Image description

ফেসবুক পোস্ট ও সংবাদ পরিবেশন নিয়ে বাকবিতণ্ডার অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এখন টিভির চার সাংবাদিককে শোকজ করে কর্তৃপক্ষ। পরে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। চার সাংবাদিক হলেন—এসাইনমেন্ট ডেস্ক ইনচার্জ ও বিশেষ প্রতিনিধি মাহমুদ রাকিব, বিশেষ প্রতিনিধি মুজাহিদ শুভ, সিনিয়র রিপোর্টার মোহাম্মদ আজহারুজ্জামান (আজহার লিমন) ও সিনিয়র রিপোর্টার ও ডেপুটি এসাইনমেন্ট ডেস্ক ইনচার্জ বেলায়েত হোসেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে সম্প্রতি এখন টিভি কর্তৃপক্ষ ও শোকজ পাওয়া সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছে  দ্য ডিসেন্ট। চার সাংবাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, শোকজের পর প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও তারা অফিসে যেতে পারছেন না এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কী ছিল শোকজ নোটিশে

চার সাংবাদিককে দেওয়া শোকজ নোটিশে কী উল্লেখ ছিল সেসম্পর্কে এখন টিভির বিভিন্ন সূত্র থেকে জানার চেষ্টা করেছে দ্য ডিসেন্ট।

এসব সূত্র জানায়, শোকজ নোটিশে বিশেষ প্রতিনিধি মাহমুদ রাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়, তিনি নির্বাচনকালীন সময়ে “নিউজরুমে উস্কানীমূলক কথার মাধ্যমে উত্তপ্ত পরিস্থিতি” তৈরি করেছেন। এছাড়াও অফিস মিটিংয়ে “রাজনৈতিক মতবিরোধ নিয়ে নিউজ এডিটরকে উদ্দেশ্য করে তিনি উচ্চবাচ্য” করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে মাহমুদুল রাকিব দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি যেন সত্য এবং নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচার করা যায়। জুলাই আন্দোলনের সময় নানা বাধা-বিপত্তি ছিল। তারপরও আমরা আন্দোলনের সংবাদগুলো প্রচার করার চেষ্টা করেছি।”

তার দাবি, সেন্ট্রাল ডেস্কের কিছু সদস্যের আচরণ তাদের কাছে পেশাদারিত্বপূর্ণ মনে হতো না।

তিনি বলেন, “আমরা যেসব সংবাদ দিতে চাই, সেখানে একটা ভারসাম্য থাকার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিই। দেখা গেলো এক দলের খবর খুব ফলাও করে ব্রেকিং নিউজ দেওয়া হচ্ছে। আরেক দলেরটা সাধারণ একটা স্ক্রল দিতেও অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এক দলেরটা নিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাইভ দেওয়া হচ্ছে, আরেকটা দলেরটা এক মিনিটের নিউজও দেওয়া হচ্ছে না।”

“এসব বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলেছি। আমাদের চাওয়া ছিল নিরপেক্ষ থাকা এবং সঠিক সংবাদটা প্রচার করা। কিন্তু এগুলো নিয়ে বারবার ঝামেলা হয়েছে। গত দেড়-দুই বছর ধরে বিষয়টা নিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা চলছিল”, বলেন রাকিব।

তিনি বলেন, “ইলেকশনের দুই দিন আগে, ১০ তারিখে আমাদের একটা মিটিং হয়েছিল। ওই মিটিংয়ে একজন নিউজ এডিটর বলছিলেন, ইলেকশনের দিন তার রানডাউন নিয়ে যদি কেউ কিছু বলতে যায় তাহলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তাকে স্বাধীনভাবে বুলেটিন চালাতে দিতে হবে। আমি তখন বলেছি—দেখেন ভাই, আপনি যদি নিরপেক্ষভাবে বুলেটিন সাজান তাহলে অবশ্যই কোনো বিশৃঙ্খলা হবে না। আর যদি নিরপেক্ষভাবে নিউজ না করেন তাহলে তো বিশৃঙ্খলা তৈরি হতেই পারে। তখন রিপোর্টাররা তো প্রশ্ন তুলবেই। তাই উচিত হবে আপনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করেন।”

রাকিব বলেন, “আমি তো চিফ রিপোর্টার। নেগোসিয়েশন করাই আমার কাজ। একজন চিফ রিপোর্টার হিসেবে এই ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলাই আমার দায়িত্ব।”

আলাদা শোকজ নোটিশে বিশেষ প্রতিনিধি মুজাহিদ শুভর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে নির্বাচনের আগে তিনি উস্কানিমূলক পোস্ট দিয়ে গণমাধ্যমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এছাড়া এখন টিভির একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ১৫ই আগষ্ট এখন টিভির স্টুডিও ওয়ালে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সেট করা হলে তিনি ছবি তুলে ফেসবুকে প্রচার করেছেন। 

জানতে চাইলে মুজাহিদ বলেন, “আমার দুইটা পোস্টের কথা বলা হয়েছে। একটা ছিল একটা স্যাটায়ার পোস্ট। আর আরেকটা হলো অফিসের স্টুডিওতে গত বছর পনের আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টানানো হয়েছিল। আমি সেটা পোস্ট করে লিখেছি আজ পনের আগস্ট। তারা এখন বলতেছে তারা ছবিটা রিহার্সেলের জন্য টানিয়েছিল, অন এয়ার করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২টার নিউজে ছবি যাবে, আমি ছবি তুলেছি ১:৪৫ মিনিটে। এটা কি সম্ভব যে ২টার নিউজে ছবি যাবে সেটার সিদ্ধান্ত তার পনের মিনিট আগেও নেয়া হয়নি? তাছাড়া ঘটনাটা গত বছর আগস্টের, সেটা কেন এই বছর ফেব্রুয়ারিতে ইস্যু হবে? তারা যদি আমাদের চাকরিতে না রাখতে চায় সেটা আমাদের বলে দিক। এতদিন ধরে আমাদের ‍ঝুলিয়ের রাখবে কেন?”

সিনিয়র রিপোর্টার আজহারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তিনি ফেসবুকে গণভোট নিয়ে উস্কানিমূলক পোস্ট করেছেন।

জানতে চাইলে আজহারুজ্জামান বলেন, “প্রথমত আমি আপত্তিকর কোন পোস্ট দিইনি। আমি যে পোস্ট দিয়েছি সেটা একটা আইনী ব্যাখ্যা। আমি লিখেছি গণভোটের যদি আইনী ভিত্তি না থাকে তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারে হাতে সম্পন্ন নির্বাচনসহ অন্যান্য কাজগুলোও অবৈধ ও বেআইনি। আইনজীবিদের কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা আমি জেনেছি সেটা তুলে ধরেছি। তাছাড়া ভোট সংক্রান্ত ইস্যুতে আমার তো সমালোচনা করার অধিকার আছে। আমি একজন ভোটার। আমি যে পোস্টটা দিয়েছি সেটা এখনও আমার ওয়ালে আছে। ওই পোস্টের সাথে অফিসের কোন দূরতম সম্পর্ক নাই। তাহলে সেটা কিভাবে অফিসের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে। আর শোকজ নোটিশে বলতেসে ফেসবুকে পোস্ট করার ব্যাপারে নাকি পলিসি আছে। আমরা তো এমন কিছুতে সাইন করিনি। আমাদের নিয়োগপত্রেও তো এমন কোন কিছু লেখা নাই। তাছাড়া তারা যদি এমন কোন পলিসিও নেয় সেটা কি সংবিধান আমাদের যে অধিকার দেয় সেটার বিরুদ্ধে করতে পারবে? যেকোন সমালোচনা করার তো অধিকার আমার আছে।”

তিনি আরও বলেন, “আর গোটা বিষয়টা যে বাইরে গেলো তার জন্যও অফিস দায়ী। তারা আমাদের মেইল করেছে, অফিস থেকে বাসায় ফিরে সে মেইল দেখার আগেই দেখি সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এটা তো আমাদের মানসম্মান ক্ষুন্ন করেছে।”

সিনিয়র রিপোর্টার বেলায়েত হোসাইনকে তার দেওয়া দু’টি ফেসবুক পোস্টের কারণে শোকজ করা হয়। এই দুই পোস্টে তিনি সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা নিয়ে আক্ষেপ ও গণভোট নিয়ে একজন রাজনীতিবিদের ব্যাখ্যার সমালোচনা করেন। 

তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমাকে ফেসবুকের দুইটা পোস্টের কারণে শোকজ করা হয়েছে। আমি সেটার জবাব দিয়েছি। একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যাদের নাম আমাদের কাছে আগে প্রকাশ করা হয়নি। আমরা সেখানে গিয়ে দেখি এমন লোকদের সেখানে সদস্য হিসেবে দেখেছি যারা আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডায় অংশ নিয়েছে। তাদের সাথে আমাদের পূর্ব থেকেই স্বার্থগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। আমরা তাদের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছি এবং আমরা আবেদন করেছি যেন নতুন করে স্বাধীন তদন্ত কমিটি করা হয় যেখানে সাংবাদিক সংগঠন ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধি থাকবে।

শোকজ পাওয়া অন্য তিন সাংবাদিকও তদন্ত কমিটির সদস্যদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। 

এখন টিভির সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আব্দুল্লাহ’র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলেন, “আমাদের মানব সম্পদ বিভাগ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।” একাধিকবার চেষ্টা করেও বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ হয়নি তুষার আব্দুল্লাহর সাথে।

যোগাযোগ করলে সংবাদমাধ্যমটির মানব সম্পদ বিভাগের ইন-চার্জ আব্দুল্লাহ নয়ন বলেন, “তাদের শোকজ করা হয়েছে, তারা জবাব দিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, কমিটি তাদেরকে ডেকেছে সেখানে তারা হাজির হয়েছে। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে, তদন্ত কমিটি ৬০ দিন সময় পায় সমাধানের জন্য।”কী কারণে তাদের শোকজ করা হলো সেসম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টা এমন না যে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার জন্যই তাদের শোকজ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের চাকরির চুক্তিতে নিষেধ আছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগও আছে। তারা অফিসিয়াল মিটিংয়ে বাকবিতণ্ডা করেছে প্রটোকল ভঙ্গ করে। এটা একজন করেছে তবে অন্য দু’জনও এতে জড়িত ছিল। আর আরেকজন সেখানে ছিলো না, কিন্তু এটা তার দ্বিতীয়বারের মত শোকজ। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা নিয়ে তাকে আগেও শোকজ করা হয়েছিল।”

 

গণভোটের পক্ষে পোস্ট দেওয়াটা কিভাবে আপত্তিকর হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটাতো আমি আপনার সাথে ডিসকাস করবো না। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি আছে তাদের কাছে জানতে হবে।”

 

তদন্ত কমিটিতে কারা আছেন সেটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা কনফিডেনশাল। তদন্ত কমিটির নাম প্রকাশ করা হবে না।”

 

কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আইন মেনেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। লেবার ল অনুযায়ী তাদের প্রতিনিধিও রাখা হয়েছে। তাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে তাদের উপরের পদের একজনকেই পাওয়া গেছে, ফলে একজনকে রাখা হয়েছে।”

 

শোকজ নোটিশ দেয়ার পরপর এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া (বিজেআইএম), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিয়ন (ডিআরইউ), সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ)সহ বিভিন্ন সংগঠন। 

 

চার সাংবাদিককে শোকজ ও অফিসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ব্যাপারে অধিকার কর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, “প্রথমত তাদের যে প্রক্রিয়ায় শোকজ ও অফিসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে সেটা বেআইনি ও অবৈধ। গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলার অধিকার যেকারো আছে। যে কোন  সাংবাদিক বা নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। এখন টিভি দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়ার ছাড়া যেটা করেছে সেটা সাংবাদিকদের পেশার স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।”

 

আইনের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের শোকজ করা ও তদন্তের একটা কার্যকাল আছে। দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত শেষে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার যে কমিটমেন্ট দেয়া হয়েছিল সেটাও এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমি মনে করি তাদের সাথে যদি অন্যায় করা হয় তাহলে তাদের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা  উচিত।"