নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিনের কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ক্লিপে আলাউদ্দিনকে একাধিক নারীর সাথে অন্তরঙ্গ মূহুর্তে দেখা গেছে তাঁকে। ১৬ মার্চ ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বরাতে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সাংবাদিকরা আলাউদ্দিনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন এসব ভিডিও সত্য নয়। বরং এগুলো তার "সম্মানহানির উদ্দেশ্যে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে"।
তবে দ্য ডিসেন্ট এর যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, ইউএনও আলাউদ্দিনের দাবি অসত্য। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্তত তিনটি ভিডিও ক্লিপ যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া গেছে এগুলো এআই দিয়ে তৈরি নয়।
এই ভিডিওগুলোর উৎস কোথায় তা জানতে অনুসন্ধান শুরু করে দ্য ডিসেন্ট। এক পর্যায়ে উৎসের সন্ধান পাওয়া যায় এবং দ্য ডিসেন্ট কয়েকজন নারীর সাথে আলাউদ্দিনের ১০টি ভিডিওর মূল কপি সংগ্রহ করে। এই ১০টি ভিডিও ফাইল মোট ৭ জন নারীর নামে সেইভ করা ছিল। ভিডিও বিশ্লেষণ করেও ৭জন আলাদা নারীর চেহারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে তাদের কারো পরিচয় জানা যায়নি।
মূল কপি সংগ্রহের পর বিশ্লেষণে আবারও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এসব ভিডিওর কোনটিই এআই দিয়ে তৈরি নয়।
ফাঁসের নেপথ্যে আলাউদ্দিনের নিরাপত্তা প্রহরী
বর্তমানে সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ২০২২ সালের নভেম্বর মাসের ২১ তারিখে তাহিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমি থেকে একই পদে যোগদান করেন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায়। সেখানে ২ বছর দায়িত্ব পালনের পর তাকে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর বদলি করা হয় চট্রগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। এরপর তিনি সরাসরি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।
ভিডিওগুলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে দ্য ডিসেন্ট হাতিয়া এবং সুনামগঞ্জের স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের একজন সাংবাদিক জানান, তিনি এই ভিডিওগুলোর মূল উৎসকে চেনেন। তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের জুন মাসে মূল উৎসের কাছ থেকে ভিডিওগুলো সংগ্রহ করে স্থানীয় আরেকজন সাংবাদিক তাকে দেখিয়েছিলেন। তবে তার সাথে ভিডিও শেয়ার না করে দুটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেছিলেন ব্লটুথের মাধ্যমে।
দ্য ডিসেন্ট সুনামগঞ্জের ওই সাংবাদিকের মোবাইলে পাঠানো দুটি স্ক্রিনশট সংগ্রহ করেছে যেগুলোর মেটাডাটাতে 'ট্রান্সফার টাইম' হিসেবে ২০২৫ সালের জুন মাসের ১০ বিকাল ৪টা ৪৮ মিনিট দেখা যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জের এই সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিসেন্টকে জানান, ওই সময়ই তিনি ঘটনাটি কিছুটা অনুসন্ধান করেছিলেন। তবে প্রমাণ হিসেবে মূল ভিডিওগুলো নিজের হাতে না থাকায় এ নিয়ে কোন প্রতিবেদন করতে পারেননি।
অনুসন্ধানে ওই সাংবাদিক জানতে পারেন, এই ভিডিওগুলো ফাঁস হওয়ার নেপথ্যে ছিলেন শাল্লা উপজেলা ভূমি অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী রাজু রায়।
ভূমি অফিসে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি-- যাদের কেউই নাম প্রকাশে আগ্রহী নন-- জানিয়েছেন, এসিল্যান্ড থাকাবস্থায় আলাউদ্দিন জেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে থাকতেন পরিবার ছাড়া। এসময় নিরাপত্তা প্রহরী রাজুর বাসা থেকেই তার খাবার আসতো। এই সুবাদে আলাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হন রাজু রায়। ঘনিষ্ঠতার খাতিরে বিভিন্ন সময় আলাউদ্দিনের ব্যক্তিগত ফোনালাপ শুনতে পেতেন তিনি। একদিন কোন এক নারীর সাথে ফোনে কথা বলার সময় আলাউদ্দিন বলেছিলেন 'তোমার সব ভিডিও আছে আমার কাছে পেনড্রাইভে'। এ কথা শুনে রাজু সেই পেনড্রাইভ হস্তগত করার ফন্দি আটেন। একদিন সুযোগ পেয়ে পেনড্রাইভটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। এবং সেখান থেকে ৮/১০টি ভিডিও নিজের মোবাইলে নেন। ওই সময় পেনড্রাইভ না পেয়ে অফিসে গিয়ে আলাউদ্দিন রাগান্বিত হলে রাজু সেটি গোপনে একটি ড্রয়ারে রেখে দেন এবং পরে সেটি পাওয়া গেছে বলে জানান।
এর কিছুদিন পর থেকেই এসব ভিডিও দেখিয়ে আলাউদ্দিনকে ব্ল্যাকমেইলিং শুরু করেন রাজু।
শাল্লা ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, "এক পর্যায়ে রাজুকে বড় অঙ্কের টাকা ও শাল্লা সদরে ডিসি খতিয়ানের দুটি বাজার ভিট দেন আলাউদ্দিন। যেন সে ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেয়। এদিকে রাজু নিজের মোবাইল থেকে ডিলিটের আগে পাঠিয়ে দেন তার ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিককে। এই সাংবাদিকও আলাউদ্দিনকে ব্লাকমেইল করে টাকা হাতিয়েছেন বলে শুনেছি আমরা।"
এই সাংবাদিকই পরে অন্য কয়েকজনকে এসব ভিডিও দেখিয়েছেন, যার মধ্যে সুনামগঞ্জের সেই সাংবাদিকও রয়েছেন যিনি দ্য ডিসেন্টকে ঘটনার মূল উৎস সম্পর্কে জানাতে সহায়তা করেছেন।
এ বিষয়ে আজ ১৭ মার্চ মঙ্গলবার শাল্লা ভূমি অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী রাজুর সাথে দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "এগুলো আরো দুই বছর আগের ঘটনা। আমি এদের (যে মেয়েদেরকে ভিডিওতে দেখা যায়) কাউকে চিনিনা। আর এসব ভিডিও আমি তখন সাথে সাথে ডিলিট করে দিছি।"
রাজু যে সংবাদকর্মীকে এই ভিডিওগুলো দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে তার মোবাইল নম্বরে এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। ফলে, তার নাম প্রতিবেদনে উয্য রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাল্লা ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, "তখন রাজুকেই মনে হতো এসিল্যান্ড! আমরা যে কাজ নিয়ে গেলে স্যারে করে দিতেন না সেই একই কাজ রাজু নিয়ে গেলে হয়ে যেত। রাজু যা বলতো স্যার তা করতো। পরে আমরা বুঝতে পারি আসল কাহিনী এসব ভিডিও।"
আলাউদ্দিনের মোবাইল নম্বর এবং হোয়াটসঅ্যাপে মঙ্গলবার দিন থেকে রাতের মধ্যে কয়েকবার কল করে বন্ধ পাওয়া গেছে।
প্রসঙ্গত, ভিডিও সংক্রান্ত খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর মঙ্গলবার মোহাম্মদ আলাউদ্দিনকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদ থেকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মু. তানভীর হাসান সুমন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ বদলি ও পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়।
(এই অনুসন্ধান সহযোগিতা করেছেন সাংবাদিক আমির মাহবুব)