মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার ছলে ‘গোপনে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা’ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তবে মার্কিন স্থল বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। তারা আগ্রাসন চালালে ‘হাঙরের খাদ্যে’ পরিণত হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এদিকে রোববার হামলার ৩০তম দিনে ইরান ও হিজবুল্লাহ একযোগে ইসরাইলে হামলা চালিয়েছে। এ সময় ইসরাইলের ১০০টিরও বেশি শহরে সতর্ক সংকতে বেজে উঠে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ২৪ ঘণ্টায় দফায় দফায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। খবর বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, আলজাজিরার।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা চালানোর সময় ইরান থেকেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। ফলে একসঙ্গে ইসরাইলের ১০০টিরও বেশি শহরে সতর্ক সংকেত বেজে উঠে। এসব হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে হাইফা উপকূলে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে ইসরাইলের বিরশেবায় নিওত হোভাব শিল্পাঞ্চলে ইরানের হামলায় বিপজ্জনক রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। তাই এর কাছাকাছি বসবাসকারী বাসিন্দাদের বাড়ির ভেতরে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নিওত হোভাব শিল্পাঞ্চল এলাকাটি ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বিরশেবা থেকে মাত্র ৪ মাইল দূরে অবস্থিত। জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, এই হামলায় এখন পর্যন্ত এক ব্যক্তির আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
শনিবার সন্ধ্যায় তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের একটি আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন সংবাদকর্মী জানান, স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে চালানো হামলায় কেউ নিহত না হলেও নয়জন আহত হয়েছেন। এতে ২০টির বেশি অ্যাপার্টমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের ওসমাভানদান গ্রামের একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। হামলায় ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এই হামলায় পাঁচটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। রোববার ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে-ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত ২১৬ শিশুসহ মোট ২ হাজার ৭৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজার মানুষ। আহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭৬৭টি শিশু। এছাড়া হামলায় ৩৩৬টি স্বাস্থ্য ও জরুরি সেবাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত লেবানিজ সাংবাদিকদের স্মরণে এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ নতুন ধাপের অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, এ পর্যায়ে ৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ‘সানডে ডন বা রোববার ভোর’ নামের এই বহুমুখী অভিযানে ইরাকের ভিক্টোরিয়া, কুয়েতের আরিফজান এবং সৌদি আরবের আল খার্জের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর ‘আকাশপথ ও ড্রোন পরিচালনার অবকাঠামো এবং অস্ত্রভান্ডারে’ হামলা করাই এই অভিযানের লক্ষ্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়-আরদ, নেগেভ, তেল আবিব, এরবিল এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর এবং আবুধাবির আল ধাফরাসহ বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর ‘গোপন আস্তানা’ লক্ষ্য করে এ অভিযানে হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ২৪ ঘণ্টায় দফায় দফায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শনিবার সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। আবুধাবিতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম’ (ইজিএ) জানিয়েছে, তাদের প্রধান কারখানায় ভয়াবহ হামলা হয়েছে। এতে স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। একই সময়ে হামলার শিকার হয়েছে বাহরাইনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইন’। সেখানেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতেও বড় হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে চালানো এ হামলাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শনিবার ওমানের দক্ষিণে সালালাহ বন্দরে দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। এই হামলায় একজন বিদেশি কর্মী আহত হয়েছেন। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। এরই মধ্যে হামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। এদিকে সৌদি আরবের আকাশসীমায় কয়েক ঘণ্টায় ১০টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে বলে রোববার সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে।
গোপনে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র : ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, মার্কিন স্থল বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত ‘গোপনে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা’ করছেন। গালিবাফ বলেন, ‘শত্রুরা প্রকাশ্যে আলোচনার বার্তা পাঠাচ্ছে আর গোপনে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে। আমাদের বীর যোদ্ধারা মার্কিন সেনাদের মাটিতে নামার জন্য অপেক্ষা করছে, যাতে তাদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া যায়।’
এদিকে ইরানের ইংরেজি দৈনিক তেহরান টাইমসে রোববার প্রকাশিত প্রথম পাতায় ‘ওয়েলকাম টু হেল’ বা ‘জাহান্নামে স্বাগতম’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো মার্কিন সেনা যদি ইরানের মাটিতে পা রাখে, তবে তারা কেবল ‘কফিনবন্দি হয়েই ফিরবে।’ এছাড়া ইরানে কোনো ধরনের স্থল অভিযান বা ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করলে মার্কিন সেনাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং তারা পারস্য উপসাগরের ‘হাঙরের খাদ্যে’ পরিণত হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। রোববার ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই হুঁশিয়ারি দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযান এবং পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলো দখলের হুমকির প্রেক্ষিতে জোলফাগারি বলেন, এ ধরনের পরিকল্পনা অবাস্তব। তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইরের চাপে প্রভাবিত হয়ে অসংলগ্ন ও অবিশ্বাস্য অবস্থান নিচ্ছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, স্থল অভিযানের যে কোনো পদক্ষেপ মার্কিন বাহিনীর জন্য চরম অপমানজনক ও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
জোলফাগারি দাবি করেন, মার্কিন নেতৃত্ব এমন এক ব্যক্তির হাতে সামরিক কমান্ড তুলে দিয়েছে যার সিদ্ধান্তগুলো মার্কিন বাহিনীকে একটি ‘মৃত্যুফাঁদে’ ফেলেছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মার্কিন সেনারা ইতোমধ্যে গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘাঁটিগুলো থেকে পালিয়ে মার্কিন সেনারা এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর বেসামরিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। তবে তারা সেখানেও নিরাপদ নয়। স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে জোলফাগারি বলেন, ইরানি বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং তারা জবাব দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, আগ্রাসন বা দখল চেষ্টা চালালে আক্রমণকারীদের বন্দি করা হবে, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে। তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত মার্কিন কমান্ডার ও সৈন্যরা ‘পারস্য উপসাগরের হাঙরের খাদ্যে’ পরিণত হবে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের নতুন পদক্ষেপের অংশ হিসাবে শনিবার হাজার হাজার মার্কিন নৌ ও মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত করলেও সেনারা সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় অবস্থান করবে তা স্পষ্ট করেনি। সেন্টকম আরও জানায়, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি তার ‘দায়িত্বের এলাকায়’ পৌঁছেছে। অবশ্য যুদ্ধজাহাজের নির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পেন্টাগনের পক্ষ থেকে ইরানে কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থল অভিযান পরিচালনার জোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি পূর্ণাঙ্গ কোনো যুদ্ধ হবে না, বরং বিশেষ বাহিনী আর নিয়মিত সেনাদের ছোট ছোট অভিযানে জোর দেওয়া হবে।
যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় চার দেশের বৈঠক শুরু : ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনায় বসেছেন পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দুই দিনের এই আলোচনায় তারা ইরান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করবেন। এ বৈঠকে যোগ দিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা প্রস্তাব ইরানের কাছে পাঠিয়েছে। ইরানও তার অবস্থান তুলে ধরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
নাগালে এলেই রণতরি আব্রাহাম লিংকনে হামলা : মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় বা নাগালে আসামাত্রই সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। রোববার ইরানের নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একথা বলেন। শাহরাম ইরানি জানান, ৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের রণতরি ‘আইআরআইএস দেনা’ ডুবে শহীদ নৌ সেনাদের রক্তের বদলা নিতেই এই পালটা হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আমাদের ফায়ারিং রেঞ্জে আসামাত্রই আমরা বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে এর চরম প্রতিশোধ নেওয়া হবে।’