জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়ার পর অনেক ক্রিকেটারই চলে যান আড়ালে। তবে মোহাম্মদ শহীদ এখনও ক্রিকেটের সঙ্গেই আছেন। কর্পোরেট ও অ্যামেচার ক্রিকেটে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। তার কথায় বারবার ফিরে এলো আক্ষেপ, হতাশা আর অবমূল্যায়নের অভিযোগ।
শনিবার বসুন্ধরা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অ্যামেচার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনাল খেলেছিলেন শহীদ। ম্যাচের মাঝে বাংলানিউজের মুখোমুখি হয়ে ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন, ইনজুরি আর নির্বাচকদের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন জাতীয় দলের হয়ে ৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা শহীদ।
বাংলানিউজ: জাতীয় দলের ক্রিকেটার, সব বাদ দিয়ে খেলছেন কর্পোরেট ক্রিকেট; একটু কি খারাপ লাগে না?
মোহাম্মদ শহীদ: আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই লাগছে। আমার মনে হয়, যারা পেশাদার ক্রিকেট ছেড়ে এসেছে, তাদের জন্য কর্পোরেট ক্রিকেট ভালো একটা অপশন হতে পারে।
বাংলানিউজ: ২০২১ সালের পর আর পেশাদার ক্রিকেটে খেলা হয়নি। লম্বা এই সময়টা কী করেছেন?
শহীদ: পরিবারকে সময় দিয়েছি। তেমন কিছু করা হয়নি। ক্রিকেট প্র্যাকটিস করতাম, নারায়ণগঞ্জ লিগে কিছুদিন খেলেছি। এমনিতেই ক্রিকেটের মধ্যেই ছিলাম।
বাংলানিউজ: ২০১৬ সালে ইনজুরি থেকে ফিরে বিপিএলে দারুণ করেছিলেন, এরপর আবার ইনজুরি। এই ইনজুরিই কি আপনাকে শেষ করে দিল?
শহীদ: এসব এখন বলতে গেলে খারাপ লাগে, কষ্টও লাগে। আমি ইনজুরি থেকে ফিরে বিপিএলে ভালো করেছিলাম। ৮ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়েছিলাম। কিন্তু বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিং করতে গিয়ে আমার সব শেষ হয়ে যায়। এরপর ইনজুরি থেকে ফিরে আমি ঘরোয়া ক্রিকেটে কিন্তু কামব্যাক করেছিলাম। টানা দুই বছর প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলার ছিলাম। ২০১৯ সালে সেরা বোলিং ছন্দে ছিলাম। আগে তো ঘরোয়া ক্রিকেটে স্পিনারদের জন্য উইকেট হতো। সেই উইকেটে আমি খুব ভালো বোলিং করেছি। আমি ২০১৯ বিশ্বকাপ খেলব—এই আশা করেছিলাম। কিন্তু আমাকে নেওয়া হয়নি। কেন নেওয়া হয়নি, এর ব্যাখ্যাও কেউ দেয়নি। এত বছর পরও এটা আমি জানতে চাই।
বাংলানিউজ: বাদ পড়া কিংবা ইনজুরিতে থাকার সময়টাতে নির্বাচক প্যানেলের কেউ কি আপনার খোঁজখবর নিতো?
শহীদ: না, কোনো নির্বাচকই কখনো আমার খোঁজ নেয়নি। খুব কষ্ট লাগে। নির্বাচকরা যদি আমার প্রতি একটু যত্নশীল হতেন, আমাকে যদি সামান্য সুযোগ দিতেন। তাহলে আমি বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছু দিতে পারতাম। খুব আফসোস হয়, জানেন। আমার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমি বাংলাদেশকে আরও বেশি কিছু দিতে পারিনি। কেউই আমার খোঁজখবর নেয়নি। ফোন করেও কাউকে পাইনি। আমি এতটা বাজে প্লেয়ার ছিলাম না যে আমাকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। ফিটনেস ইস্যুতে আমাকে বিপিএল খেলতে দেওয়া হয়নি। অথচ অনেক তারকা ক্রিকেটারের ফিটনেস সমস্যা আছে—তাদের ক্ষেত্রে কিন্তু কোনো সমস্যা হয়নি। তারা বিপ টেস্টে ১৬/১৭ দিয়ে বল ফেলতে পারে না, আর আমি ১০ দিয়েও টানা বোলিং করতে পারি। এগুলো কাউকে বলতে পারিনি, আমার কথা শোনার কেউ ছিল না। এখন একটা কথা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে ভালো প্লেয়ারদের কখনোই মূল্যায়ন করা হয় না।
বাংলানিউজ: আপনি কি মনে হয় না, আপনার পারিবারিক সমস্যা আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?
শহীদ: না, আমি তা মনে করি না। এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল। ২০১৭ সালেই মিটমাট হয়ে গেছে। ইনজুরি থেকে ফিরে আসার পরও আমার প্রিমিয়ার লিগের পারফরম্যান্স দেখেন, প্রতি মৌসুমে ২০-২৫টা করে উইকেট থাকতই। ২০২১ সালে শেষবার যখন লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের হয়ে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের লিগ খেলেছি, ওই আসরেও খারাপ করিনি। ১৫ উইকেট নিয়েছিলাম। এরপর আর ঘরোয়া ক্রিকেটে সুযোগ হয়নি। আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়ার দায় কে নেবে?
বাংলানিউজ: তবুও কি মনে হয় না, আরও একটু সচেতন হলে ক্যারিয়ারটা ভিন্ন রকম হতে পারত?
শহীদ: ফিটনেস নিয়ে কাজ করলে হয়তো আরেকটু ভালো করতে পারতাম। কিন্তু আপনি দেখেন, আমি যেভাবে টানা বোলিং করতাম, সেখানে ফিটনেসের কোনো ইস্যু থাকার কথা না। অনেকেই এটাকে বড় ইস্যু মনে করে, আমি তা মনে করি না। বিপ টেস্ট কোনো ইস্যুই না। দেখা উচিত মাঠের পারফরম্যান্স ঠিক আছে কি না। আন্দ্রে রাসেল এখনো খেলছে, তার ফিটনেস কি শতভাগ? একজন জুনিয়র প্লেয়ারের সঙ্গে আমার তুলনা করলে তো হবে না। ওর ফিটনেস আর আমার ফিটনেস এক হবে না। আমি যেসব ক্লাবে খেলেছি, সেখানে আমার জুনিয়র প্লেয়াররা ভালো ফিটনেস নিয়েও সুযোগ পেত না। আমিই ওদের সুযোগটা দিতাম না।
বাংলানিউজ: তাহলে কি আপনি মনে করছেন নির্বাচকরাই আপনার ক্যারিয়ারটাকে বড় হতে দেয়নি?
শহীদ: অবশ্যই। আমার ক্ষেত্রে বিপ টেস্ট কোনো ইস্যু ছিল না। নির্বাচকদের কাজ কী? প্লেয়াররা পারফরম্যান্স করছে কি না, সেটা দেখা। নান্নু ভাই, বাশার ভাইদের দরকার ছিল আমার পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করা। তারা দেখেনি, আমার কোনো খোঁজখবরও নেয়নি। এটা আমার বড় আক্ষেপ। আমি এতটা বাজে বোলার ছিলাম না যে তারা আমার খোঁজ নেবে না। এই দেশে ভালো প্লেয়ারদের মূল্যায়ন করা হয় না। এই কারণেই আমাদের দেশের ক্রিকেটের আজকের এই অবস্থা। আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি, নান্নু ভাইয়ের কারণে আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়েছে। শুধু আমি না, এমন অনেক ক্রিকেটার আছে। নান্নু ভাই কত প্লেয়ারের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছেন, তার হিসাব নেই। তিনি প্লেয়ারের নাম-খ্যাতি দেখে, তাকে সেভাবে ট্রিট করেন।
বাংলানিউজ: সেটি কেমন?
শহীদ: সাকিব ভাই বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। তামিম ভাই দেশসেরা ওপেনার। তাদের ফিটনেস কি ওই লেভেলের? কিন্তু তারা পারফরম্যান্সটা সেরা করেছে। তাদের ক্ষেত্রে নামটা বিবেচনা করা হয়েছে, ফিটনেস নয়। আমার ক্ষেত্রে ফিটনেসটাকেই সামনে আনা হয়েছে। আমার তো তাদের মতো ফেস ভ্যালু নেই। আমি তো সাকিব-তামিম না। আমাকে যদি মূল্যায়ন করা হতো, আমি বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে পারতাম। সেই সক্ষমতা আমার ছিল। বহুবার বাদ পড়ার পর নান্নু ভাই, বাশার ভাইদের কাছে জানতে চেয়েছি—আমার সমস্যা কোথায়? তারা কখনোই ফোন ধরেনি। তাদের ব্যবহার এতটাই খারাপ। তারা মানুষকে মানুষ মনে করে না। আমার কাছে তারা ভালো মানুষ না। তারকা প্লেয়ার হলে নান্নু ভাইয়ের কাছে সব মাপ। প্লেয়ারদের মূল্যায়ন করা দরকার। মূল্যায়ন না করলে তারা কখনোই সেরাটা দিতে পারবে না।
বাংলানিউজ: তাহলে কি আপনার পেশাদার ক্রিকেটের অধ্যায় শেষ?
শহীদ: আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। অ্যামেচার ক্রিকেট খেলছি, সেটাই খেলব। যত ধরনের টুর্নামেন্ট আছে, সব জায়গায় খেলতে চাই। অনেক চেষ্টা করেছি, এখন ক্লান্ত লাগে। অনেক আফসোস, অভিমান নিয়েই পেশাদার ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।
বাংলানিউজ: নতুন নির্বাচক প্যানেল এসেছে। তাদের দুজনের সঙ্গে আপনি দীর্ঘ সময় খেলেছেন। তাদের কাছে কী প্রত্যাশা?
শহীদ: নাদিফ, নাঈম ভাইয়ের সঙ্গে অনেক ক্রিকেট খেলেছি। আগে অনেক সময় আলাপে বলত—এইসব পজিশনে সুযোগ পেলে ভালো কাজ করবে। এখন তারা সেই সুযোগ পেয়েছে। আমি আশা করব, নাঈম ভাই এবং নাদিফ ভাই ভালো কাজ করবেন। প্রত্যাশা থাকবে—যোগ্য ছেলেরা যেন সুযোগ পায়।