মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা পড়েছেন নানা সংকটে। একদিকে চাকরির অনিশ্চয়তা ও বেতন বিলম্ব, অন্যদিকে ভিসা জটিলতা ও ফ্লাইট বিপর্যয়ে দেশে-বিদেশে আটকেপড়ার শঙ্কা। এ সব কারণে প্রবাসজীবন এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাদের মনে নেই ঈদ আনন্দ। এই পরিস্থিতি শুধু শ্রমিকদের জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, ঝুঁকির মুখে ফেলছে দেশের রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতিকেও। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্য। তারমধ্যে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও ওমান উল্লেখযোগ্য। এ সব দেশে বসবাসরত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে দু’জন, বাহ্রাইনে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি মারা গেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও তিনজন গুরুতর ও সাতজন আহত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সামপ্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। শত শত ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় সৌদি আরবগামী হাজারো শ্রমিক দেশে আটকে পড়েছেন। একই সঙ্গে ছুটিতে দেশে এসে ফিরে যেতে না পারা শ্রমিকদের অনেকেই চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে নতুন করে ভিসা যাচাই-বাছাই জোরদার হওয়ায় বিপাকে পড়েছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। অনেক প্রতিষ্ঠান আগাম অর্থ দিয়ে ভিসা সংগ্রহ করলেও এখন তা বাতিল বা স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে শ্রমিক পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াই ধীর হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। সেখানে প্রায় ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্মাণ ও সেবাখাতের অনেক প্রকল্প ধীরগতিতে চলছে, কোথাও কোথাও কাজ বন্ধও হয়ে গেছে। ফলে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বেতন বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগও বাড়ছে।
আব্দুস সালাম পরিবারসহ বসবাস করেন সৌদি আরবের জেদ্দায়। তিনি বলেন, এখন পরিবেশ মোটামুটি অনেকটাই ভালো আগের থেকে। তবে আতঙ্ক একেবারে কেটে গেছে- এমন বলা যাচ্ছে না। একধরনের চাপা আতঙ্ক সকলের মধ্যেই রয়েছে।
মদিনা শহরের জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমাদের এই শহরে খুব বেশি সমস্যা নেই। তবে সৌদির যেসব জায়গায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, শুরু থেকেই সেসব এলাকায় হামলা হয়েছে। এরফলে ওই শহরসহ আশপাশের শহরগুলোতে কাজের সমস্যা, বেতন বিলম্বিত হওয়ার সমস্যায় পড়েছেন অনেক বাংলাদেশি।
আরেক প্রবাসী বলেন, আগের থেকে খানিকটা ভালো এখন সৌদির পরিস্থিতি। তবে কাতার-বাহরাইনের পরিবেশও একদম পুরোপুরি ভালো নেই। আমাদের পরিচিত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে- কথা হচ্ছে। তারা জানাচ্ছেন যুদ্ধের কারণে দেশে পরিবারের মানুষজন আতঙ্কে থাকেন কখন কি হয়। কাজের মধ্যে থাকি তেমন সমস্যা দেখছি না।
ওমানের সোহার শহরের চিত্রটা ভিন্ন। এখানে ড্রোন হামলায় দুই প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এই শহরে থাকেন আতাউর রহমান। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন বাংলাদেশি একসঙ্গে কাজ করি। আমাদের থেকে চার কিলোমিটার দূরেই এই ড্রোন হামলা হয়। পরে জানতে পারি দুইজন মারা গেছে। কিন্তু প্রথমে খবর ছড়িয়ে পড়লো বিমান হামলা হয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে পুরো আগুন লেগে গেছে। আমরাতো এসব শুনে ভয়ে অস্থির। হামলার দিন (১৩ই মার্চ) আমাদের ছুটি দিয়ে দেয়া হয়। পরদিনও আমরা কাজে যাই নাই। হামলা হালকা হলেও আমাদের মধ্যে তীব্র ভয় বিরাজ করছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র পেটের দায়ে কাজে যাই। আমাদের থেকে চার কিলোমিটার দূরেই শিল্পাঞ্চল। শুনেছি ওখানে মার্কিন ঘঁটি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এবার ঈদে ওমান থেকে দেশে আসার কথা ছিল শিহাবুল ইসলামের। ছুটির প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন আরও চার থেকে পাঁচ মাস আগে। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে আসতে পারছেন না তিনি। ওমান থেকে তিনি বলেন, এখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবে সবার মনেই ভয় রয়েছে। প্রচুর গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। যার কারণে ভীতিটা আরও বাড়ছে।
তিনি বলেন, আমি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে ওমান এসেছি। মাস্কাটে কাজ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ দিয়েছে সুর শহরে। আবার যে বেতনের কথা বলে এনেছিল তার থেকে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেতন কম পাই। আমি কোনোভাবেই দেশে গিয়ে আটকা পড়তে চাই না। প্রায় পাঁচ বছরের চেষ্টায় বিদেশ এসেছি। দেশে গিয়ে যদি আসতে না পারি আমার পরিবারকে পথে নামতে হবে।
ওমান প্রবাসী আবিদুল ইসলাম বলেন, ড্রোন হামলার পর থেকেই মানুষ বের হচ্ছে কম। স্থানীয়রাতো বের হন না। আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় বের হই। ঈদের জন্য অনেকেই বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। শহর অনেকটাই ফাঁকা। কিন্তু এবার ঈদে না যেতে পারছি বাড়িতে, না পারছি থাকতে। রীতিমতো দম বন্ধ পরিস্থিতি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন যে ঈদের নামাজ আদায় করতে যাবো কিনা সন্দেহ আছে।
বাহরাইনে থাকা আবদুল কাদের জানান, এখানে শুরুতে সমস্যা বেশি ছিল। এখন কমে এসেছে। যুদ্ধের কিছু আমরা প্রকাশ করলে বা অনলাইনে কারও সঙ্গে আদান-প্রদান করলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে আইন-কানুন কঠোর হচ্ছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক। চাকরির হারানোর শঙ্কা, দেরিতে অনেক প্রতিষ্ঠানের বেতন হচ্ছে। যারা দেশে গেছেন তারাও ফিরে এসে চাকরি পাবেন কিনা এমন শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
বাহরাইনের রিফায় বসবাসরত প্রবাসী আরাফাত বলেন, এখানে হামলার পর থেকে আমরা জীবনের ভয়ে আছি। বাসিন্দারা প্রয়োজন ছাড়া বের হন কম। রাত হলেই নীরব হয়ে যায়। কোথাও কোনো বড় শব্দ হলেই শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সৌদি আরবে ও কাতারে থাকে কুমিল্লার এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে শ্রমিক নেয়া বন্ধ না হলেও যুদ্ধের কারণে যেতে পারছেন না অনেকেই। যারা এসেছেন তারাও নানা শঙ্কার মধ্যে দেশে রয়েছেন ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়াসহ এমন অনেক জটিলতায় পড়তে হচ্ছে প্রবাসীদের। আবার অনেকেই নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)’র তথ্যানুযায়ী, বিদেশে কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৬৮টি দেশের নাম থাকলেও গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ ভাগ কর্মী গেছেন মাত্র ৫টি দেশে। ১৩টি দেশে মাত্র ১ জন করে কর্মী গেছেন, ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গেছেন। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে।
বিএমইটি বলছে, গত মাসেও বিভিন্ন দেশে গেছেন ৬৫ হাজার ৬১৩ জন। এর মধ্যে প্রথম ১০ দিনে গেছেন প্রায় ৩৮ হাজার কর্মী। ১ থেকে ১০ই মার্চ পর্যন্ত বিদেশ যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ২১ হাজার ১২২ জন। গত বছর একই সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪৬ হাজার ৭৪৪ জন। তার মানে যুদ্ধ শুরুর পর এটি কমে অর্ধেকে নেমেছে। সৌদিতে কিছু ফ্লাইট চালু থাকায় কর্মীদের কেউ কেউ যেতে পারছেন। কেউ কেউ ভয়ে এখন যেতে চাইছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট চললে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিনির্ভরশীল শ্রমবাজারের কারণে বাংলাদেশ বারবার এমন ঝুঁকিতে পড়ে। তাই বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে ফ্লাইট চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট আইডি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে ওইসব দেশের কর্তৃপক্ষ। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে।
এদিকে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হতে বাংলাদেশে ছুটিতে আসা প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং বাহরাইন হতে বাংলাদেশে আসা কর্মীগণের ভিসা নবায়নের জন্য কর্মীর নিয়োগকর্তা, স্পন্সর বা কফিলের মাধ্যমে যোগাযোগ/ অনলাইনে আবেদন করতে হবে; কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ইতিমধ্যে যে সকল ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বা শেষ হওয়ার পথে এমন সকল এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ ১ মাস বৃদ্ধি করেছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ওইসব দেশে কর্মরত শ্রমিকদের সেসব দেশের নির্দেশনা মানতে বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে। এমনকি ওই দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকেও বলা হয়েছে- যুদ্ধ পরিস্থিতি বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও যেন তারা হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন শেয়ার না করেন। এরপরও কেউ যদি অতিরিক্ত উৎসাহী হয়ে ওই দেশের আইন ভঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি আইনের আওতায় পড়বেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর মানবজমিনকে বলেন, আমরা বারবার সতর্ক করে আসছি যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আইন-কানুন বেশ কঠোর। তাই সেখানে অবস্থানরত সবাইকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলতে হবে। সামপ্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট বা কনটেন্ট ছড়াতে দেখা যাচ্ছে। এর আগেও আমরা দেখেছি, এ ধরনের ঘটনার জেরে বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাই যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকেন, তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে- সেখানে যে আইন-কানুন ও বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন এবং সেগুলো মেনে চলুন।