বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘আমি যখন স্বাধীনতার ঘোষণা শুনি, তখন ২৬ মার্চ আনুমানিক সকাল ১০টা। জিয়াউর রহমানের (শহীদ রাষ্ট্রপতি) স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আশাহত মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হলো। তারা মনে করল, এবার মুক্তিযুদ্ধটা হবে। কোনো না কোনো বাঙালি সেনা যুদ্ধে নেমে গেছে।
তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাটা এই জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেলে কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
কালের কণ্ঠ : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঘটনা জানতে চাই, কিভাবে শুরু হলো যুদ্ধ?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : স্বাধীনতার যুদ্ধের আলোচনা করতে গেলে এটা তো অনেক লম্বা ঘটনা। শর্ট করে যদি বলি, মার্চ মাসের এক তারিখ থেকে সাত তারিখ পর্যন্ত ঢাকা শহর মিছিলের শহরে রূপান্তরিত হয়। সেই সময়ের বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ৭ মার্চ জনসভায় এলেন।
ওই ভাষণের মধ্যে উনি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অক্ষুণ্ন রেখে বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নানা রকমের যুক্তির অবতারণা করেছেন, যেগুলো ক্ষুরধার ছিল এবং সেই বক্তব্যের মধ্যে একটি জায়গায় পাকিস্তানি আর্মিদেরকে তিনি বলেছিলেন ‘আপনারা আমার ভাই, আপনারা ব্যারাকে চলে যান’। তারপরে আবার বলেছেন ‘একটা গুলি চললে, বীর বাঙালিরা আরো রক্ত দেবে’। আবার একটা জায়গায় বলছেন যে ‘আসুন বসুন আলোচনা করি, পার্লামেন্ট দেখুন, ক্ষমতা হস্তান্তর করুন’। বক্তৃতা থেকে বোঝা যায় যে উনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইয়াহিয়া খান ১৫ তারিখে ঢাকায় আসেন এবং ১৫ তারিখ থেকে ২৫ তারিখ রাত পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। আমি এইজন্য বলছি যে ওটা স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর তো যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরিবর্তে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছিল সে বৈঠকে ছয় দফা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেজন্য ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার ঘোষণা না, ৭ মার্চের ভাষণ ছিল ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠনের প্রচেষ্টা। এমনকি ২৫ মার্চ দুপুরে বিদেশি সাংবাদিকদের আলোচনার অগ্রগতি আছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তাহলে আলোচনার করছি কেন?।
কালের কণ্ঠ : কিভাবে বাংলাদেশের জন্ম হলো?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : সেখানেই আসছি। মিরপুরে বিহারি ক্যাম্পের একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তারা (বিহারি ক্যাম্পের সদস্যরা) খুব আক্রমণমুখী ছিল। কোনো সমাধান ছাড়াই সন্ধ্যার পর যখন ফিরছি তখন শুনলাম ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে গোলাগুলির আওয়াজ। আসলে ২৫ তারিখ রাতেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের অস্ত্র, ট্যাংক, কামান নিয়ে ঢাকার রাজপথে বাঙালি হত্যা করার জন্য নেমে পড়ে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে বাঙালিরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, হাজারো মানুষ রাস্তায় লাশ হয়ে পরে থাকে। ২৫ তারিখ রাতে শান্তিনগরের দাদাবাগ পুলিশ গেটের উল্টো দিকে আমি যে বাড়িতে থাকতাম, সেখান থেকে দেখেছি শান্তিনগরের মোড় থেকে রাজারবাগ পর্যন্ত যত বাড়ি আছে প্রত্যেকটা বাড়ির ছাদে পুলিশ বাহিনী তাদের যে অস্ত্র আছে তা নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল এবং সারা রাত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি চলে। এই পুলিশের সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমিও ‘থ্রি নট থ্রি’ বন্দুক দিয়ে গুলি চালিয়েছি। রাত ৩টার দিকে বহু পুলিশের হত্যার বিনিময়ে রাজারবাগের পতন হয়। তারপর দিন সারা ঢাকা শহরে কারফিউ এবং মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রাস্তায় শুনশান নীরবতা। শুধু মিলিটারির গাড়ির ঝনঝনানি ছাড়া কোনো মানুষ ছিল না। এমনকি পাখিরও আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। ২৬ তারিখে কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল কি না আমি কনফিউজড। রাস্তায় লাশের মিছিল, বেশিরভাগ খেটেখাওয়া মানুষের লাশ, শিশুর লাশ, নারীদের লাশ। পুরো ঢাকা একটা ভুতুড়ে নগরী।
আমরা ঢাকা থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য পায়ে হেঁটে নরসিংদীর দিকে যাই। রাতে যখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে, এমন সময় একজন বৃদ্ধ ট্রানজিস্টার নিয়ে একটা চায়ের দোকানে এসে বলে স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে গেছে। বাঙালি সৈনিক মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে ট্রানজিস্টারের ওপর। যদিও পরিষ্কার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু আমরা বুঝতে পারলাম একজন মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে মানুষ হতাশায় ভুগছিল, যাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বা তারা মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা মানুষের মধ্যে সাহসের জোগান দিল। তারা মনে করল এবার মুক্তিযুদ্ধ হবে। বাঙালির সেনারা নেমে গেছে, তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার মোকাবেলা করা সম্ভব হবে বলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হলো।
কালের কণ্ঠ : স্বাধীনতার ঘোষণা আপনি কি শুনেছিলেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা আমি নিজের কানে শুনেছি। সেই ঘোষণা শুনেই উদ্বেলিত হয়েছি।
কালের কণ্ঠ : বিগত আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নানা বির্তক তৈরি করেছে। বিএনপি সরকার জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে কি না?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : আমি আগেই বলেছি, এটা কোনো দলের যুদ্ধ ছিল না। এটা ছিল জনযুদ্ধ। আর বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো মুক্তিযুদ্ধকে নিজের দলীয় যুদ্ধ বানানোতে বিশ্বাস করে না। মুক্তিযুদ্ধের মালিকানার দাবি বিএনপি কখনই করে না। তবে ইতিহাস যদি লিখতে হয় জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণাকে বাদ দিয়ে ইতিহাস লেখা যাবে না এবং জিয়াউর রহমানের ঘোষণাই মানুষকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। হতাশাগ্রস্ত মানুষকে আলোর দিশা দেখিয়েছিল। আমি কারো সঙ্গে তুলনা করব না। জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনে আমার মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল। আমি যেটা দেখছি, আমি যেটা বুঝেছি সেটাই ব্যক্ত করলাম। কারো নাম বাদ দিয়ে ইতিহাস লিখা যাবে না।
কালের কণ্ঠ : নতুন প্রজন্মের কাছে আপনার সরকার কিভাবে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরবে?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : আমি মনে করি, বিএনপির বা আমাদের সবার উচিত সঠিক ইতিহাসটা তুলে ধরা। আমাদের প্রজন্ম মরে গেলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কেউ কথা বলতে পারবে না। আমি কোনো বায়াসড কথা বলছি না। আমি নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি। সেখানে যে ব্যক্তিটা শুরু করল তার নামটা বাদ দিয়ে ইতিহাস শুরু করা যাবে না। হ্যাঁ, একটা আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। সেই আন্দোলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন, আরো অনেকেই ছিলেন। এই আন্দোলনটা ত্বরান্বিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাটা দিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
কালের কণ্ঠ : স্বাধীনতার ৫৫ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? কী অসম্পূর্ণ রয়ে গেল?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : হাসিনা মুক্তিযুদ্ধকে বিক্রি করে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এটা হলো ৫৫ বছরে সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর একটি অধ্যায়। আজকে যদি হাসিনা মুক্তিযুদ্ধকে সর্বজনীন রাখতেন, তাহলে যার যা রোল তার তা মূল্যায়ন হতো। আজকে আমার খুব কষ্ট হয়, যখন দেখি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক হয়। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যারা বাজে কথা বলে তারা আবার জনগণের কাছে যায়, বলে ভোট দেন। এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের এবং রক্তক্ষরণ হয়। এত মানুষের জীবনের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি। ক্ষমতার ভাগ চাইনি।
কালের কণ্ঠ : ৭১ আর ২৪ কিভাবে দেখেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ আর ২৪ এক নয়। স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের একটা পতাকা দিয়েছে। আমাদের একটা শাসনতন্ত্র দিয়েছে। আমাদের জাতির পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। আর ২৪ তো আমাদের পরিচয় দেয়নি। এটা শাসনমুক্ত করেছে। এটাকে যখন তারা ৭১-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে চাই—সেটা সবচেয়ে বড় আহাম্মকের কাজ। তারা আসলে দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।
কালের কণ্ঠ : রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমানকে কিভাবে দেখেছেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : আমি উনার আন্ডারে যুদ্ধ করিনি। সাধারণত কমান্ডাররা যুদ্ধ করেন না, তবে উনি সম্মুখসারিতে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। ক্রাইসিস মোমেন্টে উনার উত্থান হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আবার প্রমাণ করেছিলেন উনি ক্রাইসিস সময়ের নেতা। জিয়াউর রহমান সব সময় দেশের সংকটময় মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।