Image description
মেরিন ড্রাইভ ও কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়ক

“ওদের একে একে নিয়ে গেছে… আমরা শুধু অপেক্ষা করেছি—কেউ ফিরে আসবে বলে। কিন্তু প্রতিবারই খবর এসেছে, ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছেন।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো যখন বলছিলেন, তখন কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে হাবিবা ইয়াসমিনের। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার মধ্যেই বলছিলেন, “যেদিন আব্বুকে ধরে নিয়ে যায়, ওইদিন ছিল ১২ রমজান। সেহরি খাওয়ার আগে নামাজ পড়বেন; তাই ঘুম থেকে উঠেই অজু করছিলেন। ওই অবস্থায়ই তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। আব্বু অনেক অনুনয়বিনয় করে বলছিলেন, ‘আমারে ইফতার পর্যন্ত রাখো তোমরা। ইফতারের পর মারিও।’ কিন্তু ওরা তা করে নাই। ভোরের আলো ফোটার আগেই অনেক মানুষের সামনে বুকের মধ্যে গুলি করে আমার আব্বুকে মেরে ফেলছে। এতিম করে দিছে আমাদের।”

হত্যার শিকার বাবা-চাচাদের স্মৃতিচারণের মধ্যে গুমরে কান্নায় বারবার কথা আটকে যাচ্ছিল তরুণীটির। একে একে পরিবারের ছয় সদস্যের কেবলই স্মৃতি হয়ে যাওয়ার গল্পটা আর শেষ করতে পারছিলেন না সদ্য ডিগ্রি পাস করা হাবিবা।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ—দিনে সমুদ্র আর পাহাড়ের সৌন্দর্যে ঘেরা এক সড়ক; কিন্তু রাত নামলেই সেটি পরিণত হয় এক ভিন্ন ভূগোলে। গভীর অন্ধকার, ফাঁকা পথ, দূরে সমুদ্রের গর্জন, তারপর হঠাৎ গুলির শব্দ। একবার, দুবার, তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে। কিছুক্ষণ পর সব আবার স্তব্ধ-অস্বাভাবিক, ভারি এক নীরবতা। যেন কিছুই ঘটেনি। রাত পোহালেই রাস্তার ধারে পড়ে থাকে নিথর দেহ, পাশে অস্ত্র বা মাদকের প্যাকেট, যা সরকারি ভাষ্যে—‘বন্দুকযুদ্ধ’।

কালবেলার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ৯ বছরে কক্সবাজার জেলায় অন্তত ৯৮টি ‘ক্রসফায়ার’-এর ঘটনায় ১৩৬ জন নিহত হয়েছেন। যেগুলোর মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ঘটেছে টেকনাফের এই মেরিন ড্রাইভ ও কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়কে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার বর্ণনায় রয়েছে একই কাঠামো-গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান, গুলিবিনিময়, মৃত্যু।

কিন্তু নিহতদের পরিবারের দাবি, বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, অনেককেই আগে আটক করা হয়েছে, তারপর অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই স্থান, একই বয়ান, আর ধারাবাহিক মৃত্যুর এ পরিসংখ্যান এখন বড় এক প্রশ্ন সামনে আনে—কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক সড়ক এবং মেরিন ড্রাইভ কি শুধু একটি সড়ক, নাকি সত্যিই এক ‘হাইওয়ে অব কিলিংস’ (Highway of killings), যেখানে রাত মানেই ছিল অনিশ্চিত গন্তব্য?

তথ্য-উপাত্তের স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর চিত্র। কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে কক্সবাজারের টেকনাফে, যা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে অদৃশ্য এক মৃত্যুযজ্ঞের কেন্দ্রে। কালবেলার অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা গেছে, পুরো কক্সবাজার জেলায় অন্তত ৯৮টি কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৩৬ জনের। এসব ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

ক্রসফায়ারের নামে হত্যার এ পরিসংখ্যানের কেন্দ্রে রয়েছে টেকনাফ—একটি সীমান্তবর্তী জনপদ, যা পরিণত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি ‘ক্রসফায়ার’ বয়ানের হটস্পটে। শুধু এ উপজেলাতেই নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৫ জন। অনুসন্ধানে চিহ্নিত হয়েছে পাঁচটি নির্দিষ্ট এলাকা, যেখানে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘন ঘন ঘটেছে। সেগুলো হলো, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাহাড়ি জঙ্গল, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশের নির্জন অঞ্চল, নাফ নদের তীরবর্তী মাছের প্রজেক্ট এলাকা এবং মহেশখালীর কালারমারছড়া। এর প্রতিটি স্থানই ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন, নজরদারির বাইরে এবং ‘অপারেশন’ পরিচালনার জন্য সুবিধাজনক, যা এই মৃত্যুর ধারাবাহিকতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০১৮ সালে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের সময় এ ‘ক্রসফায়ার’ প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নেয়। সে বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সারা দেশে দুইশর বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তবে আলোচিত এক ঘটনায় এ হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে ওই বছরের ২৬ মে, যখন টেকনাফ পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর আগে পরিবারের সঙ্গে হওয়া ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যায়। ওই অডিওতে শোনা যায় গুলির শব্দ, আতঙ্কিত কণ্ঠ, যা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বয়ানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এক বাস্তবতা তুলে ধরে। মুহূর্তেই তা জনমনে গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়; মানবাধিকারকর্মীরা সরব হয়ে ওঠেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশ্ন উঠে ‘ক্রসফায়ার’ কাণ্ড নিয়ে।

এরপর সাময়িকভাবে থেমে যায় এমন অভিযান। কিন্তু ২০২০ সালের ৩১ জুলাই, টেকনাফের মেরিন ড্রাইভে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হলে আবারও সামনে আসে একই প্রশ্ন—আইনের শাসন, নাকি নির্বিচার ক্ষমতার প্রয়োগ? ওই ঘটনায় টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও এসআই লিয়াকতসহ একাধিক পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হন, যা এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর সরকারের তরফ থেকে দেওয়া অস্বীকারের বয়ানকে ভেঙে দেয়।

অনুসন্ধানের স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক দীর্ঘস্থায়ী ও সুসংগঠিত সহিংসতার চিত্র। কক্সবাজার জেলার ছয়টি উপজেলায় গত ৯ বছরে অন্তত ৯৮টি পৃথক ঘটনায় ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেখিয়ে প্রাণ হরণ করা হয়েছে কমপক্ষে ১৩৬ জনের। নথিপত্র, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ধারাবাহিক অভিযোগ পর্যালোচনা করে যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা সরকারি বয়ানের সঙ্গে গভীর অসামঞ্জস্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

নিহতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ক্ষেত্রে আগে কোনো দৃশ্যমান অপরাধমূলক রেকর্ড পাওয়া যায়নি, যা এসব অভিযানের বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একাধিক ঘটনায় মিলেছে অভিন্ন প্যাটার্ন: রাতের অন্ধকার, নির্জন বা বিচ্ছিন্ন স্থান, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ একইরকম বিবরণ এবং পরবর্তী সময়ে একই ধরনের সরকারি ভাষ্য।

সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন নিহতদের পরিবারগুলো। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়। অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি সীমিত, আর দায়বদ্ধতার প্রশ্নে স্পষ্ট কোনো জবাব মেলেনি। ফলে তাদের কাছে ‘ক্রসফায়ার’ কেবল একটি শব্দ নয়, বরং প্রিয়জন হারানোর অমোচনীয় এক দাগ, যার বিচার আজও অধরা।

কক্সবাজারজুড়ে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-পরবর্তী বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘটনার গল্প ঘুরেফিরে আটকে থাকে একই চার ধাপে: ‘অভিযান, গুলি, পাল্টা গুলি, মৃত্যু’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিগুলোতে ভাষা, বিন্যাস এমনকি ঘটনার ক্রম পর্যন্ত বিস্ময়করভাবে অভিন্ন। সাধারণত বলা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়; অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে সন্দেহভাজনরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে; আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হলে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শুরু হয়; একপর্যায়ে গুলিবিনিময় থামলে দেখা যায়, একজন বা একাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রায় প্রতিটি বয়ানে যোগ হয় আরও একটি স্থির উপাদান—ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গুলি, মাদক বা অবৈধ সামগ্রী উদ্ধারের দাবি এবং নিহত ব্যক্তিকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’, ‘মাদক কারবারি’ কিংবা ‘ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত করা।

কিন্তু এ একরৈখিক বয়ানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ধারাবাহিক অভিযোগ, যা অনেক ক্ষেত্রে মিলে যায় ঘটনাপূর্ব নিখোঁজ বা আটক হওয়ার তথ্যের সঙ্গে। অনুসন্ধানে এমন একাধিক ঘটনায় প্রমাণ মিলেছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগেই তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি, অথচ পরদিন বা কিছুদিন পর তাকে ‘ক্রসফায়ারে নিহত’ দেখানো হয়েছে।

এমনই একটি ঘটনার কেন্দ্রে টেকনাফের মাছ ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ। পরিবারের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক শীতল, সুসংগঠিত নির্মমতার চিত্র। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ তাকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ৪০ লাখ টাকা। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় গহনা বিক্রি করে, ধারদেনা করে ৫ লাখ টাকা জোগাড় করে দেন স্ত্রী। কিন্তু সেই অর্থও তার স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি।

পরদিনই ‘বন্দুকযুদ্ধের’ গল্প তৈরি হয়। অথচ নূর মোহাম্মদের স্ত্রীর ভাষ্যে উঠে আসে সেই রাতের ভিন্ন এক বর্ণনা—যেখানে তাকেও আটক রেখে একটি নির্জন স্থানে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তিনি কালবেলাকে বলেন, তাকে গাড়িতে তুলে রাজেরছড়া এলাকার একটি সুপারি বাগানের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়; সেখানে অস্ত্রের মুখে আটকে রাখা অবস্থায় শুনতে পান স্বামীর ওপর নির্যাতন এবং পরে গুলির শব্দ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বামীকে হত্যা করার পরও শেষ হয়নি চাপ—দিনের বেলায় দাফন করা যাবে না, মাইকিং করা যাবে না—এমন নির্দেশ দিয়ে রাতের আঁধারেই দাফন করতে বাধ্য করা হয় পরিবারকে। ‘আমি বলছিলাম, মারধর করলা, কোর্টে চালান দাও—দশ বছর পর হলেও ফিরে আসবে। কিন্তু তারা শোনেনি’—কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নূর মোহাম্মদের স্ত্রী। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও দুই সন্তান নিয়ে যার সংগ্রাম এখনো থামেনি, থামেনি বিচারপ্রার্থনার অপেক্ষাও।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বামীকে আটকের পর থানায় গেলে তার কাছে ৪০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। সেই দাবি পূরণে অক্ষম হয়ে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পরও রেহাই মেলেনি। তার বক্তব্যে উঠে আসে টেকনাফ থানা পুলিশের তৎকালীন কিছু সদস্যের নামও, যাদের বিরুদ্ধে তিনি অর্থ গ্রহণ ও হত্যার অভিযোগ তুলেছেন।

পরবর্তী সময়ে বহুল আলোচিত সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলে সাহস করে মামলা করেন নূর মোহাম্মদের স্ত্রী। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া এগোয়নি প্রত্যাশিতভাবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ঘুরেও কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। শেষ পর্যন্ত তার আশ্রয় এখন শুধু বিশ্বাসে—‘আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিছি।’

লুটপাটের পর তুলে নিয়ে হত্যা, এক ইউপি সদস্যের শেষ যাত্রা: কক্সবাজারের উখিয়ায় সংঘটিত একটি ঘটনা অনুসন্ধানের পুরো চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে, কীভাবে একই প্যাটার্নে একটি ‘অভিযান’ ধীরে ধীরে রূপ নেয় লুটপাট, আটক এবং শেষ পর্যন্ত কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যুর বয়ানে।

২০২০ সালের ২৩ জুলাই, উখিয়ার ইউপি সদস্য বখতিয়ার উদ্দিনকে নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যান উখিয়া থানার তৎকালীন ওসি মর্জিনা আক্তার এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে নেওয়ার সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, একজন আসামিকে শনাক্ত করতে সহযোগিতা প্রয়োজন। অথচ পুলিশি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই সময় পর্যন্ত বখতিয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড, এমনকি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত ছিল না।

কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি ঘটনাপ্রবাহ। পরিবারের অভিযোগ, বখতিয়ারকে তুলে নেওয়ার কিছু সময় পরই ফের অভিযান চালিয়ে তার বাসায় প্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও সম্পদ নিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দাবি করা হয়, অন্তত ৫১ লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ, এমনকি ভাঙতি পয়সাও ব্যাগে ভরে নিয়ে যান ওসি মর্জিনা। পাশাপাশি জমির গুরুত্বপূর্ণ দলিলও জব্দ করা হয়, যার অধিকাংশেরই কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব পরে আর পাওয়া যায়নি। পরদিনই সেই পরিচিত বয়ান—‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত’।

বখতিয়ার উদ্দিনের ছেলে হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য এ বয়ানের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী শনাক্ত করার কথা বলে আমার বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না, থানায় একটি জিডিও না।’ তার অভিযোগ, অর্থের লোভেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে আসে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায়। হেলাল উদ্দিন জানান, তার বাবাকে তুলে নেওয়ার আগের দিন এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ পরদিন পরপর তিনটি মামলা করা হয়, যেখানে আসামি করা হয় তাকে ও তার দুই ভাইকে। পরিবারের দাবি, ৫১ লাখ টাকার বেশি অর্থ ও জমির দলিল নিয়ে গেলেও মামলার নথিতে জব্দ দেখানো হয়েছে মাত্র ১০ লাখ টাকা; বাকি অর্থ ও দলিলের কোনো হিসাব তারা আজও পাননি। ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছেন বখতিয়ার উদ্দিনের স্ত্রী শাহীনা আক্তার। তার কথায় উঠে আসে ঘটনার দ্রুততা এবং পরিকল্পিততার ইঙ্গিত। “পুলিশ বাসায় এসে বলল, ‘টেনশন করবেন না, একজন আসামিকে চিহ্নিত করতে নিয়ে যাচ্ছি।’ পুরো ঘটনাটা ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে ঘটে, যা সিসিটিভি ক্যামেরায় রেকর্ড আছে।”

তিনি আরও জানান, একই দিন সন্ধ্যায় আবার বাসায় এসে চালানো হয় তল্লাশির নামে তাণ্ডব—সেসময় নগদ অর্থ ও জমির দলিল নিয়ে যাওয়া হয়।

একই পরিবারের ছয়জনকে হত্যা, পুলিশ হত্যা করে তিনিজনকে: ২০২০ সালের ৬ মে টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় একই পরিবারের তিনজনকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে টেকনাফ থানা পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্থানীয় শত শত নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সবার সামনে প্রকাশ্যে ফজরের সময়ে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। পুরো গ্রামবাসী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সে হত্যার দৃশ্য। পরিবারের সদস্যদের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

জানতে চাইলে নিহত নুরুল আলমের ভাই শাহ আলম কালবেলাকে বলেন, ‘২০১৩ সালে বিএনপির মিছিলে যাওয়ার সময় আমার দুই ভাইকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হত্যা করে। এরপর ২০১৫ সালে তৎকালীন থানা পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিলে আমার ছোটবোন সানজিদার স্বামীকে বাসা থেকে তুলে এনে হত্যা করে। এরপর ২০২০ সালের ৬ মে টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় আবার আমার পরিবারের ৩ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফজরের নামাজের পর ওসি প্রদীপ আর আওয়ামী লীগের কিছু সন্ত্রাসী আমার বড় ভাই নুরুল আলম ও সৈয়দ আলমকে তুলে নিয়ে যায়। ভাগিনা আবদুল মোনামকেও তুলে নিয়ে যায়। পরে প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো তাদের নিয়ে এখানে ওখানে দৌড়াদৌড়ি করে। একপর্যায়ে আমার ছোট ভাবির কাছে চাঁদাও দাবি করে। চাঁদা দিতে আমরা অস্বীকার করি। পরে আমরা মামলায় যাদের আসামি করেছি, তাদের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়ে প্রথমে ভাই সৈয়দ আলমের হাত কেটে ফেলা হয়। এরপর একে একে ৩ জনকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এরপর উল্টো আমাদের নামে ৩টি মামলা দেয়—একটি অস্ত্র মামলা, একটি মাদক মামলা ও একটি হত্যা মামলা। তিনটি মামলাই এখনো চলমান। কোর্টে যাচ্ছি-আসছি, যাচ্ছি-আসছি।’

মেজর সিনহা হত্যকাণ্ডের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মনে কিছুটা সাহস ফেরে বলে জানান শাহ আলম। তিনি বলেন, ‘ওসি প্রদীপ মেজর সিনহাকে হত্যা করার পর তাকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন সরকার যখন বলেছে, তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে—এই কথা শুনে আমরা তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করি। এরপর পিবিআই এখানে ৪ বার তদন্ত করতে আসে। তারা তদন্ত করে চলে যায়; কিন্তু কোর্টে কখনো রিপোর্ট দেখি না। আমার ভাইদের হত্যা করা হয়েছে আজ ৬ বছর। একটি মামলা তদন্ত করতে কত বছর লাগে?’

হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহ আলম বলেন, ‘আমাদের একটাই দোষ- আমরা আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগের সামনে বিএনপির হয়ে মিটিং-মিছিল করেছি। সেই ক্ষোভে প্রশাসন আর আওয়ামী লীগ একত্র হয়ে আমার পরিবারটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ৬ ভাইয়ের মধ্যে ৩ ভাইকে মেরে ফেলেছে, আপন বোনজামাইকে মেরেছে, আপন চাচাতো ভাইকে মেরেছে। ভাগিনাসহ ৬ জনকে হত্যা করেছে। একটার বিচারও এখন পর্যন্ত পাইনি। ২০১৩ সালে যে দুই ভাইকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের দলের জন্য শহীদ স্বীকৃতি দিয়ে প্রতি বছর বিএনপি চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিঠি পাই। তাদের মাগফিরাত ও ফাতিহা আয়োজনের জন্য কিছু অনুদানও পাই।’

নিহত নুরুল আলমের মেয়ে হাবিবা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার বাবা আনসার ভিডিপির সদস্য ছিলেন। তিনি অসুস্থ থাকায় ছুটিতে এসেছিলেন। এ সময় তাকে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

ঘটনার দিনের চিত্র তুলে ধরে হাবিবা বলেন, ‘২০২০ সালের রমজানে আমার আব্বু সেহরি খাওয়ার পর ওজু করছিলেন। শত্রুরা ওসি প্রদীপকে নিয়ে এসে আমার আব্বুকে ধরে নিয়ে যায়। পরে আমার আব্বু আর চাচ্চুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমার আব্বু ছিলেন আনসার ভিডিপির সদস্য। আর চাচ্চু প্রবাসী ছিলেন। শত্রুতা করে, টাকা খেয়ে আমার আব্বু আর চাচ্চুকে মেরে ফেলেছে। পুলিশের সঙ্গে গিয়াস নামে একজন ছিল—তাদের ‘গিয়াস বাহিনী’ বলা হয়। ওরা আওয়ামী লীগের লোক ছিল। ওসি প্রদীপের সঙ্গে অনেক পুলিশ ছিল, তবে পুলিশের সঙ্গে থাকা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরাই বেশি মারধর করেছে। আমার চাচ্চুর হাত কেটে ফেলা হয়।’

তার বাবা সাতপাঁচ কোনো কিছুতে জড়িত ছিলেন না জানিয়ে হাবিবা বলেন, ‘আমার আব্বু ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, ওয়াজ শুনতেন—এগুলো নিয়েই থাকতেন। কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আব্বুকে যখন নিয়ে যাওয়া হয়, আমি নিজে দেখেছি। পাহাড়ের ওদিকে নিয়ে গিয়ে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়। আমার আব্বু খুব ভালো মানুষ ছিলেন­—সবাই তাকে ‘ফকির সাব’ বলে ডাকত। আমার তো ইচ্ছে করে, আমার আব্বুকে কবর থেকে তুলে নিয়ে আসি। আমার আব্বুর কোনো অপরাধ ছিল না। আমার আব্বুর শেষ ইচ্ছা ছিল- ইফতারের পর মারা যাওয়ার। সেই ইচ্ছাটাও তারা পূরণ করেনি।’

১৭ বছরের কিশোরকেও হত্যা: ১৭ বছরের কিশোর সৈয়দ হোছন ওরফে আবদুল মোনাম। দুই মামা নুরুল আলম ও সৈয়দ আলমের সঙ্গে তাকেও তুলে নিয়ে যায় টেকনাফ থানা পুলিশ। এরপর একই সঙ্গে মাদক কারবারি সাজিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশের নথিতে সৈয়দ হোছন ওরফে আব্দুল মোনামের বয়স দেখানো হয়েছে ২২ বছর। তবে কালবেলার হাতে মোনামের জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেটের কপি রয়েছে, যেখানে তার জন্ম তারিখ ২০০২ সালের ৭ জুলাই। সে হিসাবে হত্যার সময় মোনামের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর ৯ মাস ৩০ দিন।

তবে এই ঘটনা শুধু ইউপি সদস্য বখতিয়ার উদ্দিন, মাছ ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ, নুরুল আলম কিংবা কিশোর সৈয়দ হোছনেই সীমাবদ্ধ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এমন অন্তত ১৯৬ জনকে হত্যার তথ্য ও প্রমাণ মিলেছে কালবেলার অনুসন্ধানে। তথ্য বলছে, শুধু কক্সবাজারে ২০১৫ সালের পরে ৯৮টি পৃথক ঘটনায় ১৩৬ জনকে হত্যা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালেই নিহত হন ১২৭ জন, সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে টেকনাফ উপজেলায়।

১১ দিনের বাচ্চাকে দেখতে যাওয়াই কাল হয় দিল মোহাম্মদের: ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল সদ্যজাত ১১ দিনের সন্তানকে দেখে বাড়ি ফিরছিলেন টেকনাফের বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ। সাবরাং রোডের থানার ডেইল এলাকার কাছে, হাবিরপাড়া নামে একটি জায়গায় পৌঁছালে তাকে ধরে নিয়ে যায় টেকনাফ থানা পুলিশ। সেখানে চার দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ৫০ লাখ টাকা। পরিবার বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করে তৎকালীন থানা পুলিশকে ১৫ লাখ টাকা দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ২৩ এপ্রিল শবেবরাতের রাতে মেরিন ড্রাইভে নিয়ে গুলি করে মঞ্চায়ন করা হয় ক্রসফায়ারের নাটক।

জানতে চাইলে দিল মোহাম্মদের ভাই মো. শাকের কালবেলাকে বলেন, ‘কি বলব ভাই, বলার তো কোনো ভাষা নেই। আমাদের টেকনাফে একটা ভয়াবহ সময় গেছে—২০০-এর বেশি মানুষকে মারা হয়েছে। আমার ভাই তখন তার শ্বশুরবাড়ি সাবরাং ইউনিয়নের আলীর ডেইল গ্রামে গিয়েছিল। তার সন্তানের বয়স তখন মাত্র ১১ দিন। বাচ্চাকে দেখতে গিয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার সময় সাবরাং রোডের থানার ডেইল এলাকার কাছে হাবিরপাড়া থেকে ধরে নিয়ে যায়। কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে ফেলে। এরপর তাকে তখনকার এমপি ও আওয়ামী লীগের এক চেয়ারম্যানের কাছে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তখনকার আওয়ামী লীগের এমপি আমার ভাইকে মেরে ফেলার নির্দেশ দেন।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমার মা চার দিন টেকনাফ থানার সামনে ছিল, শুধু একবার ছেলেকে দেখার জন্য। শবে বরাতের রাত ছিল সেদিন। মা নিজের হাতে রান্না করা খাবার নিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু খাওয়াতে পারেনি। পুলিশ আমার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি। চার দিন তাকে থানায় আটক রাখা হয়। চার দিন পর রাত প্রায় ১০টার দিকে ভাইকে মেরিনড্রাইভে নিয়ে গিয়ে ক্রসফায়ার নাটক সাজিয়ে হত্যা করে।’

ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে ফেরার গল্প: টেকনাফ থানা পুলিশ সাবরাং রোডের থানার ডেইল এলাকায় একসঙ্গে তিনজনকে আটক করে ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল। তবে সেখান থেকে একজনকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় এবং অন্য দুজনকে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরেছেন এমন একজনের সন্ধান পেয়েছে কালবেলা। এখনো তার মন ও মনন থেকে সেই ভয়ের ছাপ কাটেনি।

ওই ব্যক্তি কালবেলাকে বলেন মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরার গল্প। তিনি জানান, টেকনাফ থানা পুলিশ তাদের সাবরাংয়ের হাবিরপাড়া থেকে আটক করে এমপির বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আহমদও উপস্থিত ছিলেন। এরপর এসপির বাসায় একদফা নির্যাতন চালায় পুলিশ। পরে এমপির নির্দেশে সবাইকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেখান থেকে ধারদেনা করে থানা পুলিশকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পান। তবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা অন্য এক ব্যক্তিকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়।

হত্যা করা হয়েছে যাদের: দিদার ওরফে মৌলভি; পিতা: মৃত ইউসুফ, মো. আবু হানিফ; পিতা নাজমুল, আব্দুস সামাদ; পিতা শাহ আলম, সওকত আলী; পিতা: মৃত কবির আহমেদ, মো. করিম ওরফে কলিম উল্লাহ ওরফে কবির উল্লাহ; পিতা: নীর আহমদ, জাহাঙ্গীর আলম; পিতা: আবুল মনছুর, জাহাঙ্গীর; পিতা: সৈয়দ আলম, সাদ্দাম হোসেন; পিতা: তোফায়েল আহমেদ, সাদ্দাম হোসেন; পিতা: সুলতান আহাম্মদ, জিয়াউল বশির শাহীন; পিতা: সৈয়দ হোসেন ওরফে সৈয়দ, ফরিদ আলম; পিতা: মৃত আব্দুল কাদের, আব্দুল আমিন; পিতা: আমির হামজা, নাজির আহম্মদ; পিতা: মৃত রহিম মাঝি, মো. জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া; পিতা: হাজি মোহাম্মদ ইসলাম, বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া; মো. ইউসুফ জামাল বাহাদুর; পিতা: খলিলুর রহমান, আবুল কালাম ও রশিদ আহাম্মদ; শামসুল আলম পিতা হোছেন; মো. গিয়াস উদ্দিন; আবুল হাসেম প্রকাশ নাজির; পিতা: জানে আলম প্রকাশ; নুর মোহাম্মদ পিতা: এজাহার মিয়া; নুরল ইসলাম পিতা: এখলাছ মিয়া; মোহাম্মদ হোসেন পিতা: হাবিরছড়া; মাহমুদুর রহমান পিতা: হোসেন; আবছার পিতা: নুর ইসলাম; নুর আলম পিতা: আমির হোসেন; মো. জুবায়ের পিতা: মো ইউনুছ; হামিদ উল্লাহ পিতা: ইমান হোসেন, মো কাশেম পিতা: আনু মিয়া; মো. আলম; মো. রফিক; দুদু মিয়া পিতা: মৃত হাজি সুলতান; মো. ইব্রাহিম পিতা: নুরল আমিন প্রকাশ; মো. হানিফ পিতা: মৃত কাশেম; হাজি মো. সাইফুল করিম পিতা: ডা. হানিফ; মফিজ আলম পিতা: নজির আহামম্মদ; রাসেল মাহমুদ পিতা: ফয়েজ আহাম্মদ; মো. রুবেল পিতা মৃত বশির আহাম্মদ; ওমর ফারুক পিতা: হাবিব উল্লাহ; আব্দুস সালাম ও আব্দুর রহমান উভয়ের পিতা হোছন প্রকাশ; মো. হামিদ ওরফে হামিদ মেম্বার পিতা: আবুল হাসিম প্রকাশ; মফিদ আলম পিতা: মৃত নজির আহাম্মদ; মো. হোছন পিতা আনু মিয়া; ইমরান মোল্লা পিতা: মৃত জহিরুল মোল্লা; মো. মোস্তাক আহাম্মদ পিতা: সাহাব মিয়া; মো. বাবুল পিতা আনোয়ার হোসেন; মো. ইব্রাহিম পিতা: সৈয়দ আলী; নুর মোহাম্মদ নুর প্রকাশ: মো. আব্দুল করিম পিতা: জমির আহমদ; নোছার আহাম্মদ পিতা: সৈয়দ হোসেন; হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিরান; মো. জামিল পিতা: ফজল আহাম্মদ; আসমত উল্লাহ পিতা: নবী হোসেন; মো., রফিক পিতা: মোহাম্মদ আলী; দীল মোহাম্মদ; আব্দুল আমিন পিতা: আলী চান; মো. হেলাল উদ্দিন পিতা: মৃত নুর মোহাম্মদ; আহাম্মদ হোসেন; আব্দুর রহমান; জিয়াউল হক ওরফে জিয়া পিতা: সামশুল আলম; আজিমুল্লাহ পিতা: মৃত কেফায়েত; মো. আজিজ পিতা: সালেহ আহাম্মমদ; ছলিম প্রকাশ পিতা: কাদের হোসেন; মাহমুদুল হাসান পিতা: বাকার আহাম্মদ; মোহাম্মদ উল্লা পিতা: হায়দার আলী; মো. আমিন ওরফে নুর হাফেজ পিতা: দিল মোহাম্মদ; ছমুদা স্বামী মৃত নুরু ছালাম; মো. নাসির পিতা: জালাল আহাম্মদ; মো. মোজাহের মিয়া পিতা: হাকিম; আব্দুর ছালাম, পিতা: হামিক আলী; অজি উল্লাহ পিতা: সিরাজুল ইসলাম; দুদু মিয়া পিতা: হাজি সুলতান; মো. মিজান পিতা মো. জাফর আলম; মাহামুদুল্লাহ পিতা: সুলতান আহামম্মদ; সেয়দ আলম ও নুরুল আলম উভয়ের পিতা: আব্দুল মজিদ প্রকাশ; আব্দুল মুনাফ পিতা সাব্বির আহাম্মদ; নুর মোহাম্মদ পিতা: নুর ছালাম; মো. রফিক পিতা: সৈয়দ করিম; শরিফ পিতা: ছলিম; ইমাম হোসেন পিতা: মো. সুলতান আহাম্মদ; আবুর কাশেম পিতা: ফজল আহাম্মদ; সাদ্দাম হোসেন পিতা: মৃত সোলতান আহাম্মদ; মো. আজাদুল হক পিতা: মৃত হাকিম আল; মো. ফারুক পিতা: মৃত হাকিম আলী; মো. তাহের পিতা: ইউসুফ আলী; মৌলভি বখতিয়ার প্রকাশ পিতা: কালা মিয়া; খোরশেদ আলম পিতা: গোলাম হোসেন; আব্দুল করিম পিতা: আবদুস সালাম; রুবেল পিতা মো. ছিদ্দিক; আনোয়ার ইসলাম পিতা: শহিদুল ইসলাম; আবুল হাশিম পিতা: হোসাইন শরীফ; মো. আব্দুল নাছির পিতা: মো. জাকের; মো. ইলিয়াস পিতা: মৃক সাফি; মো. নুরল আমিন পিতা: মো. মকতুল হোসেন; মো. জোবায়ের; মঞ্জুর আলম; নুরুল আমিন ওরফে নুর হোসেন; সৈয়দুল মোস্তফা; আজিমুল্লাহ; মো. জামিল; মো. এমরান; নুর কামাল পিতা: নুর আহাম্মদ; সাইফুল ইসলাম সোহেল পিতা: আব্দুর শুক্কুর; আব্দুল হাকিম ; রশিদ; মো. ইসহাক পিতা: আব্দুল মতলব; রশিদ পিতা: মো: সফি; জকির আহাম্মদ প্রকাশ পিতা: হাজি আব্দুল আমিন; আব্দুল হামিদ পিতা: মো. হাসিম; জহির আহামম্মদ হোসাইন আহাম্মদ; মো. হাশেম ওরফে উল্লাহ পিতা: মো. বশির আহাম্মদ; নুরল হক পিতা: আব্দুর বশর আহাম্মদ; কেফায়েত উল্লাহ; কুরবান আলী ওরফে শফিক; আব্দুল্লাহ আল মোবিন; পিতা: অব্দু রহিম; মো. আব্দুল্লাহ আল রিফাত পিতা: আব্দুল মালেক; মো. নুর নবী পিতা: মুত আবদুল করিম; আবুল কাশেম পিতা: সৈয়দ আহাম্মদ; মো. খলিলুর রহমান পিতা: চান মিয়া মাঝি; দিদারুল ইসলাম দিলদার পিতা: ফোর আহাম্মদ; সাজ্জাদ পিতা: আবুল হাসেম; মুরাদ পিতা: শাহাদাত হোসেন; ফরিদ আলম পিতা: বদি আলম; খুলু মিয়া পিতা: মৃত আজম উল্লাহ; মোকারম হোসেন জাম্বু পিতা: এখলাছ; মো. এনাম পিতা: নুরুল হক; আব্দুল মালেক; জয়নাল আবেদীন পিতা: মফিজুর রহমান; মো. সাজ্জাদ হোসেন পিতা: আবুল হোসেন।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী নাদিম মাহমুদ কালবেলাকে বলেন, ‘কোনো মানুষকে বাসাবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে এভাবে হত্যা করার কোনো আইনি বৈধতা নেই। পুলিশ শুধু নিজের জীবনের ঝুঁকি মনে করলে ফোর্স পাওয়ার ইউজ করতে পারবে। তাই এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারায় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এগুলো পরিষ্কার হত্যাকাণ্ড, এসব হত্যার বিচার না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না।’

ক্রসফায়ারের নামে এমন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, “এক এগারো থেকে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ের ১৬ বছরে যত ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, সব ঘটনার তথ্য চেয়ে আমরা চিঠি দিয়েছি। আমরা সারা বাংলাদেশে কতগুলো ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, এগুলো জানতে চেয়েছি। যদি ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো ‘সিস্টেমেটিক ক্রাইমের’ মধ্যে আসে, তাহলে এগুলো সবই আমাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে এবং আমরা যদি দেখি যাচাই-বাছাই করে—যে ঘটনাটাই হোক, যেখানেই হোক, সেটা যদি আমরা দেখি যে, এটি একটি সিস্টেমেটিক ক্রাইমের আওতাভুক্ত এবং সেখানে একটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তাহলে সেটি আমরা তদন্ত করব এবং আমাদের এখানে বিচারের ব্যবস্থা করব।’