জীবন নিয়ে খেলা। নেই কোনো মানবিকতা। আছে কেবল জীবন ও টাকা। মাঝখানে মৃত্যু। এমন খেলায় মেতে উঠেছে একটি চক্র। টাকার নেশায় তারা যা খুশি তাই করে। বসবাস করে লিবিয়ায়। ফাঁদ সিলেট ও সুনামগঞ্জে। অসহায় মানুষদের নিয়ে গভীর সাগরে ডুবাচ্ছে। লিবিয়া সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। সেটি এখন থেকেই নয়, অনেক আগে থেকেই। বছরে খবর আসে বার বার। তখন শুরু হয় হা-হুতাশ। অনেক মায়ের কোল খালি হয়, দীর্ঘশ্বাস ঘিরে ধরে গোটা পরিবারকে। তবুও মানুষ জীবনের তাগিদের ছুটে চলে। শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে খবরটি ভেসে বেড়াচ্ছিলো সিলেটে। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি। সিলেটের অনেকেই নিহত। খবরটি শোনার পর থেকেই সিলেটে উৎকণ্ঠা বাড়ে। না জানি আরও কতোজন মারা গেছে। মধ্যরাতের দিকে খবরের সত্যতা মেলে। সুনামগঞ্জের ১০ জনের প্রাণহানি। বেঁচে ফেরাদের মুখে ভয়াবহ বর্ণনা। এমন মৃত্যু কাম্য নয়। কারা করছে এসব, সিন্ডিকেট? এসব বিষয়ও রটে মানুষের মুখে মুখে। প্রশাসনও তৎপর হয়। রহস্যময় নীরব নিহতদের পরিবার।
লিবিয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সেখানেই তারা বসবাস করে। ওখান থেকেই প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত রয়েছে নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে; এ দফা মারা যাওয়া সিলেট অঞ্চলের ১০ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জেই। দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজারে। এলাকার সিন্ডিকেট ধরেই মাসখানেক আগে তারা লিবিয়ার পথে পাড়ি দেয়। এর অন্যতম রুট হচ্ছে দুবাই। প্রথমে দুবাই। এরপর লিবিয়া। সাগরপথে গেমের মাধ্যমে ইউরোপ। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এবার রুট বদল হয়েছে। তারা সৌদি আরব হয়ে মিশর। এরপর লিবিয়া। অর্ধশতাধিক যুবক সুনামগঞ্জ থেকেই ঢাকা এয়ারপোর্ট হয়ে লিবিয়া যান। এরপর তাদের গেমের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছিলো গ্রীসে। নিহতদের স্বজনদের মাধ্যমে জানা গেছে একাধিক নাম। তাদের সবার বাড়িই সুনামগঞ্জ। লিবিয়ায় বসবাসকারী একাধিক ব্যক্তি। সিন্ডিকেট একটি। যে যেভাবে পারেন লোক সংগ্রহ করে নিয়ে যান। এরপর ওখানে একত্রিত করে গেমে তোলা হয়। এবার জগন্নাথপুরের নিহত যুবকদের দালাল হিসেবে নাম এসেছে উপজেলার পাইলগাঁওয়ের আজিজ আহমদ। সে কয়েক বছর ধরে লিবিয়াতেই থাকে। দালাল মারফতে সেও গিয়েছিল লিবিয়ায়। গেমে যায়নি। বসে বসে দালালি করে।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আজিজ দেশে থাকা লোক মারফতেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে ইউরোপ পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেবে বলে জানায়। অর্ধেক টাকা দিয়ে তাদের পাঠানো হয়েছিল। আজিজের আরেক সহযোগী রয়েছে লিবিয়ায় বসবাকারী আব্দুল হাই। সেও এই গেমের অন্যতম হোতা। দিরাইয়ের মারা গেছেন ৪ জন। এই ঘটনার সঙ্গে এসেছে অন্য আরেকজনের নাম। ওই দালালের নাম জসিম। তার বাড়ি ছাতক এলাকায়। তার মারফতেই তারা ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া গিয়েছিলেন। জগন্নাথপুরের এনাম আহমদ। লিবিয়ার মানব পাচার চক্রের গডফাদার। অনেক আগে থেকেই সে বসবাস করে লিবিয়ায়। সুনামগঞ্জ ও সিলেটে রয়েছে তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। দুই বছর আগে মানব পাচার মামলায় তার বিরুদ্ধে সিলেটের আদালতে মামলা হয়েছিল। এনামের সঙ্গে শাহীন নামে আরও এক ব্যক্তি রয়েছে। লিবিয়ায় থাকা সুনামগঞ্জের এক যুবক মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জ জেলার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে লিবিয়ায়। তারা গেমের মাধ্যমে লোক পাঠায়।
লিবিয়ার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা এ কাজ করে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একাধিক টর্চারশেল। দেশ থেকে যাওয়া সেসব যুবক টাকা কম দেয়- তাদের টর্চারশেলে নিয়ে মারধর করা হয়। এরপর আদায় করা হয় মুক্তিপণও। বছর খানেক আগের ঘটনা। গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি এলাকার এক যুবক লিবিয়ায় থাকা দালালের মাধ্যমে গিয়েছিলেন। টাকা না দেয়ায় তাকে টর্চারশেলে রেখে নির্যাতন করে দিরাইয়ের জুয়েল আহমদ নামের এক দালাল। পরে দেশ থেকে টাকা পাঠানোর পর ওই যুবককে গেম দেয়া হয়। তবে ধরা পড়ার পর সে ইউরোপের একটি দেশের কারাগারে অন্তরীণ রয়েছে। জগন্নাথপুরের ইউএনও বরকতউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, যেসব দালাল এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের নাম আমরা পেয়েছি। এখন ঠিকানা সংগ্রহ করা হচ্ছে। দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস মিয়া জানান, ঘটনার পর দালাল চক্রের সন্ধান করা হচ্ছে। প্রশাসন অবশ্যই এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।