ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হঠাৎ বেড়ে গেছে হাম (মিজলস) আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। গত ১২ দিনে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় দুজনসহ মোট পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে অস্বাভাবিকভাবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। আগে যেখানে মাঝে মধ্যে এক-দুজন রোগী পাওয়া যেত, এখন সেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে ভর্তি। বর্তমানে শিশু বিভাগের ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের। শয্যা সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে এক বিছানায় দুই শিশুকে রাখা হচ্ছে, কেউ কেউ মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) রাত ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে ছয় মাস বয়সি নুরুন্নবী নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার আয়নাল হকের ছেলে। এদিন বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। অন্যদিকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের আবদুর রহিমের সাত মাস বয়সি ছেলে লিয়নকে শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শিশুটি শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মারা যায়। ২৬ মার্চ ময়মনসিংহ নগরের নওমহল এলাকায় তনুসা নামের তিন বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সামিয়া নামের দুই বছর বয়সি আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই শিশুকে পুলিশ লাইনস এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল। তারও আগে ১৮ মার্চ ওয়াজকুরুনি নামের চার মাস বয়সি এক শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। শিশুটি জেলার গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল ১৫ মার্চ।
রোববার (২৯ মার্চ) শিশু বিভাগের ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সরা। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এক বিছানায় দুই শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কেউ কেউ মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল প্রশাসন ইতোমধ্যে হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক “হাম/মিসেলস কর্নার” চালু করেছে এবং তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তবে রোগীর চাপ এত বেশি যে এসব ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত হচ্ছে না। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হাম রোগীদের জন্য আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে, যা জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
হামে আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা সাত মাস বয়সি যায় লিয়ন। শিশুটির বাবা আবদুর রহিম জানান, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রাম থেকে ঈদের আগে ছেলেকে নিউমোনিয়ার সমস্যা নিয়ে পাঁচদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর হাম বের হলে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়।
নেত্রকোণা পুর্বধলা থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৩ মাস বয়সি সামিয়া আক্তার ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে আসা ১৫ মাস বয়সি আলমাছ মিয়া। এই শিশুদের পরিবার জানায়, হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন ধরে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি আছে। চিকিৎসকরা যথাযথ চিকিৎসা দিচ্ছে। কিন্তু সুস্থ হওয়ার কোনো লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অবিভাবকরা।
হাসপাতালের হাম মেডিকেল দলের ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক মোহা. গোলাম মাওলা বলেন,
চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এখন পর্যন্ত ১০৬ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত তিন শিশু ভর্তি হয়েছে। রোববার (২৯ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত ৬৬ জন রোগী ভর্তি আছে। হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি, দুই ধরনের রোগীই ভর্তি হচ্ছে। হাম আক্রান্ত শিশুরা হামের পাশাপাশি জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। রোগী বাড়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে শিশু বিভাগের তিনটি কক্ষ নিয়ে করা হাম কর্নার সরিয়ে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি চলছে।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান জানান, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হাম আক্রান্ত রোগী সাধারণ রোগীদের মধ্যে আছে, এমন সংখ্যা কম। খোঁজ করে পেলে সেই রোগীকে নির্ধারিত স্থানে পাঠানো হচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, হাম আক্রান্ত রোগী হঠাৎ বেড়েছে। আগে এ ধরনের রোগী এত বেশি দেখা যায়নি। হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। সাধারণ রোগীদের সংস্পর্শে যেন না যায়- সেজন্য তিনটি আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে। আইসোলেশনের জায়গাটি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ বলেন, জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২২ জন সন্দেহজনক হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ৬ জন ভর্তি আছে। হাম আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রত্যেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনটি করে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।