব বিষয়ে গতকাল দুপুরে জানতে চাওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা প্রধান শফিকুল ইসলামের কাছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে একজন রিমান্ডে রয়েছে। অন্যজনকে ফের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। আদালত থেকে রিমান্ড পেলে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত থাকবে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তারা অকপটে কোনো তথ্য দিচ্ছেন না। তারা বিভিন্নভাবে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলছেন। তাদের দেওয়া কিছু কিছু তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’
মামুন খালেদের রিমান্ড বাকি আছে আরও দুদিন। আর মাসুদ উদ্দিনের রিমান্ড শেষ হলে আরও ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাদের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলমান। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাদ্বয়কে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও করছেন তারা। সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকার গঠন, ক্ষমতাসীন দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক দরকষাকষিসহ নানা প্রশ্ন করা হলেও কোনো আশানুরূপ উত্তর মেলেনি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।
সূত্র বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ প্রধান দুদলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কেন গ্রেপ্তার করা হয়, এই গ্রেপ্তারে কোনো দেশের সবুজ সংকেত ছিল কি না, গ্রেপ্তার অভিযান শুরুর আগে কখন, কোথায় নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়, ওই বৈঠকে কারা ছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, তিনি আদেশ পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন মাত্র।
মাসুদের কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল, গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গ্রেপ্তারের আগে আপনি অনুমোদন দিতেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। এ প্রশ্নের জবাবে অনুমোদনের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর ধরে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিত। এক-এগারোর সময়কালে জরুরি অবস্থা জারির পর গঠিত দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের সমন্বয় এবং দুর্নীতি দমনের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি সারা জীবন সৎপথে উপার্জন করে জীবন নির্বাহ করেছি।’ তবে তার এ বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এদিকে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা এবং শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৭ এপ্রিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে হাজির করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ মামুন খালেদ এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর’ এবং ‘দুষ্কৃতকারী’। তাদের অতীতের বহু কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।