রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ফিরেছে চিরচেনা সেই ব্যস্ততা। ঘরমুখো মানুষের চাপে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সৃষ্টি হয়েছে উপচে পড়া ভিড়। গতকাল ভোর থেকেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের ঢল নামতে থাকে টার্মিনাল এলাকায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও তীব্র হয়ে জনস্রোতে পরিণত হয়।
ঘরমুখো যাত্রীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্বিঘ্ন নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ঢাকা নদী বন্দর (সদরঘাটে) অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ কমানো এবং যাত্রীদের বিকল্প নৌপথে সহজ যাতায়াতের সুবিধার্থে এ বছর বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন লঞ্চঘাট (ব্রিজের নিচে) এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঈদযাত্রায় যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকা নদী বন্দর (সদরঘাট) এলাকায় প্রবীণ ও মহিলা যাত্রীদের ব্যবহার্য মালামাল, ব্যাগ (ব্যবসায়িক পণ্য ব্যতীত) বহনের জন্য গতকাল থেকে ঈদের পর ২৮শে মার্চ পর্যন্ত ১২ দিন টার্মিনাল থেকে লঞ্চ পর্যন্ত বিনামূল্যে কুলি সেবা প্রদান করা হবে। একই সময় অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য ঢাকা নদী বন্দর (সদরঘাট) ও বরিশাল নদী বন্দরে হুইলচেয়ার সেবাও প্রদান করা হয়েছে।
সরজমিন দেখা যায়, টার্মিনালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে পন্টুন ও লঞ্চঘাট পর্যন্ত সর্বত্রই যাত্রীদের ভিড়।
যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়সূচি থাকলেও অতিরিক্ত চাপের কারণে লঞ্চে উঠতে গিয়ে কিছুটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী তোলার চেষ্টাও লক্ষ্য করা গেছে। নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে সরগরম পুরো এলাকা। কেউ কাঁধে ব্যাগ, কেউ পরিবারের হাত ধরে ছুটছেন লঞ্চের দিকে। দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে যেন আবার চেনা ছন্দে ফিরেছে সদরঘাট। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৪০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। দিনশেষে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫ ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লঞ্চ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেক ভাড়া ৩০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২ হাজার ৪০০ টাকা। ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-মুলাদি ও ভাসানচর রুটে ডেক ভাড়া ৪০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। চাঁদপুর রুটে ডেক ভাড়া ২০০ টাকা এবং কেবিন ভাড়া ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে।
সুন্দরবন-১৬ লঞ্চের ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদকে ঘিরে সদরঘাটের চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। কয়েকদিন আগেও যেখানে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ ছিল, এখন সেখানে যাত্রীদের ভিড় সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া বা যাত্রী হয়রানি এমন ঘটনা যেন না ঘটে তা নিয়ে কড়া নির্দেশনা আছে। আমরা চেষ্টা করছি, যাত্রীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারেন। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে যারা যাচ্ছেন, তাদের জন্য বাড়তি সতর্কতা রাখা হচ্ছে।’
ফারহান-৭ লঞ্চের ম্যানেজার হাজী মো. ফারুক হাসান বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর স্বাভাবিক সময়ে যাত্রী সংখ্যা কমে গেছে এটা সত্যি। তবে ঈদের সময় এলে সেই পুরনো চাপ আবার ফিরে আসে। এখন থেকেই যাত্রী বাড়ছে, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত চাপ অনেক বেশি হবে। আমরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছি, যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়।’
তাসরিফ-৩ লঞ্চের কর্মী ইবাদত বলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হচ্ছে। যাত্রী ওঠানো-নামানো থেকে শুরু করে মালপত্র ঠিক রাখা সবমিলিয়ে কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। তবে ঈদের সময় এমন ব্যস্ততা থাকবেই, এটাকে আমরা স্বাভাবিকভাবেই নেই।’ চাঁদপুরগামী যাত্রী অঙ্কন বলেন, ‘বছরের এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করি। যত কষ্টই হোক, ঈদের সময় পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারার অনুভূতিটা অন্যরকম। ভাড়া বেশি নেয়ার চিত্র আমাদের চোখে পড়ছে না এটা ভালো লাগছে। ভিড় একটু বেশি হলেও সবাই কোনোভাবে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।’
বরিশালগামী যাত্রী রেহানা বেগম বলেন, ‘আগেই টিকিট কেটে রেখেছিলাম, কারণ শেষ মুহূর্তে টিকিট পাওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। ভিড় অনেক, তবুও একটা স্বস্তি আছে পরিবারের কাছে ফিরতে পারছি। ছোট বাচ্চা নিয়ে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে, তবে ঈদের আনন্দের কাছে তা কিছুই না।’
বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, ‘সদরঘাটে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী না ওঠানোর জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কেবিনের টিকিট নিয়ে যেন কোনো কালোবাজারি না হয়, সেদিকেও কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।’ বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, ‘আমরা এখানে প্রায় ৫০টি ট্রলি এবং প্রায় ৩০টি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া ২০০ জন কুলি নিয়োজিত করা হয়েছে। ৭০ জন ক্যাডেট পর্যায়ক্রমে ডিউটি করছেন, যাতে যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ার সার্ভিস সুষ্ঠুভাবে প্রদান করা যায়।’
এদিকে কুলি সার্ভিস ফ্রি করা হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে দেখা গেছে তাদের। বোরহানউদ্দিনগামী গাজী সালাউদ্দিন লঞ্চের যাত্রী আরাফাত বলেন, ‘আমি ট্রলিতে করে নিজের মালামাল নিজে নিয়ে এসেছি। লঞ্চের সামনে আসার পর কয়েকজন কুলি না জিজ্ঞেস করে বড় ব্যাগগুলো মাথায় তুলে নেন। পরে বকশিশের নামে ২০০ টাকা নেন। তাহলে ফ্রি সার্ভিসটা কোথায়?’ একই লঞ্চের আরেক যাত্রী শফিকুল বলেন, পন্টুন থেকে একটা বস্তা লঞ্চের সামনে তুলে দিয়ে ১০০ টাকা নিয়েছেন। টাকা না দিলে কুলিরা সহযোগিতা করেন না।