পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা থেকে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে সড়ক, রেল ও নৌপথে। সড়কে গাড়ির জট ও হালকা যানজট মাড়িয়ে বলা চলে স্বস্তিতে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরছেন ঘরমুখো মানুষ। তবে মঙ্গলবার থেকে সড়কে গাড়ির চাপ বাড়ার পাশাপাশি যানজটও বাড়ছে বলে যুগান্তরের সারা দেশের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। এদিকে এবার ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে ঈদুল ফিতরের আগের ৩ দিন এবং পরবর্তী ৩ দিন অর্থাৎ ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ থাকবে। ঈদ উদযাপন উপলক্ষ্যে গণপরিবহণ চলাচলসংক্রান্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে মঙ্গলবার একথা জানানো হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, পচনশীল দ্রব্য, গার্মেন্টসামগ্রী, ওষুধ, সার ও জ্বালানি বহনকারী যানবাহনগুলো এর আওতামুক্ত থাকবে।
এদিকে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চের যাত্রী কমলেও, ঈদের সময় বাসের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এবং স্বস্তির যাত্রার জন্য অনেকে সড়ক পথ ছেড়ে নৌপথ বেছে নেন। এবারও ঈদযাত্রায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে যাত্রীর চাপ বেশি দেখা গেছে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, লঞ্চগুলো যাত্রী ভরার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট রুটে ছেড়ে যাচ্ছে। এবার সাত দিন ছুটি থাকার কারণে বাড়ি ফেরার অনেক সময় পাওয়ায় এক সঙ্গে যাত্রীদের চাপ পড়ছে না বলে জানান লঞ্চের কর্মচারীরা।
সারা দেশ থেকে যুগান্তর প্রতিনিধিরা জানান-এই সপ্তাহের শুরু থেকেই বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে দেখা গেছে। আনুষ্ঠানিক ছুটি শুরু হওয়ায় মঙ্গলবার সকাল থেকে বিভিন্ন মহাসড়ক ও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। কোথাও কোথাও দেখা দেয় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের যানজটও। লঞ্চঘাট ও রেলওয়ে স্টেশনে বেড়েছে যাত্রীর চাপ। পর্যাপ্ত ট্রেন ও লঞ্চ প্রস্তুত থাকায় গতকাল পর্যন্ত গন্তব্যে রওয়ানা হতে যাত্রীদের তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। আজ থেকে সড়ক, নৌ ও রেলপথে যাত্রীচাপ আরও বাড়বে। সেই পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রার স্বস্তি অনেকাংশে ব্যাহত হতে পারে।
সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, মঙ্গলবার থেকে ঈদের আনুষ্ঠানিক ছুটি শুরু হওয়ায় প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল হয়ে যমুনা সেতু মহাসড়ক ও ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে টোল প্লাজা ও সড়কের নির্মাণাধীন অংশগুলোতে ধীরগতির কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের তুলনায় যাত্রাপথে অতিরিক্ত সময় লাগছে। অনেক স্থানে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে, ফলে ভোগান্তি বাড়ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ট্রাফিক বিভাগ বলছে, যানজট নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাজ চলছে। এবার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচলে ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অবশ্য জরুরি সেবা ও পণ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত থাকা পরিবহণগুলো চলাচল করতে পারবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
ঈদযাত্রা ভোগান্তিহীন হবে বলে মঙ্গলবার মন্তব্য করেছেন সড়ক, সেতু, রেল ও নৌ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, ঈদ উদযাপনে আগামী ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে দেড় কোটি লোক ঢাকা ছাড়বেন। এই যাত্রা স্বাভাবিক করাটা চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তারা যেভাবে কাজ করছেন, তাতে আশা করা যায়, কোনো ভোগান্তি ছাড়াই সবাই বাড়ি যেতে পারবেন। মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের বাকেরগঞ্জে গোনা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।
বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে যানজটের বড় স্পট রয়েছে ২০৭টি। গত বছর এর সংখ্যা ছিল ১৫৯টি। যানজটের এসব স্পট ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রয়েছে ১৪টি স্থান, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে রয়েছে ৫৫টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৪৩টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৫টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৯টি, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ১৪টি এবং যশোর-খুলনা মহাসড়কে রয়েছে ৬টি স্থান।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভাঙাচোরা মহাসড়ক সবচেয়ে বেশি রাজশাহী অঞ্চলে ২২৯ কিমি., রংপুরে ১৯৪ কিমি., চট্টগ্রামে ১৮৬ কিমি., কুমিল্লায় ১৬৭ কিমি., ময়মনসিংহে ১৫০ কিমি., সিলেটে ১৪৮ কিমি., ঢাকায় ১৪৩ কিমি., বরিশালে ১১৯ কিমি., গোপালগঞ্জে ৭০ কিমি. এবং খুলনায় ৬৮ কিমি.। সারা দেশে সওজের আওতায় মোট সড়ক রয়েছে ২২ হাজার ৭১৯ কিমি.। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৪২৯৩ কিমি., আঞ্চলিক মহাসড়ক ৫০৩৯ কিমি. এবং জেলা মহাসড়ক ১৩ হাজার ৩৮৫ কিমি.।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালেই ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা শুরু হয়ে গেছে এবং রাজধানী ছাড়ার পর বিভিন্ন মহাসড়কে যানবাহনের মারাত্মক চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে সড়ক সংকুচিত হওয়ায় গাড়ি থেমে থেমে চলছে এবং চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। গাড়ির গতি কমে যাওয়া এবং কোথাও কোথাও স্বল্প সময়ের যানজট তৈরি হলেও বড় যানজট বা স্থায়ী ভোগান্তির স্পট সৃষ্টি হয়নি। তবে প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্ট অধ্যুষিত গাজীপুরে লাখ লাখ শ্রমিকের বসবাস। ঈদের ছুটি পাওয়ায় তারা ইতোমধ্যে ঘরমুখো হতে শুরু করেছেন। এজন্য সড়কে চাপ বাড়ছে। এটি আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
জানতে চাইলে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন জানান, চন্দ্রা মোড় দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। ঈদের সময় চাপ বাড়লে এখানে সমস্যা তৈরি হয়। যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও মাঠে কাজ করছেন। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কিছু অংশে গাড়ির চাপ বাড়লেও এখন পর্যন্ত যানজটের খবর মেলেনি। এই হাইওয়েতে হাইওয়ে পুলিশ ২৭টি যানজটপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করেছে। যেমন-দাউদকান্দি টোল প্লাজা, সন্ধিনা বাসস্ট্যান্ড, ফেনীর বিসিক মোড় ও সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ড। এসব স্পটে আজ এবং আগামীকাল যানজটের বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও ভোগান্তির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত নির্মাণাধীন ছয় লেনের কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড বিপাকে ফেলছে। ফলে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ বাড়তে পারে।
এছাড়া যশোর-খুলনা ও যশোর-ঝিনাইদহ রুটে ধীরগতির নির্মাণ কাজ ও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে ভোগান্তি বাড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই রুটগুলোতে গত কয়েকদিনে গাড়ির চাপ বাড়ছে এবং ঈদযাত্রায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে কিছু রুটে পরিস্থিতি এখনো অপেক্ষাকৃত নিয়ন্ত্রণে আছে। ঢাকা-যমুনা সেতু মহাসড়কে গাড়ির চাপ থাকা সত্ত্বেও যানজটের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চাপ বাড়লেও পদ্মা সেতুর যান চলাচল স্বাভাবিক : মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতু এলাকা ও এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির চাপ বাড়লেও কোনো যানজট না থাকায় ভোগান্তি ছাড়াই পদ্মা সেতু পাড়ি দিচ্ছেন দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষরা। জানতে চাইলে মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) জিয়াউল হায়দার মঙ্গলবার দুপুর ১টায় যুগান্তরকে বলেন, সকাল থেকে মহাসড়ক ও পদ্মা সেতু এলাকায় যানবাহনের চলাচল বেড়েছে। তবে কোনো যানজট নেই। সেতুর গোড়ায় টোল দেওয়ার সময় মাঝে মধ্যে ১০০ থেকে ১৫০টির গাড়ির জটলা সৃষ্টি হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে সেই জটলা কেটে যাচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। আশা করা যাচ্ছে, ঈদের আগে বড় কোনো চাপ পড়বে না।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত ১২টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টায় পদ্মা সেতু দিয়ে ৯ হাজার ৫৯৮টি যানবাহন পার হয়েছে। এর মধ্যে মাওয়া প্রান্ত দিয়ে ৬ হাজার ৫৯টি এবং জাজিরা প্রান্ত দিয়ে ৩ হাজার ৫৩৯টি যানবাহন চলাচল করেছে। ওই সময়ে টোল আদায় হয়েছে এক কোটি ৬৮ লাখ ১৮ হাজার ২৫০ টাকা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইলে যাত্রীর চাপ বেড়েছে : সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, রাজধানী ঢাকা ও প্রাচ্যের ডাণ্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। ভোর থেকে যাত্রীদের আনাগোনা শুরু হয়ে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকা। দুপুরের পর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড ও শিমরাইল মোড়সহ আশপাশের পয়েন্টগুলোতে যানবাহন ও যাত্রীচাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে গাড়ির গতি কমলেও কোথাও বড় ধরনের যানজট না থাকায় স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে যাত্রীদের। সরেজমিন মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে দেখা গেছে, মহাসড়কের সাইনবোর্ড, চিটাগাং রোড ও কাঁচপুর এলাকায় দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের চাপ বেড়েছে। কোথাও কোথাও যানবাহন ধীরগতিতে চললেও দীর্ঘ সময় আটকে থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সাইনবোর্ড এলাকায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন গার্মেন্টকর্মী আকলিমা বেগম। তিনি জানান, ছুটি পেয়েই বাসায় যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। সকালে ভিড় কম ছিল, কিন্তু দুপুরের পর মানুষ অনেক বেড়ে গেছে। তারপরও ভালো লাগছে, গাড়ি থেমে নেই। ধীরে হলেও চলছে। চিটাগাং রোডে কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, শেষ সময়ে টিকিট পেয়েছি। তাই একটু ঝামেলা হয়েছে। লোকজন অনেক বেশি, কাউন্টারে চাপও বেশি। তবে সড়কে পুলিশ ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছে। তাই যাত্রাটা সহনীয় মনে হচ্ছে।
জানতে চাইলে শিমরাইল মোড়ের সোহাগ কাউন্টারের ইনচার্জ মনির হোসেন বলেন, অন্যবারের চেয়ে এবারের ঈদে যাত্রীদের চাপ অনেকটা কম। তবে অনেক গার্মেন্ট মঙ্গলবার চালু রয়েছে, বুধবার সব বন্ধ হলে যাত্রীচাপ আরও বাড়বে। এছাড়া ঈদের ছুটি বেশি হওয়ায় অনেকে যাত্রী ভাগ ভাগ করে নিজ নিজ গন্তব্যে যাচ্ছেন।
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার চন্দ্রা ত্রিমোড় থেকে যানজট শুরু : কালিয়াকৈর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উওরবঙ্গের প্রবেশদ্বার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় মঙ্গলবার সকাল থেকে থেমে থেমে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা থেকে বের হতে উত্তরবঙ্গের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার চন্দ্রা ত্রিমোড় মহাসড়কটি বর্তমানে ব্যস্ততম সড়ক। বেশ কয়েকদিন ধরে জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশ সড়কে যানজট নিরসনে কাজ করছে। তারপরও যানবাহনের চাপে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে যেতে যাত্রীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে নাওজোড় হাইওয়ে থানার ওসি সওগাতুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ঈদের ছুটির কারণে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় যানজটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তবে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে।
ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ, বাড়ছে যানজট : নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঈদের ছুটিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণের বেশি যানবাহনের চাপ থাকে সড়কে। অন্যবারের মতো এবারও ঢাকা থেকে সিলেট ও চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ফেনীসহ দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ২২ জেলার মানুষজনের ভোগান্তি শুরু হয়েছে। এর কারণ হলো-ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রশস্তকরণ কাজ এখনো সম্পন্ন না হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে যত্রতত্র বাস রেখে যাত্রী তোলা এবং ধীরগতির তিন চাকার যানবাহনের কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ২০৯ কিলোমিটার এক লেনের সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। সড়কের ওপর রাখা নির্মাণসামগ্রীর কারণে অতিমাত্রার ধুলাবালিও স্বাভাবিক যাত্রায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে ট্রাফিক পুলিশসহ জেলা পুলিশের প্রায় ছয়শ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়ন কাজ চলার কারণে যানবাহন কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। এতে হালকা যানজট থাকলেও চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
বরিশাল যেতে সরু সড়ক বিড়ম্বনা : বরিশাল ব্যুরো জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের ঈদযাত্রায় সরু সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু এখন প্রধান বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২৩৫ কিলোমিটার সড়কে এই বেহাল দশার কারণে গন্তব্যে পৌঁছাতে দ্বিগুণ সময় লাগছে বলে জানান যাত্রীরা। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বর্তমান চিত্র যাত্রীদের আতঙ্কিত করছে। খানাখন্দ, দেবে যাওয়া বিটুমিন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আর অপরিকল্পিত সংস্কার কাজে জর্জরিত এই ২৩৫ কিলোমিটার পথ এখন যাত্রী ও চালকদের কাছে এক আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। ভাঙ্গার পর থেকে বরিশাল পর্যন্ত সড়কের কোথাও বিটুমিন উঠে ইটের সুরকি বেরিয়ে পড়েছে। কোথাও আবার মহাসড়কটি এতটাই সরু যে দুটি বড় যানবাহন অতিক্রম করার সময় খাদে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বরিশালের গড়িয়ারপার থেকে রহমতপুর এবং গৌরনদী থেকে ভুরঘাটা, মস্তাফাপুর অংশের খারাপ অবস্থা ঈদযাত্রায় চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। সড়কের ওপর বালুর স্তূপ আর ইটের জোড়াতালি দিয়ে যে ‘সাময়িক মেরামতের’ চেষ্টা চলছে, সোমবার মধ্য রাতের বৃষ্টিতেই তা ধুয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ছয় মাসে মাদারীপুর অংশে ছোট-বড় ৪০টি দুর্ঘটনায় ২৩ জনের প্রাণহানি এবং অসংখ্য মানুষের পঙ্গুত্ববরণ প্রমাণ করে, এ সড়ক বর্তমানে কতটা অনিরাপদ। সড়কটি মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত, অথচ প্রতিদিন এখানে ১৮ থেকে ২০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। তার ওপর রয়েছে অবৈধ থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত যানের অবাধ বিচরণ।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ১১৪ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই সংকীর্ণ ও ভাঙাচোরা সড়কে যখন অতিরিক্ত গতির বাস পাল্লা দিয়ে চলে, তখন সাধারণ যাত্রীদের জীবন যেন সুতার ওপর ঝুলে থাকে। ঈদযাত্রার আগে নামমাত্র জোড়াতালি দিয়ে দায়সারা কাজ বন্ধ করতে হবে। বর্তমান সংকট নিরসনে অন্তত ১০ দিনের মধ্যে সব খানাখন্দ ভরাট করে চলাচলের উপযোগী করতে হবে এবং ঈদের সময় সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে রাস্তা পরিষ্কার রাখতে হবে। সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সতর্ক সংকেত এবং পর্যাপ্ত পুলিশি টহল নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আরিচা-দৌলতদিয়া পয়েন্টে স্বস্তিতে পারাপার : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বাড়লেও এবার স্বস্তিতে পারাপার করছেন ঈদে ঘরমুখো মানুষ। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার পাটুরিয়া এবং উত্তরবঙ্গগামী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আরিচা ঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বাড়লেও এবার স্বস্তিতে পারাপার করছেন তারা। আগের মতো দীর্ঘ ভোগান্তি নেই, বরং ব্যবস্থাপনায় এসেছে গতি ও শৃঙ্খলা। সরেজমিন দেখা যায়, মঙ্গলবার সকালে পাটুরিয়া এলাকায় চাপ কিছুটা বাড়লেও বেলা বাড়ার সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। দুপুরের পর যানজট অনেকটাই কমে আসে। বর্তমানে ঘাটে পৌঁছানো গাড়িগুলো অপেক্ষা ছাড়াই দ্রুত ফেরিতে তোলা হচ্ছে। এতে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। আরিচা ঘাটে সকাল থেকেই মানুষের ভিড় ছিল। ফেরির পাশাপাশি লঞ্চ, স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল করছে। স্পিডবোটে পারাপারের জন্য দীর্ঘ লাইন থাকলেও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) জানায়, ঈদে চাপ সামলাতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ১৭টি ফেরি এবং আরিচা-কাজিরহাটে ৫টি ফেরি চালু রয়েছে। এছাড়া ৩৩টি লঞ্চ ও ৬৭টি স্পিডবোট চলাচল করছে। জরুরি, শিশুখাদ্য ও পচনশীল পণ্য ছাড়া অন্যান্য ট্রাক বন্ধ থাকায় ঘাট এলাকায় যানজট তৈরি হয়নি।
প্রয়োজনে ফেরি স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতু চালুর পর অনেক যানবাহন সেতুপথে গেলেও কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, যশোর, মাগুরা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর যাত্রীরা এখনো এই নৌরুট ব্যবহার করছেন।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম বলেন, নির্বিঘ্ন পারাপারের জন্য বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির আলাদা লেন রাখা হয়েছে। ঘাট ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। সকালে চাপ থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার কারণে এবারের ঈদযাত্রায় পাটুরিয়া-আরিচা নৌপথে স্বস্তি ফিরেছে।